• ঢাকা |

দেশব্যাপী বিএনপির চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

এমএম রহমাতুল্লাহ: ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেছেন, “বিএনপি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিগত স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা জুলাই আন্দোলনে নারীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল, যা আন্দোলন দমনের পরিবর্তে উল্টো আরও বেগবান করেছিল। আগামী ১২ তারিখ বাংলাদেশে এক নতুন সূর্যের উদয় হবে। সেদিন এ দেশের সচেতন জনগণ সকল প্রকার চাঁদাবাজ ও নারী নিপীড়কদের চূড়ান্তভাবে 'লালকার্ড' দেখিয়ে দিবে।

রাজধানীতে অনুষ্ঠিত নারী হত্যা এবং দেশব্যাপী অব্যাহত নারী নিপীড়নের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-উত্তোর সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় গাজীপুরে ছাত্রদল কর্তৃক নারী হত্যা এবং দেশব্যাপী বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের অব্যাহত নারী নিপীড়নের প্রতিবাদে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা মহানগর এই কর্মসূচির আয়োজন করে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহবাগে গিয়ে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

ঢাকা মহানগর পূর্ব সভাপতি ও ডাকসুর পরিবহণ সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহর সঞ্চালনায় বিক্ষোভ-উত্তর সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবাগাতুল্লাহ সিবগাহ। তিনি বক্তব্যে বলেন, "শত-সহস্র শহীদের জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যখন অতীতের কলুষিত রাজনীতিকে পেছনে ফেলে দেশে এক নতুন ধারার রাজনীতির সূচনালগ্ন উপস্থিত, ঠিক তখনই একটি দল বাংলাদেশকে নিয়ে পুনরায় গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। এ দেশের মানুষ যখন নিজেদের পছন্দের সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে, তখন সেই বিশেষ দলটি দেশজুড়ে হত্যা, নারী নির্যাতন ও পৈশাচিক অত্যাচারে লিপ্ত হয়েছে। তারা আজ দেশের প্রতিটি জনপদে নারীদের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে।"

তিনি অভিযোগ করেন, গতকাল ছাত্রদল নেতা কর্তৃক গাজীপুরে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীকে হত্যা এবং আজ চট্টগ্রামে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রদলের সম্পৃক্ততা খবর পাওয়া গেছে। এমনকি ২০১৮ সালে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে ধর্ষণের শিকার নারীর মামলার আসামিরাও এখন বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জজনক।

তিনি বলেন, “ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নারীরা ছাত্রশিবিরকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করায় এখন তারা নারীদের ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে যেন আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে না যায়। সাইবার আক্রমণ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি নেতা আলতাফ হোসেন তাদের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের জন্য সরকারের বিভিন্ন এজেন্সিকে ব্যবহার করার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক! আমরা সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর কাছে এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাই। অন্যথায় ধরে নেওয়া হবে আপনারা ফ্যাসিস্টদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেননি।”

কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান সমাবেশে বলেন, “বিগত ১৮ মাসে বিএনপির সন্ত্রাসীরা অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করেছে, যার মধ্যে অন্তত ৮৭টি ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তারা ২৩১ জন মানুষকে হত্যা করেছে এবং সারা দেশে হাজার হাজার স্থানে চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে লিপ্ত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল গাজীপুরে এক নারী ব্যবসায়ীকে তারা ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে।

ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে দলটি আজ 'মজলুম' থেকে 'জালিমে' রূপান্তরিত হয়েছে। তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তারেক রহমান এ দেশে হত্যা ও নারী হেনস্তার প্ল্যান নিয়ে এসেছেন। মূলত নারী নিগ্রহের সাথে বিএনপির এক ঐতিহাসিক ও কলঙ্কিত সম্পর্ক রয়েছে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তারা ভোলার চরফ্যাশনে দুই শত হিন্দু নারীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত। সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে ছাত্রদল আমাদের বোনদের ওপর রাতভর যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা আজও দেশবাসী ভোলেনি। শুধু তাই নয়, বুয়েটের মেধাবী ছাত্রী সাবিকুন নাহার সনিকে তারা গুলি করে হত্যা করেছিল।

এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের পরেও তারা সারা দেশে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও হিজাব নিয়ে কটূক্তি অব্যাহত রেখেছে। আমি তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই—দেশবাসীকে 'ফ্যামিলি কার্ড' দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি না দিয়ে, আগে আপনার দলের সন্ত্রাসীদের ধর্ষণ ও অপরাধ বন্ধ করার 'কার্ড' দিন।”

সমাবেশে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে যে ঐতিহাসিক সংস্কার ও নতুন দিনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা নস্যাৎ করার জন্য একটি দল আজ পাগল হয়ে গেছে। তারা আবারও 'পেছনের দরজা' দিয়ে ক্ষমতায় আসার পুরোনো কাঠামো বজায় রাখতে চায়। বিপ্লব-পরবর্তী এই সময়ে তাদের আমলনামা ঘাঁটলে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ধর্ষণ আর নারী নির্যাতন ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ দেড় বছর পর তাদের এক নেতা দেশে ফেরার পর দলের সন্ত্রাসীরা আরও লাগামহীন হয়ে পড়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর প্রতিটি শিক্ষা ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের যে সুস্থ ধারা শুরু হয়েছে, তা দেখে তারা দিশেহারা। মূলত তারা দেশে গণতন্ত্র চায় না, বরং এক নতুন 'মাফিয়াতন্ত্র' কায়েম করতে চায়। বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা ইনসাফ ও ন্যায়ের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় তারা আজ উন্মত্ত হয়ে আমাদের মা-বোনদের ওপর হামলা ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে।”

কেন্দ্রীয় এইচআরএম সম্পাদক সাইদুল ইসলাম বলেন, “বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল মনে করেছিল তারা এখনই ক্ষমতায় বসে গেছে। কিন্তু চারদিকে তাদের নিশ্চিত 'ভূমিধস পরাজয়' আঁচ করতে পেরে তারা এখন বেপরোয়া হয়ে নারী নির্যাতন ও জুলুম-অত্যাচারের পথ বেছে নিয়েছে। তাদের এই পৈশাচিকতা থেকে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তো বটেই, এমনকি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোমলমতি নারী ও শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না।”

জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “বিগত সময়ে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং দুর্নীতিতে দেশকে বারবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানিয়ে যারা বিমানবন্দর দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, সেই অপশক্তিই আজ পুনরায় দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা আবারও আমাদের মা-বোনদের ওপর কাপুরুষোচিত হামলা ও নির্যাতন শুরু করেছে। আমি পরিষ্কার বলে দিতে চাই—বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের একজন জনশক্তি জীবিত থাকতে বাংলার মাটিতে আর কোনো মা-বোনের ওপর হামলা বরদাশত করা হবে না।”

সমাবেশে অন্যান্যাদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, ঢাকা মহানগর পশ্চিম সভাপতি হাফেজ আবু তাহেরসহ ঢাকা মহানগর ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবন্দ।

সমাবেশ শেষে ঢাকা মহানগর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত সকলকে সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচি সফল করার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।