রায়হান আহমেদ, ময়মনসিংহ ব্যুরো: বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, জ্বালানিনির্ভরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ একটি কার্যকর ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান হতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দিয়েছেন বক্তারা।
ময়মনসিংহে ২৯ আগস্ট ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
পরিবর্তন উন্নয়ন সংস্থার সভাকক্ষে আয়োজিত এ কর্মসূচি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করে কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন), অন্যচিত্র ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিডব্লিউজিইডি)।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এফইডি-ময়মনসিংহের সভাপতি সেলিমা বেগম।
সেলিমা বেগম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনা শুধু জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় সরকার, সামাজিক সংগঠন এবং কমিউনিটি নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করলে বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা সম্পর্কে মানুষকে সহজভাবে জানানো গেলে আগ্রহ বাড়বে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে জনগণের সবচেয়ে কাছের সহযোগী হতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা তথ্য অফিসের পরিচালক মীর আকরাম উদ্দিন আহাম্মদ।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এখনো পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। অনেকেই এর সুবিধা, স্থাপনপ্রক্রিয়া, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না।
মীর আকরাম উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, জেলা তথ্য অফিস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। সফল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরলে প্রযুক্তিটির ওপর আস্থা বাড়বে।
বিশেষ অতিথি ময়মনসিংহ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজনীন সুলতানা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের বিষয়টি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত।
তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষা ও পারিবারিক উৎপাদনশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথি অন্যচিত্র ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা বলেন, নগর ও আধা-নগর এলাকার বিপুলসংখ্যক ছাদ এখনো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এসব ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য স্থানীয় সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, সৌরবিদ্যুৎ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কার্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার ও অন্যান্য সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে পারে।
তাঁরা আরও বলেন, স্থানীয় সরকার উপযুক্ত ছাদ চিহ্নিত করা, জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা, দক্ষ সেবাদাতার সঙ্গে গ্রাহকদের সংযোগ তৈরি এবং স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে পারে।
বক্তারা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সহজ অর্থায়ন, মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি, কারিগরি সহায়তা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিকল্প বিদ্যুতের উৎস নয়; এটি স্থানীয়ভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি বাস্তবসম্মত পথ।
অনুষ্ঠান শেষে ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়।