• ঢাকা |

বাংলাদেশী আদালতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি : রাষ্ট্রের করণীয়


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো: মুখলেছুর রহমান
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব হলো নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এ কথা দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায় যে, একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে আদালতই মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির শেষ আশ্রয়স্থল। যখন প্রশাসন ব্যর্থ হয়, যখন ক্ষমতাবানদের প্রভাব সাধারণ মানুষকে অসহায় করে তোলে, তখন নাগরিকগন নিরুপায় হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আজ এক গভীর জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মামলা জট, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয়, দুর্নীতি, তারিখের পর তারিখ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, আইনজীবী ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীর কাছে আদালত ন্যায়বিচারের স্থান না হয়ে মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক কষ্টের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে লক্ষ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে। একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে কখনও কখনও ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফৌজদারি মামলাও বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে বিচারপ্রার্থীরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না, তাদের জীবনের মূল্যবান সময়ও নষ্ট হয়। অনেকে মামলার রায় পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন, আর তাদের উত্তরসূরিরা মামলার বোঝা টেনে নিয়ে বেড়ান। “Justice delayed is justice denied”—বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া—বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই কথাটি যেন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিচারপ্রার্থীদের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের একটি হলো ঘন ঘন তারিখ পরিবর্তন। আদালতে হাজির হওয়ার পরও মামলার শুনানি না হওয়া, সাক্ষী উপস্থিত না থাকা, কাগজপত্র প্রস্তুত না থাকা কিংবা আইনজীবীর অনুপস্থিতির কারণে নতুন তারিখ দেওয়া যেন একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। একজন সাধারণ মানুষকে একটি মামলার জন্য বারবার আদালতে যেতে হয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট করতে হয় এবং যাতায়াত ও আইনজীবীর পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। গ্রামাঞ্চল থেকে আসা অনেক মানুষকে দিনের পর দিন শহরে অবস্থান করতে হয়, যা তাদের জীবিকা ও পারিবারিক জীবনে নিদারুণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আদালতপাড়ায় দালালচক্র ও দুর্নীতির বিস্তার। অনেক বিচারপ্রার্থী আইনগত জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় বিভিন্ন দালালের খপ্পরে পড়েন। নথি তোলা, কপি সংগ্রহ, তারিখ জানা কিংবা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পেতে গিয়েও অনেকে হয়রানির শিকার হন। যদিও দেশের বিচারব্যবস্থায় বহু সৎ ও দক্ষ বিচারক এবং আইনজীবী রয়েছেন, তবুও কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে পুরো বিচার ব্যবস্থার ভাবমূর্তি আজ ভয়ানক ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

বিচারব্যবস্থার গুরুতর এই সংকটের পেছনে রয়েছে কাঠামোগত সমস্যা। দেশে বিচারপ্রার্থী জনসংখ্যার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। একইসঙ্গে আদালতের অবকাঠামো, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি তো রয়েছেই। অনেক আদালতে এখনো ফাইলভিত্তিক পুরোনো পদ্ধতি চালু আছে, যার ফলে নথি হারিয়ে যাওয়া, বিলম্ব এবং অদক্ষতা বেড়েই চলেছে। এছাড়া সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরাই দেশের সবচেয়ে বড় মামলাকারী হওয়ায় স্বভাবতই আদালতের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

রাষ্ট্রের করণীয় তাই বহুমাত্রিক। প্রথমত, বিচারক ও আদালতের সংখ্যা প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাড়াতে হবে। জনসংখ্যা ও মামলার চাপ অনুযায়ী নতুন আদালত স্থাপন এবং পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত ডিজিটালাইজ করতে হবে। ই-ফাইলিং, অনলাইন কজলিস্ট, ভার্চুয়াল শুনানি এবং ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট চালু করা গেলে সময় ও ভোগান্তি বহুলাংশে হ্রাস পাবে। তৃতীয়ত, মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

একইসঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বা Alternative Dispute Resolution (ADR)-এর ব্যবহার বাড়ানো অত্যাবশ্যক।পারিবারিক, বাণিজ্যিক ও ক্ষুদ্র দেওয়ানি বিরোধ আদালতের বাইরে মধ্যস্থতা ও সালিশের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে আদালতের উপর চাপ অনেকাংশে কমে যাবে। এছাড়া দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি ও কার্যকর করতে হবে, যাতে অর্থের অভাবে কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।

দুর্নীতি ও দালালচক্র দমনে কঠোর নজরদারি অপরিহার্য। আদালতপাড়ায় স্বচ্ছ তথ্যসেবা, হেল্পডেস্ক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল না হতে হয়। একইসঙ্গে বিচারকদের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যদি বিচার পেতে মানুষকে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়, সর্বস্ব হারাতে হয় কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে হয়, তাহলে সেই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিচারব্যবস্থা কেবল আদালতের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির প্রতিফলন। তাই বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো শুধু প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়, এটি একটি মানবিক ও জাতীয় দায়িত্ব।

একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর আইনের শাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা কিংবা গণতন্ত্র—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। তাই এখনই সময় বিচারব্যবস্থাকে জনবান্ধব, দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলার। এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা যে, বিচারপ্রার্থীর কষ্ট যত দীর্ঘ হয়, রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তিও তত দুর্বল হয়ে পড়ে।

মো: মুখলেছুর রহমান,
সমাজচিন্তক, অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মী।
mukhles1975@gmail.com