কাচপুর–কুমিল্লা–ফেনী–মীরসরাই হয়ে চট্টগ্রামে সমাবেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক: গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ ছয় দফা দাবিতে আজ শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে শান্তিপূর্ণ লংমার্চ করবে ১১ দলীয় ঐক্য।
লংমার্চ সফল করতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সর্বশেষ প্রস্তুতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কর্মসূচিতে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত কয়েকটি স্থানে পথসভা এবং চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জনসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করবে।
লংমার্চের পথে কয়েকটি নির্ধারিত স্থানে পথসভা হবে। আয়োজকদের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, প্রথম পথসভা হবে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায়। এরপর কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও মীরসরাইয়ে পথসভা করার কথা রয়েছে। কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
আয়োজকদের দাবি, লংমার্চের রুটের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষ দাঁড়িয়ে কর্মসূচিকে স্বাগত জানাবেন।
প্রস্তুতি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ১১ দলের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। কোনো ধরনের নাশকতার আশঙ্কা তাঁরা করছেন না। অংশগ্রহণকারীদের ধৈর্য, সাহস ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গোলাম পরওয়ার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিরোধী দলের বড় এই শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা উচিত। তাঁর ভাষায়, কর্মসূচিতে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে সরকার ও সরকারি দলের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে পারে এবং তাঁরা জনরোষের মুখে পড়তে পারেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার বা সরকারি দলের কেউ এমন কোনো ‘অপরিণামদর্শী’ পদক্ষেপ নেবে না, যা কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে পারে।
লংমার্চের অন্যতম প্রধান দাবি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, সরকার গঠনের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, গণভোটের গণরায়ে কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নেই এবং গণভোটে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, জুলাইয়ের আন্দোলনে রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ১১ দল সরকার উৎখাতের আন্দোলন করছে না। বরং গণভোটের গণরায় এবং তাঁদের ঘোষিত ছয় দফা দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।
ব্রিফিংয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই বিরোধী দলগুলো জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে নিয়মতান্ত্রিক, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা এবং অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রমাণ দেওয়ার সময় এসেছে।
লংমার্চে অংশ নেওয়া গাড়িগুলোতে স্টিকার থাকবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। চলন্ত অবস্থায় কোনো গাড়ি মূল বহরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। কেউ যুক্ত হতে চাইলে তাকে বহরের শেষে যুক্ত হতে হবে।
পথসভাগুলোতে লংমার্চের ডেলিগেটরা গাড়ি থেকে নেমে অংশ নেবেন না। স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠনগুলো এসব পথসভা বাস্তবায়ন করবে বলে জানানো হয়েছে।
গণমাধ্যমের গাড়িগুলোও সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের সুবিধার্থে গাড়িবহরের সঙ্গে চলতে পারবে।
১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর্মসূচির বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের মহাপরিদর্শককে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রশাসন কর্মসূচির নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
লংমার্চকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা যাতে না ঘটে, সে জন্য অংশগ্রহণকারী নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকালের প্রস্তুতি বৈঠকে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম এবং জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন।
এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
১১ দলের ঘোষিত কর্মসূচির মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং ‘সংকীর্ণ দলীয়করণ’ বন্ধ করা।
আয়োজকেরা দেশবাসী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের শান্তিপূর্ণভাবে, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের সঙ্গে লংমার্চে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী এই কর্মসূচি সফল হবে।