• ঢাকা |

আমলাতন্ত্রের জটিলতায় চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৮ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো: মুখলেছুর রহমান: রাষ্ট্রের সঙ্গে একজন নাগরিকের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় প্রশাসনিক সেবার মাধ্যমে। একজন মানুষ যখন জন্মনিবন্ধন করতে যান, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করেন, পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন, জমির খতিয়ান সংগ্রহ করেন, ব্যবসার লাইসেন্স নেন কিংবা কোনো সরকারি ভাতা বা সেবার জন্য আবেদন করেন—তখন তিনি রাষ্ট্রকে দেখেন প্রশাসনের মুখে। সেই অভিজ্ঞতা যদি হয় হয়রানি, দীর্ঘসূত্রিতা, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র, অস্পষ্ট নিয়ম এবং এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরে বেড়ানোর, তাহলে রাষ্ট্র সম্পর্কে নাগরিকের ধারণাও নেতিবাচক হয়ে ওঠে। আর যদি অভিজ্ঞতা হয় দ্রুত, স্বচ্ছ ও সম্মানজনক সেবার, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসও শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশে উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতির কথা বলা হয়। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক। কিন্তু একই সময়ে সাধারণ মানুষ এখনো প্রতিদিন এমন এক আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে একটি সাধারণ কাজ সম্পন্ন করতেও অসংখ্য ধাপ অতিক্রম করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মের চেয়ে নিয়মের ব্যাখ্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আর সেবার চেয়ে প্রক্রিয়াই হয়ে দাঁড়ায় মূল বিষয়।

প্রশাসনিক জটিলতা কোনো নতুন সমস্যা নয়। উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে সেবা দেওয়া নয়, বরং শাসন করা। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও সেই মানসিকতার অনেক উপাদান প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে রয়ে গেছে। ফলে নাগরিককে এখনো অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতা নয়, বরং আবেদনকারী বা অনুগ্রহপ্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সংস্কৃতি একটি গণতান্ত্রিক ও নাগরিকমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আমলাতন্ত্রের অন্যতম বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকেন্দ্রিকতা। কোনো কাজের যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়। একটি তথ্য সরকারের এক দপ্তরের কাছে থাকা সত্ত্বেও নাগরিককে বারবার সেই একই তথ্য বিভিন্ন দপ্তরে জমা দিতে হয়। প্রযুক্তির যুগে এটি শুধু অদক্ষতার পরিচয় নয়, বরং নাগরিকের সময় ও শ্রমের প্রতি অবজ্ঞারও বহিঃপ্রকাশ।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রশাসনিক জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে। যখন কোনো কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না, যখন প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ থাকে এবং যখন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনার ওপর ফলাফল নির্ভর করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনিয়মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মানুষ তখন বৈধ পথের পরিবর্তে শর্টকাট খুঁজতে বাধ্য হয়। এতে শুধু সুশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও কমে যায়।

অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব কম নয়। একজন উদ্যোক্তা যদি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য মাসের পর মাস অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকেন, একজন বিনিয়োগকারী যদি বিভিন্ন দপ্তরের জটিলতায় আটকে যান কিংবা একজন ব্যবসায়ী যদি প্রয়োজনীয় সেবা পেতে অযথা সময় ব্যয় করেন, তাহলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের ওপর। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবসা সহজীকরণের সূচকগুলোতেও প্রশাসনিক দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা কেবল জনদুর্ভোগ নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও অন্তরায়।

বাংলাদেশে গত এক দশকে ডিজিটাল সেবার প্রসার ঘটেছে, যা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু ডিজিটালাইজেশন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত হয়। শুধু কাগজের ফরমকে অনলাইন ফরমে রূপান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যদি অনলাইনে আবেদন করার পরও নাগরিককে একই কাগজপত্র নিয়ে বারবার অফিসে যেতে হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত ডিজিটাল রূপান্তর নয়। প্রকৃত সংস্কার হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্যভান্ডার পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে এবং নাগরিককে একই তথ্য বারবার জমা দিতে হবে না।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি নাগরিকের সময়ের মূল্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করে? একজন সাধারণ মানুষের জন্য একটি দিনের কর্মঘণ্টা হারানো, বারবার অফিসে যাওয়া কিংবা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধা নয়; এটি অর্থনৈতিক ক্ষতিও। উন্নত প্রশাসনিক সংস্কৃতির দেশগুলোতে নাগরিকের সময়কে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমলাতন্ত্রের জটিলতা অনেক সময় শুধু নিয়মের কারণে নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনীহা এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণেও তৈরি হয়। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের যথাযথ ক্ষমতা প্রদান, সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন এবং নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘সিটিজেন চার্টার’, ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’, ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেম’ এবং ‘ডিজিটাল গভর্নেন্স’-এর মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। বাংলাদেশেও এসব উদ্যোগ আংশিকভাবে রয়েছে, কিন্তু সেগুলোকে আরও কার্যকর ও বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশেষ করে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন কাজ কত দিনে সম্পন্ন হবে, কেন বিলম্ব হচ্ছে এবং দায়িত্ব কার—এসব বিষয়ে নাগরিকের জানার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের শক্তি তার আইন বা প্রতিষ্ঠান থেকে যতটা আসে, তার চেয়েও বেশি আসে নাগরিকের আস্থা থেকে। সেই আস্থা গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ অনুভব করে যে রাষ্ট্র তাকে সম্মান করে, তার সময়ের মূল্য দেয় এবং তার অধিকারকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে।

বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে যাত্রার কথা বলছে। কিন্তু উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়ন মানে এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিককে সেবা পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করতে হবে না। যেখানে সরকারি অফিসে যাওয়া মানেই অনিশ্চয়তা নয়, বরং নির্ভরযোগ্যতা। যেখানে নিয়ম মানুষের জন্য, মানুষ নিয়মের জন্য নয়।

আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সেই আমলাতন্ত্র যদি নাগরিকের সহযোগী না হয়ে প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে, তাহলে উন্নয়নের অর্জনও অনেকাংশে ম্লান হয়ে যায়। তাই সময় এসেছে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে সেবাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করার। নাগরিকের ভোগান্তি কমানো শুধু দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্র, সুশাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস পুনর্গঠনেরও প্রশ্ন। উন্নত রাষ্ট্রের পথে এগোতে হলে এই সংস্কার আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

মো: মুখলেছুর রহমান।

[অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী]