• ঢাকা |

বঙ্গভবনে নতুন অধ্যায়: ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শপথ পড়ান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে এলেন। এর এক দিন আগে, ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৯টি ভোটের মধ্যে
শুক্রবার সন্ধ্যায় শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে বঙ্গভবনে ছিল রাষ্ট্রীয় আয়োজনের আবহ। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বঙ্গভবনে পৌঁছালে সামরিক সচিব ও অন্যান্য সচিব তাঁকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান এবং নির্ধারিত ভিভিআইপি আসনে নিয়ে যান।

এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান। প্রধানমন্ত্রী ও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি একসঙ্গে দরবার হলে প্রবেশ করলে রাষ্ট্রপতির আগমনী সুরের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলকে স্বাগত জানানো হয়। পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কূটনীতিকসহ বিশিষ্ট অতিথিরা।

অতিথিরা আসন গ্রহণের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা উপস্থাপন করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অনুরোধের পর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

শপথ শেষে রাষ্ট্রপতি ও বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি পরস্পরের আসন পরিবর্তন করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ও নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ-সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও নতুন রাষ্ট্রপতি পরস্পরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

রাষ্ট্রপতির শপথের পর বঙ্গভবনে সম্পন্ন হয় সরকারের মন্ত্রিসভায় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির আনুষ্ঠানিকতাও। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করান। এটি নতুন সরকারের প্রথম বড় মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাসের অংশ।

নতুন দায়িত্ব পাওয়া সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীসহ অন্যরা। নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তরও নির্ধারণ করা হয়েছে।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আবারও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বঙ্গভবনের এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান।

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া শুধু ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক পালাবদর নয়; বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। নির্বাচন কমিশন একই দিন তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

রাষ্ট্রপতির পদ সাংবিধানিকভাবে মূলত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধানের পদ হলেও রাষ্ট্রীয় সংকট, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে এ পদের গুরুত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

শপথ নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের নতুন অধ্যায়। শনিবার সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি রয়েছে। এরপর রোববার তাঁর আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনে ওঠার কথা রয়েছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আসা মির্জা ফখরুলের জন্য এটি যেমন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক ঐতিহাসিক বাঁক, তেমনি দেশের জন্যও নতুন রাজনৈতিক পর্বের সূচনা। বঙ্গভবনের দরবার হলে শুক্রবার সন্ধ্যার শপথ তাই কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন একটি অধ্যায়।