• ঢাকা |

সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন নিয়ে জামায়াতের আপত্তি


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

‘বর্তমান আইন বহাল রেখে সংশোধিত খসড়া বাতিল করতে হবে’

এমএম রহমাতুল্লাহ: সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা দাবি করেছেন, প্রস্তাবিত সংশোধিত খসড়া কার্যকর হলে বাকস্বাধীনতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকার আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা চলতি বছরের ২১ মে গেজেট প্রকাশিত সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ বহাল রেখে সংশোধিত খসড়া বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন।

‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ : নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সোমবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের উদ্যোগে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান সরকারের বয়স সাত মাস এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের বয়স চার-পাঁচ মাস। এত অল্প সময়ের মধ্যে কেন আইনটি সংশোধনের প্রয়োজন হচ্ছে—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, “সরকারের মধ্যে অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে।” তার দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ হিসেবে পাস হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, সংশোধনের মাধ্যমে বিরোধী মত ও গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে। তিনি সরকারকে এ উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

‘বাকস্বাধীনতার জন্য হুমকি’

সেমিনারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে একটি নির্বাচিত সরকার কীভাবে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে, তার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। তিনি সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিলের সমালোচনা করে বলেন, জনগণের রায় মেনে নেওয়া উচিত।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ সংসদে পাস হওয়ার পর এখন আইনটি সংশোধনের জন্য খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তার দাবি, প্রস্তাবিত সংশোধিত আইন বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

তিনি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য ওয়েজ বোর্ড গঠন না হওয়ায় বৈষম্যের অভিযোগও তোলেন। তার মতে, প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য অষ্টম ওয়েজ বোর্ড গঠন হলেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইন এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যেখানে সরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, কিন্তু জনগণের সমালোচনার সুযোগ সীমিত হবে।

তিনি দাবি করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানির ক্ষেত্রে যে শাস্তির বিধান ছিল, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে তা আরও কঠোর করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা চূড়ান্ত আইনি পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

‘গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা’

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য নাজমুন নাহার নিলু এমপি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। তার অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে মামলা বা আটকের ঘটনা ঘটলেও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা মিথ্যাচারের ক্ষেত্রে একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম বলেন, সরকারের দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মতো বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে যাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করা না যায়, সে উদ্দেশ্যে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লা সিবগা বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার যে নিশ্চয়তা রয়েছে, সাইবার সুরক্ষা আইনের নামে তা সীমিত করা উচিত নয়। তিনি সাংবাদিক সমাজকে প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ

খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক রফিকুজ্জামান রুমান।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া টিমের সদস্য মো. জাহিদুর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন গ্রীনওয়াচের সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক জনতার সম্পাদক ওবায়দুর রহমান শাহীন, দৈনিক আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ, দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান, এনটিভির হেড অব নিউজ ফখরুল আলম কাঞ্চন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ব্যারিস্টার আল মামুন রাসেল এবং ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ হিসেবে চলতি বছরের ২১ মে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের দাবি, ওই আইন বহাল রেখে সংশোধনের উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে সাংবাদিক আবুল আসাদ বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের নামে এমন কোনো আইন করা উচিত নয়, যা জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত করে। তিনি সরকারকে সংশোধনের উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

সেমিনারে বক্তাদের বক্তব্যে মূলত সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা এবং একই সঙ্গে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়—এই ভারসাম্যের প্রশ্নটিই গুরুত্ব পায়। প্রস্তাবিত সংশোধনীর চূড়ান্ত আইনি ভাষা, সংশ্লিষ্ট বিধান এবং বাস্তব প্রয়োগের ধরনই এ বিষয়ে পরবর্তী বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠবে।