শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা নিরসনে সংলাপ, মজুরি বোর্ডের সভা ও গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তি চায় সংগঠনটি
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ এবং শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ, দ্রুত মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শুরু এবং শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এসব দাবি জানান।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, ঢাকা, সাভার, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। এর প্রভাবে ঢাকা, গাজীপুর ও আশুলিয়ার অন্তত ৬৭৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিকদের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে আন্দোলনকে রাজনৈতিক ইন্ধন হিসেবে আখ্যায়িত করে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। এতে শ্রমিক অসন্তোষ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ছাত্রশিবির নেতারা বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম ও অবদানে এ খাত দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ জোগান দিচ্ছে। অথচ দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ২০২৩ সালে নির্ধারিত পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিবৃতিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ও আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তাঁরা বলেন, একই বাজারব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করেও পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে ষড়যন্ত্র বা উসকানি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা দ্বিচারিতার শামিল। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের জন্য সম্মানজনক ও যৌক্তিক মজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পোশাকশিল্পকে ঘিরে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের আশঙ্কার বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তাঁরা। শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি কিংবা বাংলাদেশবিরোধী কোনো অপশক্তি নাশকতা বা ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সজাগ থাকার পরামর্শ দেন ছাত্রশিবির নেতারা।
তবে সংকট মোকাবিলায় দমন-পীড়ন নয়, বরং মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। তাঁদের মতে, পোশাকশিল্পের ব্যস্ততম মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শিল্পের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকেও দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে অবিলম্বে মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা আহ্বান, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়ন ও হয়রানি বন্ধ এবং গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তির দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্তেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করে দ্রুত সংকটের সমাধান করা না গেলে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।