নন-এমপিওর সংকট, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা
নিজস্ব প্রতিবেদক: বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন পিরোজপুরে দুটি কলেজে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সাত শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো নাজিরপুর উপজেলার দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ এবং পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট ২৪ জন শিক্ষক থাকলেও কলেজ শাখার এমন ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নন-এমপিওভুক্তি, শিক্ষক সংকট, নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়া এবং নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতি ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।
রোববার সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির ফলাফল ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, নাজিরপুরের দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এবার পাঁচজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই ফেল করেছে । অন্যদিকে, কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তিনজন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও পরীক্ষায় অংশ নেয় দুজন। তাদের দুজনই ফেল করেছে।
নাজিরপুরের দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের কলেজ শাখা ২০১৪ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তবে গত চার বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবছরই পাসের সংখ্যা কমেছে।
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয় ১৮ জন। ২০২৪ সালে ২৭ জনের মধ্যে পাস করে ১৩ জন। ২০২৫ সালে ১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় মাত্র ৫ জন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে মানবিক বিভাগের পাঁচজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেনি।
প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস বলেন, ২০১৪ সালে পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে প্রতিবছরই প্রতিষ্ঠানটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকরা সরকারিভাবে কোনো বেতন-ভাতা পান না। ফলে তাঁরা আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
তিনি আরও বলেন, নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায় না। তারপরও কলেজটি টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা ক্লাস করার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও কলেজে আসে না। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রোববার ৬ জন শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও কলেজে আসেনি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না হলে ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখা ২০২৩ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় পাসের হার সন্তোষজনক ছিল না।
২০২৩ সালে ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ছয়জন। ২০২৪ সালে সাতজনের মধ্যে ৩ জন এবং ২০২৫ সালে সাতজনের মধ্যে ৪ জন উত্তীর্ণ হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালে৩ জন পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও পরীক্ষায় অংশ নেয় দুজন। তাদের কেউই পাস করতে পারেনি।
তবে প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায় রয়েছে ভিন্ন চিত্র। গত চার বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে বিদ্যালয়টি।
২০২৩ সালে ৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ৭৫ জন। ২০২৪ সালে ৭৫ জনের মধ্যে ৬৯ জন, ২০২৫ সালে ৭০ জনের মধ্যে ৪৮ জন এবং ২০২৬ সালে ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৯০ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬ জন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী রয়েছেন।
কদমতলা এলাকার শিক্ষার্থী অভিভাবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, গত বছর কলেজটিতে নতুন করে কেউ ভর্তি হয়নি। আগের বছর যে দুজন শিক্ষার্থী ছিল, তারাই এবার পরীক্ষা দিয়েছে। তারা গত বছরও ফেল করেছে, এবারও ফেল করেছে। এ কারণে কলেজ শাখার ফলাফল খারাপ হয়েছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই ভর্তি হবে। এতে ফলাফলও ভালো হবে বলে আশা করি।
আরেক অভিভাবক সুমি আক্তার বলেন, এখানে স্কুল শাখার পাশাপাশি কলেজ শাখাতেও ভালো ফলাফল হতো। তবে জানতে পেরেছি, গত বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল, তারাই এবার আবার পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছে।
কদমতলা এলাকার বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহ ও সুলতানা জেসমিন মাহিনুর বলেন, তাঁরাও এ প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া করেছেন। বিদ্যালয়টির এসএসসির ফলাফল বেশ ভালো। ২০২৩ সালে এখানে কলেজ শাখা চালু হয়েছে। কিন্তু কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা অন্য কলেজে ভর্তি হচ্ছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানেই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। এতে তাঁদের সন্তানদের দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে না। এ জন্য তাঁরা কলেজটি এমপিওভুক্ত করার জোর দাবি জানান।
প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যালয় শাখার ফলাফল ভালো। কলেজ শাখার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল। তবে এ বছর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটি গ্রাম পর্যায়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজ শাখায় পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষকদের দিয়েই কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য শহরমুখী হতে হবে না। তারা নিজ প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক ভালো ফলাফল ধরে রাখা সম্ভব হবে।
এদিকে, বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছয় জেলার মধ্যে পাসের হারে এবার শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল জেলা। তবে জেলার সামগ্রিক ফলাফলেও বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। গত দুই বছরে পাসের হার কমেছে ৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট। ২০০৯ সাল থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানের মধ্যে এবারই জেলায় সর্বনিম্ন পাসের হার।
শনিবার সকালে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জেলাভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া যায়।
এ বছর পিরোজপুর জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৭ হাজার ৯৮ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬ হাজার ৭৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে তিন হাজার ৪৯৬ জন। জেলায় পাসের হার ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৬ জন শিক্ষার্থী।
জেলার গত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে পাসের হার আরও কমে হয়েছে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে জেলাভিত্তিক সভা করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশই নন-এমপিওভুক্ত।
তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।