• ঢাকা |

জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে: ডা. শফিকুর রহমান


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মুক্তির সংবর্ধনায় বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা, প্রবাসীদের অধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে বক্তব্য

রাফি রহমাতুল্লাহ: জনগণের অধিকার, সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না। জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে।

 

কারাভোগ শেষে জামায়াতে ইসলামীর নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মুক্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

 

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এক মাস তিন দিন কারাভোগের পর মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। তিনি কোনো অন্যায় করেননি; বরং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে কারাভোগ করতে হয়েছে।

 

তিনি বলেন, বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে দীর্ঘসময় অপেক্ষা, ট্রলির সংকট, লাগেজ থেকে মালামাল চুরি এবং অন্যান্য অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন মেজর আখতারুজ্জামান। তার প্রতিবাদের ভাষা কঠিন হলেও তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া ও সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে, যা তার ভাষ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ মিথ্যা।

 

বিমানবন্দরের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, মেজর আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর দুই দফায় নতুন ট্রলি সংযোজন, লাগেজ বেল্টে ক্যামেরা স্থাপন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যাত্রীরা আগের তুলনায় দ্রুত লাগেজ পাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 

তার মতে, এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, মেজর আখতারুজ্জামান যেসব সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন, সেগুলোর বাস্তবতা ছিল। তার প্রতিবাদের সুফল এখন সাধারণ যাত্রী, বিশেষ করে প্রবাসীরা পাচ্ছেন।

 

গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রবাসীরাও সভা-সমাবেশ, মিছিল ও বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাওয়ের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে যারা কথা বলেন, তাদের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

 

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা, রিমান্ডে নেওয়া এবং আদালত প্রাঙ্গণে তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, মামলা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাবে না।

 

সরকারের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও অদক্ষতার সমালোচনা মোকাবিলা না করে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে কোনো লাভ হবে না। বিরোধী দলের চরিত্র হননের চেষ্টা বাদ দিয়ে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের সমস্যা সমাধান করতে পারলে জনগণই সরকারকে সমর্থন করবে।

 

তিনি আরও বলেন, অতীতের মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলে দেশের মানুষ তা মেনে নেবে না। সুসময়ে যারা পাশে থাকেন, দুঃসময়ে তাদের অনেককেই পাওয়া যায় না। তাই সাময়িক সমর্থন ও প্রশংসায় বিভ্রান্ত না হয়ে জনগণের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে সরকারের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

 

অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার কারাভোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, জনগণের পক্ষে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে এবং ইসলামের পক্ষে কথা বলার সাহস মহান আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির প্রতিবাদ করায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

 

গ্রেফতারের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তাকে গ্রেফতার করতে হলে আইন অনুযায়ী গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখাতে হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। কারণ, তিনি কোনো অন্যায় করেননি এবং আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো কিছু মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।

 

তবে গ্রেফতারে আপত্তি না থাকলেও তাকে রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

 

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মেজর আখতারুজ্জামান বলেন, তার চোখ বেঁধে জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে পুলিশ কেন জানতে চাইবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

 

তার বক্তব্য, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ তদন্ত করতে পারে এবং অপরাধের তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নামে জিজ্ঞাসাবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

জামিন প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, নিম্ন আদালতে জামিন না পাওয়ার পর তাকে উচ্চ আদালতে নেওয়া হয়। সেখানে জামিন পাওয়ার পরও বিষয়টি চেম্বার আদালতে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের আইনি ব্যবস্থা পরিচালনা করতে চাইলে জনগণ তা মেনে নেবে না।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এভাবে দেশ পরিচালনা করতে চাইলে বাংলাদেশের মানুষ তা গ্রহণ করবে না। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা প্রতিবাদ ও আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।

 

প্রবাসীদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে তাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করতে দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য একটি রিসিপশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে।

 

ভবিষ্যতে প্রবাসীদের সমস্যা, অধিকার ও কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি জামায়াত আমিরের প্রতি বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।

 

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের মুক্তির পর দেশবাসী যেভাবে সহানুভূতি, সমর্থন ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, সে জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকার প্রশংসা করে তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

 

অন্যদিকে, কারাভোগের সময় পাশে থাকা এবং মুক্তির পর সংবর্ধনার আয়োজন করায় জামায়াতে ইসলামীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।

 

অনুষ্ঠানের বক্তব্যে উভয় নেতা জনগণের অধিকার, প্রবাসীদের কল্যাণ, বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশবাসী ও প্রবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা পাশে থাকবেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। ইনশাআল্লাহ, সত্যের জয় হবে।