এমএম রহমাতুল্লাহ: সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, ডিলার নিয়োগে বিদ্যমান নীতিমালা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনা ও আর্থিক লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারসংকট তৈরি হয়েছে, যার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কৃষকদের।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছয় দফা দাবি জানান।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ করা হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনে। তাঁর দাবি, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ, কালোবাজারে সার বিক্রি এবং চোরাচালানের কারণে সারসংকট আরও প্রকট হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পরিবর্তে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য সামনে আসছে। তাঁর অভিযোগ, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা কাজ করেছে। জেলা পর্যায়ে গঠিত কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করায় যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।
জামায়াতের এই নেতা আরও অভিযোগ করেন, বিএনপির নেতারা অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দিয়েছেন। কিছু এলাকায় দলীয় প্যাডে দেওয়া তালিকার ভিত্তিতেও ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। দিনাজপুর ও রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর একটি অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিএনপির ১৪ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকায় সারসংকট দেখা দিয়েছে এবং কৃষকেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাঁর দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক এলাকার বাসিন্দাকে অন্য এলাকায় ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। আবার আগে কখনো সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না থাকা ব্যক্তিরাও ডিলারশিপ পেয়েছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ডিলারশিপ পেয়েছেন এবং ভুয়া গুদাম ও চুক্তিনামা ব্যবহার করেও কেউ কেউ ডিলার হয়েছেন। রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় বিএনপির প্যাডে দেওয়া ডিলার নিয়োগের তালিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নাম থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা স্বাধীন তদন্তের ফলাফল তুলে ধরা হয়নি।
সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামায়াত ছয় দফা দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অবিলম্বে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া; ডিলার নিয়োগের যোগ্যতার মানদণ্ড, তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি প্রকাশ করা; এবং ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া সারসংকট নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতির অসংগতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ, ডিলার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের লিখিত ব্যাখ্যা এবং তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী না করার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকার সারসংকটের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে জাতিকে অসত্য তথ্য দিয়েছে। গত ছয় থেকে সাত মাসে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয়করণ, দুর্নীতি ও মন্ত্রীদের বক্তব্য নিয়ে তাঁর দল উদ্বিগ্ন। ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে পরিস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সারসংকটের পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের এই নেতা।
তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নমুক্ত একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নিজেদের সুবিধামতো সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গোলাম পরওয়ারের দাবি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং অনুমোদিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া উচিত। এ প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত না করার প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিতর্ক রাজপথে ঠেলে না দিয়ে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে।
আগামী সংসদ অধিবেশনে সরকার বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে গণভোটে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সার, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, এর প্রভাব পড়ছে দ্রব্যমূল্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষক ও নগরজীবনের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সার ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা গেলে কৃষকদের সারপ্রাপ্তি সহজ করার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলতে পারে। তবে জামায়াতের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নিয়োগপ্রক্রিয়ার নথিপত্র এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।