• ঢাকা |

জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে আট গ্রন্থ, ‘ইতিহাস বিকৃতির’ বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ঢাবি সংবাদদাতা: জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ঘিরে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো স্মৃতি, ইতিহাস ও সাহিত্যকে কেন্দ্র করে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা বিভাগ আইসিএস পাবলিকেশনস জুলাই আন্দোলনকে উপজীব্য করে প্রকাশিত আটটি নতুন গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেছে। তবে অনুষ্ঠানটি কেবল বই প্রকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বক্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং আন্দোলনের চেতনাকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ও।

শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘রক্তে ভেজা সবুজ ডানা’, ‘এক মুঠো রোদ’, ‘আমার জুলাই’, ‘জুলাই বাংলা বর্ণমালা’, ‘জুলাই স্মৃতি (দ্বিতীয় খণ্ড)’, ‘জুলাই রেভল্যুশন ওয়ালস’, স্পিরিট অফ জুলাই ’২৪ এ-জেড এবং ‘মক্তব’—এই আটটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও চেতনাকে আড়াল বা খাটো করার যেকোনো প্রচেষ্টা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে। একই সঙ্গে তারা গবেষণা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে আন্দোলনের স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সবচেয়ে বড় অপচেষ্টা হলো জুলাই আন্দোলনকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা, যা তিনি বিভাজনমূলক রাজনীতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, জুলাই ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি গণআন্দোলন। তাই দেশের ভেতরে বা বাইরে এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তার মোকাবিলা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অন্যায়মুক্ত একটি বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যেই জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং অতীতের বিভিন্ন ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো তথ্য-উপাত্তনির্ভরভাবে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরা। তাঁর মতে, গবেষণা, সাহিত্য, গল্প-উপন্যাস এবং অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের স্মৃতি ও চেতনা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

তিনি জানান, জুলাই আন্দোলন নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা, শিশু-কিশোরদের জন্য সাহিত্য এবং দেশব্যাপী স্মৃতিলেখন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে বলেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে থাকার ঘোষণা দেন।

বিশেষ অতিথি ও সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম বলেন, জুলাইকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের পথচলা সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের শুরু থেকেই ইসলামী ছাত্রশিবির বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠে সক্রিয় ছিল এবং ভবিষ্যতেও সংগঠনটির দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।

তিনি লেখক, গবেষক ও প্রকাশকদের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের ইতিহাস পৌঁছে দিতে সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, একটি জাতির ইতিহাস শুধু ইতিহাসের বইয়ে নয়; উপন্যাস, নাটক, শিল্প ও সাহিত্যের মধ্যেও জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের অভিজ্ঞতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জুলাই কোনো একক সংগঠনের আন্দোলন ছিল না; বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও অসংখ্য সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণেই এটি গড়ে উঠেছে। তাই জুলাইয়ের চেতনাকে সব রাজনৈতিক শক্তির ধারণ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ, অধ্যাপক সাইফুল আরেফিন লেনিন, কথাসাহিত্যিক ও কবি সোলায়মান আহসান, লেখক জুয়ায়ের হুসাইন এবং জুলাই শহীদ নাসির হাসান রিয়ানের পিতা মো. গোলাম রাজ্জাকসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনুষ্ঠানের সার্বিক আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহকে কেবল রাজনৈতিক স্মৃতি হিসেবে নয়, বরং গবেষণা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণযোগ্য জাতীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ওপর জোর দিচ্ছেন আয়োজকেরা। তাঁদের ভাষ্য, ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে তুলতে বই, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, শিশুতোষ সাহিত্য এবং সৃজনশীল প্রকাশনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।