• ঢাকা |

টেক্সটাইল খাতের সমস্যা সংসদে তুলে ধরার আশ্বাস জামায়াতে ইসলামীর


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

এম এম রহমাতুল্লাহ: বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত টেক্সটাইল শিল্পের বিদ্যমান সমস্যা জাতীয় সংসদে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ আশ্বাস দেন। বৈঠকে প্রণোদনা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, কর ও শুল্ক এবং বিভিন্ন নীতিগত জটিলতাসহ টেক্সটাইল খাতের নানা সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।

 

ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধীদল হিসেবে সরকারের সব কাজের বিরোধিতা করা তাঁদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয়। তাঁরা একটি গঠনমূলক বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে চান। সরকারের যেসব উদ্যোগ জনস্বার্থ ও দেশের কল্যাণে হবে, সেসব কাজে সহযোগিতা করা হবে। আর জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে সমালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজন হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

 

বিটিএমএর নেতারা বৈঠকে টেক্সটাইল খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যয় এবং নীতিগত বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার পর ডা. শফিকুর রহমান রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিশ্চিত করা, দেশীয় প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখা, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন।

 

একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও সংরক্ষণ, সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ এবং অবৈধ আমদানি প্রতিরোধের বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন।

 

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পকে টেকসইভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব। এতে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে। এ খাতের স্বার্থে বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

 

তিনি বলেন, শিল্প ও উৎপাদন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে টেক্সটাইল খাতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই এ খাতের যৌক্তিক সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার, বিরোধী দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

প্রেস ব্রিফিংয়ে বিটিএমএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে এ খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

 

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সরকারের কাছে টেক্সটাইল খাতের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরছেন। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এরই মধ্যে কিছু সমস্যা সমাধান হয়েছে এবং অন্য বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

বৈঠকে বিশেষ করে প্রণোদনা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, কর বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন নীতিগত জটিলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও কয়েকটি কারখানা এখনো সমস্যার মুখে রয়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁরা বৈঠকে তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া এনার্জি বন্ড ও সুতার অপব্যবহারসহ সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়েও সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

 

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিটিএমএর নেতাদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয়েছে। জনগণ ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এসব বিষয় জাতীয় সংসদে তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

 

তিনি বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়। জনস্বার্থে সরকারের ভালো উদ্যোগে সহযোগিতা করা এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা বিরোধী দলের দায়িত্ব। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংসদে তুলে ধরা এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনা করাও সেই দায়িত্বের অংশ।

 

আগামী ১৮ নভেম্বর বস্ত্র ও পোশাকসংশ্লিষ্ট বাটেক্সপোর সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার প্রধান অতিথি হওয়ার দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতিতে এবার ব্যতিক্রম হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে।

 

এটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক মর্যাদার বিষয়ও জড়িত। এবার এ রীতির ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

 

তবে ডা. শফিকুর রহমান নিজে কোনো অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য দাবি বা অনুরোধ করেননি বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।

 

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কোনো খাতকে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ করা উচিত নয়। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সব পক্ষের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।

 

টেক্সটাইল খাতের কোন কোন সমস্যা এরই মধ্যে সমাধান হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে এবং কিছু সমস্যা সমাধানও হয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহসহ কয়েকটি বিষয়ে এখনো কিছু কারখানা সমস্যায় রয়েছে।

 

যেসব সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি, সেগুলো নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্বের জায়গা থেকে শিল্পখাত ও অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে বলে তিনি জানান।

 

বিরোধীদলীয় নেতা এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়। জনস্বার্থে সরকারের ভালো উদ্যোগে সহযোগিতা এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা বিরোধী দলের দায়িত্ব। জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংসদে তুলে ধরা ও সরকারের সঙ্গে আলোচনা করাও সেই দায়িত্বের অংশ।

 

বিটিএমএর পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ও আম্বার কটন মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেল, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পূর্বানী ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম সরকার, পরিচালক ও জালাল আহমেদ স্পিনিং মিলস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহিদ আলম, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হোসেন ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস লিমিটেডের (ইউনিট-২) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসেন মেহমুদ, পরিচালক ও সায়হাম কটন মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, সাবেক পরিচালক ও মোশারফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন, সেক্রেটারি জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাকির হোসেন, এনডিসি, পিএসসি, জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ জিয়াউর রহমান, ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল জিয়াউল হাসান চৌধুরী এবং প্রেসিডেন্টের পিএস আরিফ রায়হান রবিন।

 

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন এবং মাইশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা।

 

বৈঠক শেষে বিটিএমএর নেতারা ডা. শফিকুর রহমান ও জামায়াতের নেতাদের ধন্যবাদ জানান। তাঁরা বলেন, বৈঠকে টেক্সটাইল খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, বিনিয়োগ ও সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ তাঁরা পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান হবে এবং দেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্প আরও শক্তিশালী হবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।