• ঢাকা |

শিক্ষার মাধ্যমিক স্তরে সংকট: প্রয়োজন আলাদা অধিদপ্তর


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ড. দেওয়ান আযাদ রহমান: জীবন মান উন্নয়ন ও উন্নত জীবনযাপনের জন্য বিশ্বব্যাপী মানসম্মত শিক্ষার গুরুত্ব বেড়েই চলছে। শিক্ষা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ন স্তর হল মাধ্যমিক শিক্ষা। অনেক উন্নত দেশে  মাধ্যমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে প্রাপ্ত মৌলিক শিক্ষাকে সম্প্রসারিত ও সুসংহত করা, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রয়োগ কৌশলে জনশক্তি সরবরাহ করা মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য।
এ স্তরের শিক্ষা লাভ করে দেশের বিরাট জনশক্তি আর্থ -সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তাই আমাদের দেশেও মাধ্যমিক শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি আশানুরূপ নয়।
মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক নির্বাচন ও নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্কুল সংগঠন ও বিন্যাস, শিক্ষামূলক তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন সম্ভব হয়নি। এ স্তরে শিক্ষার অন্যতম উপকরণ পাঠ্যপুস্তক নির্ভুলভাবে প্রকাশিত হচ্ছে না। পাঠ্যপুস্তকে নানা অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, যা শিক্ষার সুষ্ঠু প্রক্রিয়াকে নষ্ট করছে। তাছাড়া আকর্ষণীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রে তেমন কোন ব্যবস্থাপনা নেই। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই  উন্নতমানের শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার স্বতন্ত্র অধিদপ্তর গঠনের মাধ্যমে স্তরের সফলতা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলছে। বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষার পরিধি ও পরিসর ক্রমশ বাড়ছে। মেয়েদের ভর্তির হার বৃদ্ধির জন্য উপবৃত্তি প্রদান, বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি,শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের ফলে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। সে তুলনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়েনি।
মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থাকলেও সারাদেশে বিশাল সংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে  পরিচালনা  দুরূহ।প্রশাসনিক সুবিধার্থে নয়টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬৪ জেলার শিক্ষা কার্যালয়,
৫১৬ টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস,৬৮৬ টি সরকারি কলেজ, ৭০৬ টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এবং ১০৪ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-২০১৪ এর তথ্য মতে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১২৩২ যার মধ্যে কলেজ ১৫১৪। এ কারণে এ বিশাল সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য আকাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।  অধিকন্তু সরকারি মাধ্যমিকের অধিকাংশ প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, জেলা শিক্ষক অফিসার সহ বিভিন্ন স্থানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রেষণে এনে অদক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে সুষ্ঠুভাবে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।ফলে প্রাথমিক শিক্ষার মতো মাধ্যমিক শিক্ষার গতিশীলতা নেই।
মাধ্যমিক স্তরের এ সকল সমস্যা বিবেচনা করে স্বাধীনতা উত্তর বর্ণিত সব শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এর সুপারিশ করা হয়েছে।বিশেষ করে ২০০৩ সালে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশন সুপারিশ করেছিল মাধ্যমিক স্তরের সার্বিক প্রশাসনের জন্য স্বতন্ত্র অধিদপ্তর গঠন করা হোক।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন জানুয়ারি ২০২৫ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে,"পৃথক মাধ্যমিক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। মাধ্যমিক শিক্ষার অধীনে অনেক প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে শিক্ষার মান ক্রমশ কমছে।  তাই আলাদা অধিদপ্তর গঠন জরুরি। "
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আয়োজিত জাতীয় কর্মশালা সুপারিশের ভিত্তিতে বিয়াম ফাউন্ডেশন গবেষণা ও পরামর্শ সেবা কেন্দ্র একটি প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে দুটি পৃথক অধিদপ্তরে ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছে।
শুধু তাই নয়,গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর সচিব সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি মন্ত্রণালয় /বিভাগের সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য মার্চিং অর্ডার দেওয়া হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ২৮ নভেম্বর ২০২৪ -এ দাখিলকৃত সময়নিষ্ঠ সংস্কার পরিকল্পনায় ডিসেম্বর ২০২৫ এর মধ্যে স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তাই যুগোপযোগী ও মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আলাদা অধিদপ্তরের বিকল্প নেই। যদিও বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে এবং সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার মার্চিং অর্ডারের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়,  জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের জানুয়ারি -২০২৫ প্রতিবেদন এবং মনিরুজ্জামান কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু একটি কুচক্রী মহল এ সফল উদ্যোগকে নস্যাৎ করে বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ সরকার প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক
ও  রহস্যজনক। তাই স্বতন্ত্র মাধ্যমিক অধিদপ্তর বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন।
লেখক: প্রবন্ধকার ও গবেষক