মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নড়াইল :নড়াইলের কালিয়া উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে চিকিৎসাহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আহত সাহসী সৈনিক, জুলাইযোদ্ধা সিফায়েত চৌধুরী।
এক বছর আগে উত্তাল আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আজও তিনি ফিরে যেতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। উন্নত চিকিৎসার অভাবে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ক্রমাবনতি ঘটছে।
সিফায়েত চৌধুরীর বাড়ি নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার চাপাইল গ্রামে। নয় সদস্যের বড় কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা মেধাবী এই শিক্ষার্থী আন্দোলনের সময় গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘লং মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচিতে নবীনগর এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। হঠাৎ পুলিশের গুলিতে ছয়টি ছররা গুলি লাগে তার শরীরে। এক পর্যায়ে একটি বুলেট তার কানের পেছন দিয়ে ঢুকে সামনের দিকে বেরিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় বন্ধুরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
সেই থেকেই শুরু হয় সিফায়েতের জীবনসংগ্রামের নতুন অধ্যায়। এখন তিনি প্রায় কথা বলতে পারেন না, অধিকাংশ সময় বিছানার কোণে শুয়ে থাকেন। মাথার ভেতর ঝিঁঝিঁ শব্দ শোনা যায়, বলেন উল্টাপাল্টা কথা। অনেক সময় চিনতে পারেন না পরিবারের সদস্যদেরও।
সিফায়েতের বাবা আছাদ চৌধুরী বলেন, “ঢাকায় ছেলের অপারেশনের পর কিছুদিন ওষুধ খেয়েছে, এখন তা শেষ হয়ে গেছে। তার মাথার অবস্থা ভালো না, প্রায়ই ভুলভাল কথা বলে। ওর উন্নত চিকিৎসা দরকার, কিন্তু আমরা গরিব মানুষ—দু’বেলা ভাত জোটে না, চিকিৎসা চালাবো কীভাবে?”
সিফায়েতের মা মিনি বেগম বলেন, “ছেলের ভবিষ্যতের চিন্তায় আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমরা আর কয়দিন বাঁচবো? কিন্তু আমার ছেলের কী হবে?” — কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি।
সিফায়েতের ভাই সাফায়েত চৌধুরী বলেন, “আমি আগে ইমামতি করতাম, এখন ভাইকে দেখাশোনা করতে গিয়ে সেই চাকরিটাও গেছে। সরকারি অফিসে গেলে আমাদের মানুষই মনে করে না, দুর্ব্যবহার করে। একবার জুলাই ফাউন্ডেশন ও ডিসি অফিস থেকে এক লাখ টাকা করে সহায়তা পেয়েছিলাম, সবই চিকিৎসায় ব্যয় হয়ে গেছে। এখন কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন কাটে।”
নিজেই একসময় ছিলেন প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর—আজ সেই সিফায়েত জীবনযুদ্ধে নিরবে হেরে যাচ্ছেন।
সিফায়েত বলেন, “কোনো কিছুর আশায় নয়, বিবেকের তাড়নায় সেদিন রাস্তায় নেমেছিলাম। এখন আহত হয়ে ঘরে পড়ে আছি। পরিবারের বোঝা হয়ে গেছি। আমি শুধু চাই, অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবন নিয়ে বাঁচতে।”
পরিবারের একমাত্র দাবি, যোগ্যতা অনুযায়ী একটি চাকরি এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা।
এখন সবার প্রশ্ন—এই দেশ কি তার একজন আহত যোদ্ধার প্রতি এতটাই উদাসীন হতে পারে?