• ঢাকা |

শিক্ষার বিভিন্ন ধারার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ। কিন্তু শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশের পাশাপাশি কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। কেবল শিক্ষার স্তর এবং ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই একটি দেশ দক্ষ মানবসম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠতে পারেনা। বরং শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিল্প-বাণিজ্য, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ থাকা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। একসময় উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত জনগোষ্ঠীর জন্য ; বর্তমানে এর পরিধি অনেক বিস্তৃতি লাভ করেছে। কিন্তু এই বিস্তারের সঙ্গে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে তা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন সেক্টরের চাহিদা অনুযায়ী মানবসম্পদ তৈরিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে কিনা।

প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। তাদের একটি অংশ সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা বা পেশাগত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। অন্য একটি অংশ দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। আবার অনেকেই যে বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, বাস্তব কর্মজীবনে তার সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। উচ্চশিক্ষা অপ্রয়োজনীয় নয়। তবে উচ্চশিক্ষার বিষয় নির্বাচন, শিক্ষার মান এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।

বিশ্বের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিকস, ডেটা অ্যানালিটিকস, সবুজ প্রযুক্তি, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের চাকরি এবং কর্মসংস্থানের বাজারে শুধু একটি সনদ থাকাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতার গুরুত্ব ক্রমেই বেড়ে চলছে।

এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একটি সনদ অর্জন নয়; বরং জ্ঞান সৃষ্টি, দক্ষতা অর্জন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে সক্ষম মানুষ তৈরি করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা সংগত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র। কৃষি উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কীভাবে কমানো যায়, ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে সহজলভ্য করা যায়, পরিবেশ রক্ষা করে কীভাবে শিল্পায়ন করা যায়—এসব বাস্তব সমস্যার সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরত্বপূর্ণ অবদান থাকতে হবে।

একই সঙ্গে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার মর্যাদা বাড়াতে হবে। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক, টেকনিশিয়ান, কৃষি উদ্যোক্তা, নার্স, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপার কিংবা শিল্পপ্রযুক্তিবিদ দেশের অর্থনীতিতে যে মূল্য সংযোজন করেন, তা কোনোভাবেই কেবল ডিগ্রির বিচারে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতার যথেষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা রয়েছে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা খুবই জরুরি,‘উৎপাদনশীলতাভিত্তিক শিক্ষা’ বলতে কেবল এমন শিক্ষাকে বোঝানো উচিত নয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য চাকরি পাওয়া। মানবিকতা, দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান কিংবা মৌলিক বিজ্ঞান—এসব জ্ঞানচর্চার তাৎক্ষণিক আর্থিক ফল সব সময় দৃশ্যমান না হলেও একটি সুস্থ, বিবেকবান ও চিন্তাশীল সমাজ গঠনে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিকতা, সংস্কৃতি, সামাজিক সংহতি ও নাগরিক চেতনারও বিকাশ প্রয়োজন।

তাই প্রয়োজন শিক্ষার বিভিন্ন ধারার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে মৌলিক জ্ঞান ও মানবিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করতে হবে; অন্যদিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা ও কারিগরি শিক্ষাকে অর্থনীতির বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের জনসংখ্যা, শ্রমবাজার, শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয় ও আসন বিন্যাস করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও শুধু সামাজিক প্রচলন বা চাকরির নিরাপত্তার ধারণার ভিত্তিতে বিষয় নির্বাচন না করে নিজেদের সক্ষমতা, আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র বিবেচনা করে বিষয় নির্বাচন করা প্রয়োজন।

শিক্ষার সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতের সম্পর্কও নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ, ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, শিল্পভিত্তিক গবেষণা এবং বাস্তব প্রকল্পের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এতে একজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারবেন।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতেও পরিবর্তন দরকার। একদিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটানো হবে, অন্যদিকে শিল্পকারখানা বন্ধ থাকবে, বিনিয়োগ স্থবির থাকবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না—এভাবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা ও অর্থনীতির সক্ষমতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হতে পারে। ফলে শিক্ষা নীতির সঙ্গে শিল্পনীতি, বিনিয়োগনীতি, কর্মসংস্থাননীতি ও প্রযুক্তিনীতি সমন্বিত হওয়া জরুরি।

এখানে সরকারি ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের অর্থ সীমিত। সেই অর্থ কোথায় ব্যয় করা হচ্ছে এবং তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফল কী—তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার। অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সংযোজনহীন প্রকল্প কিংবা সম্পদের অপচয় কমিয়ে শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে।

তবে ‘অনুৎপাদনশীল খাত’ শব্দটির ব্যবহারেও সতর্কতা দরকার। যে খাত সরাসরি পণ্য উৎপাদন করে না, তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুৎপাদনশীল বলা ঠিক নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, গবেষণা ও জনপ্রশাসনের অনেক কর্মকাণ্ড সরাসরি বাজারে পণ্য উৎপাদন না করলেও অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অতএব লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও অপচয় কমানো এবং রাষ্ট্রের মানবিক ও মৌলিক সেবাগুলোকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করা।

বাংলাদেশের সামনে এখন জনমিতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ—সবকিছু একসঙ্গে উপস্থিত। এই পরিস্থিতিতে শুধু বেশি ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; এমন মানুষ তৈরি করতে হবে, যারা জ্ঞানকে কাজে রূপান্তর করতে পারবেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন এবং দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবেন।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য তাই শুধু কতজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো কিংবা কতজন সনদ পেলেন—এই পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং কতজন দক্ষ হলো, কতজন নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি সৃষ্টি করল, কতজন কর্মসংস্থানে যুক্ত হলো, কতজন উদ্যোক্তা হলো এবং দেশের উৎপাদন ও সামাজিক কল্যাণে কতটা মূল্য সংযোজন করল—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

সনদ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সনদ দক্ষতার বিকল্প নয়। উচ্চশিক্ষাও অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জন্য এর গুরুত্ব আরও বাড়ছে। প্রয়োজন হলো উচ্চশিক্ষাকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা—জ্ঞান, গবেষণা, দক্ষতা, নৈতিকতা ও উৎপাদনশীলতার সমন্বয় ঘটানো।

বাংলাদেশকে যদি আগামী দিনের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কতজন ডিগ্রি পেলেন, তা নয়; বরং কতজন জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতায় এমনভাবে সমৃদ্ধ হলেন, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তব অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারে।

সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে এই রূপান্তরই হতে পারে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

মো: মুখলেছুর রহমান,
অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মী।