মো. মুখলেছুর রহমান: মানুষের সভ্যতার ইতিহাস একদিকে যেমন জ্ঞান, আবিষ্কার ও উন্নতির ইতিহাস, অন্যদিকে তেমনি সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিযোগিতারও ইতিহাস। মানুষ প্রযুক্তিতে এগিয়েছে, উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। কিন্তু এত অর্জনের পরও মানুষের চাহিদার শেষ নেই; বরং দিন দিন বেড়েই চলছে। কত সম্পদ, কত পরিচিতি ও কত ক্ষমতা অর্জন করলে মানুষ সত্যিকার অর্থে সন্তুষ্ট হবে তারও কোনো সীমা সরহদ নেই।
পবিত্র কুরআনের ছোট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ একটি সূরা—সূরা তাকাসুর—মানবজীবনের এই গভীর সংকটকে কয়েকটি আয়াতে তুলে ধরেছে। সূরাটি শুধু পরকালীন জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না; বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক প্রতিযোগিতা, সম্পদের ব্যবহার এবং জীবনের অগ্রাধিকার নিয়ে আত্মসমালোচনারও আহ্বান জানায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরসমূহে উপনীত হও।” (সূরা আত-তাকাসুর, আয়াত নং ১–২)
এই আয়াতের তাৎপর্য গভীর। মানুষের সমস্যা সম্পদ অর্জন, উন্নতি কিংবা স্বচ্ছলতা নয়; সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন অধিক সম্পদ ও মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতা মানুষকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য, নৈতিক দায়িত্ব এবং পরকালীন জবাবদিহি থেকে গাফেল করে দেয়।
প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা: আধুনিক জীবনের অদৃশ্য সংকট
‘তাকাসুর’ বলতে অধিকত্বের প্রতিযোগিতা বা অন্যের চেয়ে বেশি অর্জনের প্রবণতাকে বোঝায়। সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা সংখ্যাধিক্য নিয়ে অহংকার এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উন্নতির আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক; কিন্তু তা যখন সীমাহীন প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই সংকটে পড়তে পারে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। মানুষ প্রতিনিয়ত অন্যের বাড়ি, গাড়ি, ভ্রমণ, পোশাক ও সাফল্যের ছবি দেখছে। ফলে নিজের প্রাপ্তি ও সামর্থ্য দিয়ে জীবনকে মূল্যায়ন করার পরিবর্তে অনেকেই অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের সাফল্য নির্ধারণ করছে।
কারও আয় বেশি, তাই আমারও আরও বেশি চাই। কারও বাড়ি বড়, তাই আমারও বড় বাড়ি চাই। কেউ সামাজিকভাবে বেশি পরিচিত, তাই আমাকেও তার চেয়ে বেশি পরিচিত হতে হবে।
এভাবে প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে অসুস্থ্য অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। অথচ অন্যের চেয়ে বেশি অর্জন করলেই যে বেশি শান্তি কিংবা তৃপ্তি আসে, তার কোনোই নিশ্চয়তা নেই। বরং তুলনানির্ভর জীবন মানুষকে নিজের প্রাপ্তি উপভোগ করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং অন্যের কল্যাণে অবদান রাখার সুযোগ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
ইসলাম উন্নতির বিরোধী নয়
সূরা তাকাসুরের শিক্ষা বুঝতে হলে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—ইসলাম সম্পদ অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা কিংবা বৈধ উন্নয়নকে নিরুৎসাহিত করে না। বরং ইসলাম হালাল উপার্জন, পরিশ্রম, দায়িত্ব পালন এবং মানুষের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করতে উৎসাহিত করে।
পবিত্র কুরআনে আখিরাতের কল্যাণ কামনার পাশাপাশি দুনিয়ায় নিজের প্রাপ্য অংশ ভুলে না যেতে বলা হয়েছে (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭৭)। অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে দুনিয়ার জীবনকে কল্যাণকর কাজ ও আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
একজন ব্যবসায়ী সম্পদ অর্জন করতে পারেন, উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান গড়তে পারেন, ব্যাংকার আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন, কৃষক উৎপাদন বাড়াতে পারেন। এসব অর্জন কল্যাণকর হতে পারে, যদি তা বৈধ উপায়ে অর্জিত হয়, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধকে দুর্বল না করে।
সমস্যা সম্পদে নয়; সমস্যা সম্পদের প্রতি এমন আসক্তিতে, যা মানুষকে অন্যায়, অহংকার, দুর্নীতি কিংবা দায়িত্বহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। সম্পদ যখন কল্যাণের মাধ্যম না হয়ে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তখন মানুষ অর্জনের নেশায় অর্জনের উদ্দেশ্যই ভুলে যায়।
কবরের স্মরণ: জীবনের অস্থায়িত্ব
সূরা তাকাসুরের প্রথম দুই আয়াতে মৃত্যুর প্রসঙ্গ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে এসেছে। মানুষ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারে যে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই ব্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। কবরের উল্লেখ মানুষের সামনে জীবনের অনিবার্য পরিণতি তুলে ধরে।
তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে—
“কখনো নয়, অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। আবারও বলছি, কখনো নয়; অচিরেই তোমরা জানতে পারবে।” (সূরা আত-তাকাসুর, আয়াত নং :৩–৪)
এরপর পঞ্চম থেকে সপ্তম আয়াতে নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে উপলব্ধি, জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করা এবং তা দেখার বিষয়ে সতর্কবার্তা এসেছে। অর্থাৎ মানুষ যে বাস্তবতাকে আজ অবহেলা করছে, একসময় তার মুখোমুখি হতে হবে। তখন সত্য উপলব্ধি করলেও দুনিয়ার জীবনের মতো আমল করার সুযোগ থাকবে না।
মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে হতাশ করার জন্য নয়; বরং জীবনকে অর্থবহ করার জন্য। পদমর্যাদা, সম্পদ ও সামাজিক পরিচিতি একসময় পিছনে পড়ে থাকবে। তাই জীবদ্দশায় কত সম্পদ অর্জিত হয়েছে, তার পাশাপাশি তা কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং কী কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের প্রকৃত সাফল্য কেবল রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণে নয়; বরং তার সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া ইতিবাচক প্রভাবেও প্রতিফলিত হয়।
নিয়ামত সম্পর্কে জবাবদিহি
সূরা তাকাসুরের শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“অতঃপর সেদিন অবশ্যই তোমাদের নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা আত-তাকাসুর, আয়াত নং :৮)
এই আয়াত ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাফসিরের আলোচনায় খাদ্য, পানীয়, সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং আল্লাহর দেওয়া অন্যান্য অনুগ্রহের প্রসঙ্গ এসেছে।
মানুষের হাতে থাকা অর্থ, সময়, জ্ঞান, ক্ষমতা ও সুযোগও তার দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো কীভাবে অর্জিত হয়েছে, কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং অন্যের অধিকার রক্ষায় কতটা কাজে এসেছে—এসব প্রশ্ন নৈতিক আত্মসমালোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক।
একজন ধনী ব্যক্তি বৈধভাবে সম্পদ অর্জন করে পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব পালন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে কল্যাণে অবদান রাখতে পারেন। অন্যদিকে প্রতারণা, দুর্নীতি, শোষণ কিংবা মানুষের অধিকার হরণ করে সম্পদ অর্জন করলে বাহ্যিক প্রাচুর্য নৈতিক সাফল্যের প্রমাণ হতে পারে না।
একইভাবে জ্ঞানীর দায়িত্ব জ্ঞানকে কল্যাণে ব্যবহার করা, ক্ষমতাবানের দায়িত্ব ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব মানুষের অধিকার রক্ষা করা। নিয়ামত সম্পর্কে জবাবদিহির শিক্ষা তাই ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
ভোগবাদী সমাজে অসন্তুষ্টির বিস্তার
বর্তমান সমাজে মানুষের একটি বড় সংকট হলো প্রাপ্তির তুলনায় অপ্রাপ্তির দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া। অনেক কিছু অর্জনের পরও মানুষ মনে করে, আরও কিছু না পেলে তার জীবন পূর্ণ হবে না। বাস্তব প্রয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক তুলনা, ভোগবাদী সংস্কৃতি ও মর্যাদা প্রদর্শনের প্রবণতাও এই মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে মানুষের সব আকাঙ্ক্ষাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা ঠিক নয়। উন্নত জীবন, নিরাপদ বাসস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বচ্ছলতা মানুষের ন্যায্য চাহিদার অংশ। সমস্যা তখনই, যখন এসব চাহিদা পূরণের আকাঙ্ক্ষা অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় রূপ নেয় কিংবা বৈধ-অবৈধের পার্থক্যকে গুরুত্বহীন করে তোলে।
সূরা তাকাসুর মানুষকে নিজের জীবনের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করতে শেখায়। আমি কি প্রকৃত প্রয়োজন পূরণ করছি, নাকি অন্যের সঙ্গে তুলনা করে চাহিদা বাড়িয়ে চলেছি? আমার অর্জন কি আমাকে আরও দায়িত্বশীল করছে, নাকি আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে? আমার সামর্থ্য কি কেবল ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয় হচ্ছে, নাকি পরিবার ও সমাজের কল্যাণেও কাজে লাগছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ব্যক্তি থেকে সমাজ: শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ
সূরা তাকাসুরের শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য রয়েছে। যখন সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে ওঠে অর্থ, পদ কিংবা প্রভাব, তখন সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে মুনাফা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা অর্জনের পদ্ধতি ও সামাজিক প্রভাবও বিবেচ্য। রাষ্ট্র পরিচালনায় উন্নয়ন ও সম্পদ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ন্যায্য বণ্টন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, জনসেবা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা সমানভাবে প্রয়োজনীয়।
তাই এমন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে মানুষের মর্যাদা কেবল তার সম্পদ বা পদমর্যাদা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। সততা, যোগ্যতা, মানবিকতা এবং জনকল্যাণে অবদানও হবে সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
দুনিয়ার পথে চলি, কিন্তু লক্ষ্য ভুলে নয়
জীবনে উন্নতি ও স্বচ্ছলতা প্রয়োজন। পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনও জরুরি। কিন্তু এসবের মধ্যেও জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ রাখা দরকার।
সূরা তাকাসুর আমাদের থামতে, ভাবতে এবং নিজেদের হিসাব নিতে শেখায়। আমরা কী অর্জন করেছি, কীভাবে অর্জন করেছি, কী কাজে ব্যবহার করেছি এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ব কতটা পালন করেছি—এসব প্রশ্নের জবাব নিয়ে ভাবতে শিখায়।
মানুষের জীবনের সব প্রতিযোগিতা একসময় থেমে যাবে। তখন দুনিয়ার বাহ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বাস্তবতা সামনে আসবে। তাই সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য না বানিয়ে কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা, প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ থাকা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং নিজের সামর্থ্যকে ভালো কাজে ব্যবহার করাই সূরা তাকাসুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
প্রশ্নটি শুধু কত সম্পদ অর্জন করেছি, তা নয়; বরং যা পেয়েছি, তা দিয়ে কী করেছি। এই উপলব্ধি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জীবনকে আরও দায়িত্বশীল, সংযত ও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
লেখক: মো. মুখলেছুর রহমান
ইসলামী চিন্তাবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকারকর্মী
সাবেক অধ্যক্ষ, জামেয়া দ্বিনীয়া ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, তা’মীরুল মিল্লাত মাদ্রাসা, টঙ্গী শাখা।