• ঢাকা |

বাংলাদেশ রাষ্ট্র: আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শো‌‘কেস


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিদ্রোহ আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে

নবীজী (সা:)’য়ের ইসলামের মূল পরিচয়টি সুস্পষ্ট। তিনি নিজে ছিলেন পবিত্র কুর’আনের শো’কেস; অর্থাৎ তাঁর মধ্যে দেখা যেত পবিত্র কুর’আনের শিক্ষা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে ভাবে দেখতে চান, নবীজী (সা:) ছিলেন তারই প্রতিচ্ছবি। তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ইসলামে ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার একক সার্বভৌমত্ব, আদালতে শরিয়া আইন এবং দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার জিহাদ। নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের মূল পলিসি ছিল জনগণকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো এবং তাদেরকে জান্নাতে নেয়া। এমন এজেন্ডা কোন সেক্যুলার রাষ্ট্রের থাকে না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে এক দিকে যেমন ছিল দ্বীনের তাবলিগ, মিথ্যার বিলুপ্তি এবং কুর’আন ও হাদীস থেকে জ্ঞানদান, তেমনি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব। ফলে গড়ে উঠেছিল আরব, ইরানি, কুর্দি, তুর্কি, হাবশি, মুর, আফগানি ইত্যাদি নানা ভাষী মানুষদের নিয়ে এক বিশাল মুসলিম উম্মাহ। অথচ বাঙালি মুসলিমগণ নবীজী (সা:)’য়ের সে ইসলাম নিয়ে বাঁচে না। তারা বাঁচে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শো’কেস রূপে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরই পূর্ব পাকিস্তানের বিজয় পেয়েছে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ। অথচ বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের প্লাবনে কখনো মানবতা বাঁচেনা। তখন কবরে যায় প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব। বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের কাছে শত্রু গণ্য করেছে বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রায় ৬ বা ৭ লাখ বিহারি মুসলিম। বিহারিরা তাদের হাতে গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। হারিয়েছে তাদের ঘরবাড়িসহ সর্বস্ব। 

আজকের তুলনায় ১৯৪৭’য়ে বাঙালি মুসলিমগণ ইসলামের অধিক কাছে ছিল এবং অধিক মানবিক ছিল। তাদের মাঝে সেদিন বেঁচেছিল ঈমানী চেতনা, মানবতা ও প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ববোধ। ফলে বিহারি, পাঞ্জাবি, পাঠান, গুজরাতি ও অন্যান্য অবাঙালি মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেদিন তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা বহু লক্ষ বিহারি মুসলিমকে তারা পূর্ব পাকিস্তানের নানা শহরে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি মুসলিমদের সে ঈমানী চেতনাকে হত্যা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদের অনুসারীগণ। তারা বাঙালি মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরায় এবং গণহত্যা ও গণধর্ষণের বীভৎস ইতিহাস গড়ে বিহারি নারী-পুরুষদের বিরুদ্ধে।

একাত্তরের যুদ্ধে সকল বিহারি বাঙালিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল -সে প্রমাণ নাই। কিন্তু একাত্তরের বিজয়ের পর প্রতিটি বিহারির গৃহ, দোকান ও চাকুরি কেড়ে নিয়ে বস্তিতে পাঠানো হয়। এখনো তাদের বসবাস বস্তিতে। বাঙালি মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে নৃশংসতম অপরাধ কর্ম। বাঙালি মুসলিমদের এ নৃশংস বর্বরতা বহু দেশের ইতিহাসের বই’য়ে স্থান পাবে এবং স্কুল-কলেজে পড়ানো হবে। আজ থেকে বহু শত বছর পরও বাঙালি মুসলিমদের এ অসভ্য কর্ম সভ্য মানুষের মহলে ঘৃণা কুড়াবে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাঙালি ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ বাঙালি মুসলিমের এ কদর্য ইতিহাস নিয়ে নিশ্চুপ। জার্মানীতেও ইহুদিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নাজী ফ্যাসিস্টদের বর্বরতার নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে। সেগুলি সে দেশে স্কুল-কলেজে পড়ানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিহারিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সে বাঙালি ফ্যাসিস্টদের বর্বরতা নিয়ে তেমন কোন বই লেখা হয়নি। বাঙালির বিবেক ধ্বংসে বাঙালি ফ্যাসিস্টগণ যে কতটা সফল হয়েছে -এ হলো তার নজির। অতি বিস্ময়ের বিষয় হলো, সেরূপ একটি বিবেক ধ্বংসী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ বর্বর ফ্যাসিস্টগণ নিজেদেরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি রূপে প্রচার করেছিল।    

 

যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিল বিরামহীন যুদ্ধ। সে যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল যেমন ফ্যাসিবাদের প্রতিষ্ঠা, তেমনি ছিল ইসলামের উত্থান রোধ। সে লক্ষ্য অর্জনে ভারতের এজেন্ডাই ছিল বাংলাদেশের ভারতসেবী এ দলটির মূল এজেন্ডা। এক্ষেত্রে মুজিব ও হাসিনা কাজ করছে ভারতের প্রতিনিধি রূপে। মুজিবের শাসনামলে বিলুপ্ত হয় জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতা; কবরস্থ হয় গণতন্ত্র। প্রতিষ্ঠা পায় এক দলীয় বাকশাল। ক্ষমতায় এসেই শেখ মুজিব ইসলামপন্থী সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে এবং কারাবন্দী করে সেসব দলের নেতাদের। শেখ হাসিনা ইসলামপন্থী দলগুলিকে নিষিদ্ধ না করলেও অসম্ভব করেছিল সে দলগুলির রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশ নেয়াকে। অথচ দেশটিতে হিন্দুত্ববাদী, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্ট এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতি করায় কোন বাধা রাখা হয় নাই। কিন্তু শরিয়া আইন ও নবীজী (সা:)’য়ের হাতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ইসলামের কথা বললে জঙ্গী ও সন্ত্রাসী রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং গুম, খুন, কারাবন্দী ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। শত শত আলেমকে কারাবন্দি করা হয়েছে; এবং ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে বহু ইসলামপন্থী নেতাদের। তাই শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি প্রচণ্ড প্রসন্ন ছিল ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার। শেখ হাসিনা ভোটডাকাতি করে ক্ষমতায় এলেও ভারত সেটিকে গণতন্ত্রের বিজয় বলে প্রশংসা করেছে। হাসিনার বিকল্প নাই বলে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের নেতাদের বুঝিয়েছে। অবশ্য নিরপরাধী নয় বাংলাদেশের জনগণও; তারাই যেমন ১৯৭০ সালে মুজিবের ন্যায় ফ্যাসিস্ট ও প্রতারককে নির্বাচিত করেছে তেমনি  ২০০৮ সালে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে নির্বাচিত করেছে এবং ১৬ বছর তাকে প্রতিপালন দিয়েছে রাজস্ব দিয়ে।

বাঙালি মুসলিমদের ব্যর্থতা মসজিদ মাদ্রাসার নির্মাণে নয়; বরং এক্ষেত্রে তাদের সাফল্যটি বিশাল। বাংলাদেশে রয়েছে ৩ লাখের বেশি মসজিদ এবং বহু হাজার মাদ্রাসা।  দেশটিতে নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালনকারীদের সংখ্যাও বিশাল। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে তারা চরম ভাবে ব্যর্থ। তাদের ব্যর্থতা জীবনের ফ্যাইনাল পরীক্ষায়। কি কতটা কুর’আন তেলাওয়া করলো, কতটা নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন করলো তা দিয়ে ঈমানের পরীক্ষা হয় না। এধরণের ইবাদত তো হাজার হাজার সূদখোর, ঘুষখোর, মিথ্যাবাদী প্রতারকও পালন করে। বরং ঈমানের ফ্যাইনাল পরীক্ষা হয় মহান রব’য়ের রাষ্ট্রীয়, বৈচারিক, সামাজিক ও শিক্ষা সাংস্কৃতিক এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে ইসলামী রাষ্ট নির্মাণের জিহাদ করলো। সভ্য মানুষকে শুধু পানাহার ও গৃহ নির্মাণ নিয়ে বাঁচলে চলে না। তাকে প্রতিষ্ঠা দিতে হয় উন্নত রাষ্ট্রের।

গৃহ কতটা সুন্দর ও নিরাপদ -তা থেকে গৃহবাসীর রুচির পরিচয় মেলে। সভ্য ও ভদ্র মানুষের গৃহ এজন্যই অসভ্য ও অভদ্র মানুষের গৃহ থেকে ভিন্নতর হয়। সেরূপ ভিন্নতাটি ধরা পড়ে রাষ্ট্রের বেলায়ও। সেক্যুলারিস্ট বেঈমানদের রাষ্ট্র এবং ঈমানদারদের রাষ্ট্র তাই কখনো একই রূপ হয়না। ভিন্নতা ধরা পড়ে দেশ দু’টির শাসনতন্ত্র, আইন আদালত, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, যুদ্ধ বিগ্রহ এবং বিদেশ নীতির মধ্যে। ঈমানদারদের রাষ্ট্রে দেহব্যবসা, সূদী কারবার, ঘুষ, গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতির ন্যায় হারাম কর্ম থাকে না। বরং থাকে দুর্বৃত্তির নির্মূলে বিরামহীন জিহাদ। থাকে শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে ও সে রাষ্ট্রের  প্রতিক্ষায় বিরামহীন জিহাদ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান হয় ইসলামে অঙ্গীকারশুণ্য বেঈমান বাঙালির রাজনীতি। এ রাজনীততে নজরে পড়ে মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ার প্রতি গভীব অবজ্ঞা। থাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী অহংকারকে তীব্রতর করার তাড়না, থাকে পাকিস্তান ভাঙার গর্ব, থাকে ইসলামের উত্থানের প্রতিরোধের অঙ্গীকার এবং থাকে অবাঙালি মুসলিম -বিশেষ করে পাকিস্তানীদের প্রতি ঘৃণার তীব্রতা। সে সাথে থাকে ভারতের ১৯৭১’য়ের ভূমিকার জন্য দাসসুলভ গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ। এনিয়েই বাঙালি সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট ও ফ্যাসিস্ট বেঈমানদের রাজনীতি। এরা যেমন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগে আছে, তেমনি বিএনপি ও বাম ঘরানার রাজনীতিতেও আছে।

কিন্তু যারা ঈমানদার, তাদের রাজনীতির দর্শন, চরিত্র ও তাড়নাটাই ভিন্ন। তাতে থাকে মহান আল্লাহকে খুশি করার তাড়না -সেটি তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে। ঈমানদার মাত্রই স্বপ্ন দেখে মুসলিম উম্মাহর একতা নিয়ে; কোন মুসলিম দেশ ভেঙে গেল তাঁর হৃদয়ে মাতম উঠে।  বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে সে উম্মাহকে দেখতে চায় বিশ্বশক্তি রূপে। এমন ঈমানদারের কাছে রাজনীতি ও রাষ্ট্র গণ্য হয় দেশবাসীকে জান্নাতে নেয়ার হাতিয়ার রূপে। রাজনীতি তার কাছে কোন পেশা নয়, বরং পবিত্র জিহাদ গণ্য হয়। সেরূপ জিহাদ দেখা গেছে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের জীবনে। তাদের সে জিহাদের ফসল হলো ইসলামী রাষ্ট্র -যা জন্ম দিয়েছিল ইসলামী সভ্যতার। সেরূপ একটি রাষ্ট্র নির্মাণে সফল হওয়াতেই মুসলিমগণ পেয়েছিল পূর্ণ ইসলাম পালনের এবং সে সাথে সর্বশক্তি নিয়ে বেড়ে উঠার সহায়ক পরিবেশ। সে রকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই ছিল নবীজী (সা:)’য়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মুসলিমগণ নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও মসজিদ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচলেও নবীজী (সা)’র সর্বশ্রেষ্ঠ এ সূন্নত নিয়ে বাঁচে না। তারা বাঁচে এক ভিন্ন ইসলাম নিয়ে। মুসলিম উম্মাহর আজকের দুর্গতির মূল কারণ এই ভিন্ন ইসলাম। এ ভিন্ন ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র নাই, আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব নাই, শরিয়া নাই, কুর’আনের জ্ঞান নাই, দুর্বৃত্তির নির্মূল নাই, প্যান-ইসলামী ভাতৃত্ব নাই এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদও নাই। এ ভিন্ন ইসলামের প্রবর্তক নবীজী (সা:) নন। সবচেয়ে বড় কথা, তারা যে নবীজী (সা:)’য়ের ইসলাম থেকে ভিন্নতর এক বিকৃত ইসলাম নিয়ে বাঁচে -সে বোধটুকুও তাদের নাই।

বাঙালি মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক; তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে ব্যর্থতা। তাদের সকল ব্যর্থতার মূলে হলো এ ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা নিয়ে রোজ হাশরের বিচার দিনে অবশ্যই আসামীর কাঠগড়ায় উঠতে হবে। জবাব দিতে হবে, এ ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসায় কার কি ভূমিকা ছিল -তা নিয়ে। কৃষি, শিল্প  বা অবকাঠামো নির্মাণে ব্যর্থ হলে সে ব্যর্থতা পুষিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থতার অর্থ ব্যর্থতাটি দায়িত্বশীল মানব নির্মাণে ও ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠায়। ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার ব্যর্থতার কারণেই বাঙালি মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদে। ফলে এতো মসজিদ মাদ্রাসা, নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত সত্ত্বেও বাংলাদেশের উপর দখলদারিটি শয়তান ও তার অনুসারীদের। শয়তানের পক্ষের সে দখলদারির কারণে দেশের আদালতে শরিয়া আইন নাই, শিক্ষাব্যবস্থায় নাই কুর’আন-হাদীসের জ্ঞানদান, রাজনীতিতে নাই দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার জিহাদ। এগুলিই হলো মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচার আলামত। লক্ষণীয় হলো, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ ভোট দিয়ে, রাজস্ব দিয়ে, সরব ও নীরব সমর্থন দিয়ে ইসলামের এ পরাজয় এবং শয়তানী শক্তির এ বিজয়কে বাঁচিয়ে রেখেছে। শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে তারা কি ইসলামের এরূপ পরাজয় মেনে নিত? মেনে নিত কি ইসলামবিরোধী শক্তির বিজয়? এটি নিছক ব্যর্থতা নয়, গুরুতর অপরাধও। অপরাধ এখানে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে গাদ্দারীর। এমন অপরাধ সব সময় প্রতিশ্রুত আযাব ডেকে আনে।

 

আযাব আসে স্বৈরশাসকের রূপ ধরে

মহান আল্লাহ তায়ালার আযাব শুধু ভূমিকম্প, প্লাবন, সুনামী ও ঘূর্ণিঝড় রূপে আসে না। ভয়ানক আযাব আসে নমরুদ, ফিরাউন, হিটলার, মুজিব ও হাসিনার ন্যায় ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসকদের রূপ ধরেও। তখন অসম্ভব হয় সভ্য, ভদ্র ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন। ভূমিকম্প, প্লাবন, সুনামী ও ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলি মানুষের জান মালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটালেও দেশকে অসভ্য করে না। সে দুর্যোগগুলি নানারূপ বিপর্যয় ঘটালেও দেশকে দুর্নীতির প্লাবনে ভাসিয়ে নেয় না। ফলে রাষ্ট্র তখন জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়না। বরং বহু মানুষ প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখে সিরাতাল মুস্তাকীমে ফিরে আসে; নিজেদের আমলনামাকে শুধরিয়ে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন স্বৈরাচারী বেঈমান শাসকের দখলে যায়, পূর্ণ ইসলাম পালনকে তখন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অসম্ভব করা হয়। মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচাটি তখন রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। তখন অসম্ভব করা হয় মুসলিম পরিবারের সন্তানদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে। আদালতে শরিয়া আইনের বিচার ফরজ। সে আইন পালন না করলে কাফির, জালিম ও ফাসিক রূপে গণ্য হতে হয় -সে ঘোষণাটি পবিত্র কুর’আনের। তখন আসে আইন অমান্য করার আযাব। শরিয়া পালন নিয়ে বাঁচা এজন্যই এতো গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাংলাদেশে সেটি রাষ্ট্রীয় ভাবে অসম্ভব করা হয়েছে। আর জনগণ সে রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি আত্মসমর্পণ নিয়ে বাঁচছে। এমন কুফুরি আইনের কাছে আত্মসমর্পণের অর্থ মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এমন অবস্থায় প্রতিটি ঈমানদারের উপর জিহাদ ফরজ হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ সে ফরজ পালনে নাই। তারা বেছে নিয়েছে শরিয়াকে পরিত্যাগ করার পথ। এতে অনিবার্য হয়েছে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের আযাব। এর আগে একই রূপ আযাব নিয়ে হাজির হয়েছিল ক্ষমতালোভী ফ্যাসিস্ট মুজিব।

স্বৈরশাসক যখন নিজ শক্তির জোরে বা উত্তরাধিকার সূত্রে শাসক হয়, তখন সে স্বৈরশাসকের অপরাধে জনগণের অংশদারিত্ব কম থাকে। তখন আযাব শাসক চক্রকে ঘিরে ধরে। কিন্তু যখন কোন স্বৈরশাসককে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে তখন সে শাসকের পাপের দায়ভার জনগণের কাঁধেও অর্পিত হয়। তখন নানারূপ আযাব জনগণকেও ঘিরে ধরে। বাংলাদেশীদের উপর সে আযাব যেমন মুজিব আমলে এসেছিল, তেমনি এসেছিল হাসিনার আমলেও। গণতন্ত্রের হত্যাকারী, বাঙালি ফ্যাসিবাদের জনক, ভারতের তাঁবেদার ও আওয়ামী দুর্বৃত্ত চক্রের নেতা শেখ মুজিব নিজ বাহুবলে বা কোন রাজবংশে জন্ম নেয়ার কারণে ক্ষমতায় আসেনি। বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তকে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা দুইবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে। প্রথম বার ১৯৭০ সালে এবং দ্বিতীয়বার ১৯৭৩ সালে। এবং হাসিনার ন্যায় অপরাধীকে বিজয়ী করেছে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে। বাংলাদেশ আজ যেরূপ আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শো’কেস -তার কারণ শুধু দুর্বৃত্ত সরকার নয়, বহুলাংশে দায়ী দায়িত্বহীন জনগণও।  

বাংলাদেশীরা একই অপরাধ করেছে ২০২৬ সালের নির্বাচনে। প্রতি নির্বাচনেই জনগণের ঈমানের পরীক্ষা হয়। আল্লাহ তায়ালা দেখেন জনগণ  কাকে ভোট দেয়। নির্বাচন মানেই জনগণের আদালত; এবং ভোট দেয়ার অর্থ আদালতে সাক্ষ্য দেয়া। আদালতে খুনি বা ধর্ষককে ভাল মানুষ বলে সাক্ষ্য দেয়া গুরুতর অপরাধ। তেমনি গুরুতর অপরাধ হলো ওয়াদাখেলাপি প্রতারক, চাঁদাবাজ দুর্বৃত্ত, ব্যাংক ডাকাত ঋণখেলাপির পক্ষে ভোট দেয়া। এমন গুরুতর অপরাধ মহান রব’য়ের দৃষ্টি এড়ায় না। এবং প্রতিটি অপরাধই আযাবকে অনিবার্য করে। যে জনগণ এরূপ অপরাধীকে নিজ ভোটে নির্বাচিত করে, সরকারের অপরাধের দায় তখন জনগণকেও নিতে হয়। এবং জনগণ যখন নিজেরা অপরাধী, তখন তাদের শাস্তি দেয়াই মহান রব’য়ের নীতি হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাংলাদেশে আজ যে দুঃশাসনের আযাব সেটি জনগণের নিজ হাতের অর্জন। ১১/১০/২০২৬