ফিরোজ মাহবুব কামাল
স্ট্রাটেজির গুরুত্ব এবং মুসলিমদের সেকালের অর্জন এবং একালের অর্জন
স্ট্রাটেজি তো তাই -যা একটি এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জন্য অপরিহার্য কৌশল। স্ট্রাটেজি থাকতে হয় বুদ্ধিবৃত্তিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গণে -অর্থাৎ যেখানে শত্রুশক্তির সাথে যুদ্ধ সেখানেই। সুনির্দিষ্ট স্ট্রাটেজি এবং সেটির বাস্তবায়ন না থাকলে ঘোষিত এজেন্ডা শুধু কাগজে থেকে যায়। প্রশ্ন হলো, কি সে আল্লাহ তায়ালার স্ট্রাটেজি। তাঁর সে পরিকল্পিত স্ট্রাটেজি তো তাই, যার মধ্য দিয়ে নবীজী (সা:) মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করে গেছেন। নবীজী (সা:)‘য়ের স্ট্রাটেজি ছিল: এক). কাফির শক্তির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে পবিত্র কুর’আন অস্ত্র রূপে ব্যবহার করা; দুই). মুসলিমদের মাঝে সিসাঢালা দেয়ালসম একতা; তিন). ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এং সে রাষ্ট্রের সকল প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য, তার অর্থবল ও লোকবলকে মহান রব’য়ের ঘোষিত এজেন্ডাকে বিজয়ী করার কাজে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা। ফলে নবীজী (সা:)’য়ের অর্জন ছিল বিশাল। তিনি প্রতিষ্ঠা দিতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বড় ইসলামী রাষ্ট্র -যা দ্রুত পরিণত হয় বিশ্বশক্তিতে। অথচ আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সা:)’য়ের সে স্ট্রাটেজি নিয়ে বাঁচে না। তাদের অর্জন পরাজয়, পরাধীনতা ও ইজ্জতহীনতা।
অপরদিকে প্রতি যুগে শয়তানের স্ট্রাটেজি হলো: এক). ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সকল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করা; সে লক্ষ্যে সকল ইসলাম বিরোধী শক্তির মাঝে কোয়ালিশন গড়া -নবীজী (সা:)‘য়ের যুগে যেমনটি দেখা গেছে খন্দকের যুদ্ধকালে। দুই). সেক্যুলারিজম, লিবারালিজম, জাতীয়তাবাদ, নাস্তিকতাবাদ ইত্যাদির মতবাদী রাজনীতির মাধ্যমে মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো; তিন). জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, রাজতন্ত্রী, পুঁজিবাদী, হিন্দুত্ববাদী, কম্যুনিস্ট ইত্যাদি নানা ব্রান্ডের অনৈসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠা দেয়া ও সেগুলিকে বাঁচিয় রাখা। এ লক্ষ্য সাধনে শয়তানের প্রকল্প হলো জনজীবনে কুর’আনী জ্ঞানের অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত বাঁচিয়ে রাখা। এজন্যই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেলে তারা কুর’আন থেকে জ্ঞানদান নিষিদ্ধ করে। কারণ, জাহিলিয়াত বাঁচলে এ রাষ্ট্রগুলিও বাঁচে। জাহিলিয়াত বাঁচিয়ে রাখার জন্য শয়তানের রয়েছে নিজস্ব প্রকল্প, অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং বিপুল সংখ্যক সৈনিক। হাজার হাজার বছরে আগে কোন এক জাহেল জনগোষ্ঠির হাতে মূর্তিপূজা, সর্প পূজা, সূর্যপূজা, পাহাড়-পর্বত পূজা, লিঙ্গ পূজা নিয়ে পৌত্তলিকতার শুরু। সে আদিম জাহিলিয়াত বাঁচাতে কাজ করে বহু লক্ষ মন্দির এবং সেসব মন্দিরে পুরোহিতগণ। তাদের মেহনত ফল দিয়েছে। ফলে বিশ্বের বহু শত কোটি মানুষের মাঝে সে জাহিলিয়াত প্রবল প্রতাপে বেঁচে আছে। ভারতের বুকে ইসলামের প্রসার রুখে দিয়েছে শয়তানের এ সৈনিকগণ।
মুসলিম উম্মাহর যে ব্যর্থতাটি তাদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত কেড়ে নিয়েছে -সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থতা। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে আগ্রহ থাকলে সেরূপ একটি রাষ্ট্র আজও নির্মিত হতে পারতো। কারণ সেটি কোন রকেট সায়েন্স নয়। সে জন্য প্রয়োজন শুধু কিছু মোখলেছ ঈমানরদার বান্দা ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের রোডম্যাপ ও স্ট্রাটেজি। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের রোডম্যাপ ও স্ট্র্যাটিজি নতুন করে আবিষ্কারের বিষয় নয়; সেগুলিও বেঁচে আছে ইতিহাসের বইয়ে ও হাদীস গ্রন্থে। অতীতে সে রোডম্যাপ ও স্ট্র্যাটিজির সফল ভাবে প্রয়োগ হয়েছে; ফলে তাতে ইসলামী রাষ্ট্রও সফল ভাবে নির্মিত হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে আগ্রহ থাকলে তা থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেয়া যেত। মুসলিমদের আজকের ব্যর্থতার মূল কারণ, তা থেকে শিক্ষা নেয়া এবং লব্ধ শিক্ষার প্রয়োগের কাজটি হয়নি। অথচ নবীজী (সা:) শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, ওজু-গোছল ও তাসবিহ তাহলিল শিখিয়ে যাননি, তিন নিজ হাতে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছেন এবং ১০টি বছর সে রাষ্ট্রের চালকের সিটে বসে দেখিয়ে গেছেন কিরূপে সে রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হয় এবং সেটি পরিচালনা করতে হয়। নিজে রণাঙ্গণে নেমে দেখিয়ে গেছেন কিরূপে সে রাষ্ট্রের নির্মাণে ও প্রতিরক্ষায় অংশ নিতে হয়। এবং এটিই হলো নবীজী (সা:)‘য়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত। অতীতে মুসলিমগণ স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত পেয়েছে সে সূন্নত অনুসরণের কারণে, টুপি, দাড়ি, আতর মাখা ও পাগড়ির কারণে নয়। নবীজী (সা:)‘য়ের সে সূন্নত আজ মুসলিম জীবন থেকে পরিত্যক্ত হয়েছে। রাষ্ট্র নির্মাণে তারা কাফিরদের মডেল অনুসরণ করে, নবীজী (সা:)‘য়ের নয়।
শুরুটি চেতনার নির্মাণ দিয়ে
ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের শুরুটি হতে হয় জনগণের চেতনার নির্মাণ দিয়ে। সে কাজে হাতিয়ার হলো পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান, নবীজী (সা:)‘য়ের সূন্নত এবং খোলাফায়ের রাশেদার আদর্শ। শুরুর এ কাজটি শুরুতে না হলে রাষ্ট্র নির্মাণের পরবর্তী ধাপগুলি ব্যর্থ হতে বাধ্য। সে কাজটি শুরুতে না হওয়াতে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের বিপুল প্রাণের বিণিময়ে অর্জিত পাকিস্তান প্রকল্প ব্যর্থ হয়ে গেছে। মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ সে রাষ্ট্রটি শয়তানের জাতীয়তাবাদী, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদী খলিফাদের নাশকতায় খণ্ডিত হয়ে গেছে। এবং শত্রুর সে সফল নাশকতা নিয়ে বাঙালি মুসলিমগণ ভারতীয় পৌত্তলিকদের সাথে মিলে এখনো প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চ এলে উৎসব করে। ঈমানদার মানুষ প্রতিবেশির ঘর ভাঙলে দুঃখ পায়; তা নিয়ে কখনো উৎসব করে না। আর বাঙালি মুসলিমগণ নিজেদের দেশ ভাঙা নিয়ে ভারতীয় কাফিরদের সাথে মিলে উৎসব করে। এ থেকে বু|ঝা যায় বাঙালি মুসলিমের চেতনার পচন কত গভীর। এবং বুঝা যায়, কতটা দূরে সরেছে ইসলাম থেকে। বুঝা যায়, মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে গাদ্দারী কত গভীর। চেতনার এমন পচন ও বেঈমানী নিয়ে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের মঞ্চে ৫ বার প্রথম হওয়া যায়, কিন্তু তাতে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি হয়না। তাই বাংলার বুকে বার বার ভাঙার কাজ হলেও গড়ার কাজ হচ্ছে না। কারণ, গড়ার কাজে দরকার সুস্থ চেতনার নির্মাণ। চাই বলিষ্ঠ ঈমানদারী। বাঙালি মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি এক্ষেত্রে।
বাংলার বুকে ইসলামের আগমন হাজার বছর আগে হলেও চেতনা নির্মাণের কাজটি কোন কালেই হয়নি। সে কাজের শুরুটি হতে হয়, কুর’আনী জ্ঞানার্জনকে প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ ইবাদতে পরিণত করে এবং রাষ্ট্র জুড়ে সে জ্ঞানের বিস্তার ঘটিয়ে -যেমনটি নবীজী (সা:) করেছিলেন। সেটি করেছিলেন নামাজ রোজা ফরজ করার আগে। কুর’আনের শুরুটি তাই ইকরা তথা পাঠ করো দিয়ে। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি কখনোই হয়নি। ফলে চেতনা নির্মাণের গোড়াতেই রয়ে গেছে বিশাল গলদ। ফলে এ দেশে হাজার জনের মধ্যে একজন পাওয়া যাবে না যে কুর’আন পড়লে তা বুঝে। আর যারা কুর’আন বুঝে না তারা সে কুর’আন অনুসরণ করবে কিরূপে? ফলে বিগত ৮ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে এ ভূ-খণ্ডে কখনোই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হয়নি। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি সফল না হলে ইসলামের শ্রেষ্ঠ নিয়ামতগুলি পার্থিব জীবনে জুটবে কিরূপে? অথচ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হলে দেশে সভ্য ও শান্তিময় একটি রাষ্ট্র নির্মিত হতো এবং সে রাষ্ট্রটি জান্নাতের বাহনে পরিণত হতো। ইসলামী রাষ্ট্রের এটিই হলো সবচেয়ে বড় নিয়ামত।
ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি একমাত্র ঈমানদারদের। যারা প্রকৃত ঈমানদার, একমাত্র তারাই যোগ্যতা রাখে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে অবদান রাখার। একাজ কখনোই ইসলাম থেকে দূরে সরা দুর্বৃত্ত মুনাফিকদের নয়। তাই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি সফল করতে শুরুতেই কার্যকর প্রকল্প থাকতে হয় ঈমানদার মানব গড়ার। একাজে নবীজী (সা:) নিজে ছিলেন একজন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। মহল্লায় ঘুরে ঘুরে তিনি ওহীর জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন। ঈমানদার মানব সৃষ্টির কাজে মূল হাতিয়ারটি হলো পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান। সে জন্য শুধু তেলাওয়াতের সামর্থ্য থাকলে চলেনা, থাকতে হয় বুঝার সামর্থ্য। কারণ, ব্যক্তির ঈমান পুষ্টি পায় কুর’আনী জ্ঞান থেকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বই পড়েছে এমন ব্যক্তিরাই কেবল ডাক্তার হয়, তেমনি কুর’আনী জ্ঞানে সমৃদ্ধ ব্যক্তিরাই কেবল প্রকৃত ঈমানদার হয় এবং একমাত্র তারাই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সৈনিক হয়।
ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হলো চেতনার ভূবনে বাসা বাঁধা জাহিলিয়াত নির্মূলের জিহাদ। এ জিহাদ ব্যক্তির জীবনে নৈতিক বিপ্লব আনে এবং তাকে এক নতুন জীবন উপহার দেয়। পবিত্র কুর’আনের সুরা ফুরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা এ জিহাদকে জিহাদে কবিরা তথা বড় জিহাদ বলেছেন। এ জিহাদ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের। সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শুরুটি এ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব দিয়ে। এ বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে মূল অস্ত্র হলো পবিত্র কুর’আন। এজন্য সর্বজ্ঞানী মহান রব ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও মাহে রমজানের মাসব্যাপী রোজা ফরজ করার আগে কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন। শুরুতে এ জিহাদটি না হলে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ কখনো সফল হয়না। বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব আনায় ব্যর্থ হওয়াতে বহু দেশে ইসলামের নামে শুরু করা বহু বিপ্লব ব্যর্থ হয়ে গেছে।
ইসলামী রাষ্ট্র: মুসলিম উম্মাহর একমাত্র দুর্গ
ইসলামী রাষ্ট্রই হলো মুসলিম উম্মাহর দুর্গ। সে দুর্গের পতন হলে বা সেটি বিলুপ্ত হলে উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত বাঁচেনা। তখন বড় বড় নগর, প্রাসাদ ও কলকারখানা নির্মাণ করেও স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাঁচানো যায় না। বরং গোলাম হতে হয় শত্রু শক্তির। আজকের মুসলিম উম্মাহ তারই উদাহরণ। এজন্যই নবীজী (সা:) মদিনায় হিজরত করে নিজের ঘর নির্মাণ করেননি, বরং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছিলেন। কারণ উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জতের চেয়ে কোন কিছুই অধিক গুরুত্ব পেতে পারে না। পরিতাপের বিষয় হলো, নবীজী (সা:)‘যের কাছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ যেরূপ অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব পেয়েছিল, সেরূপ অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব আজকের মুসলিমদের কাছে পায়নি। অভাব এখানে ভূ-রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রায়োরিটির। নবীজী (সা:) কোন রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ছিলেন না; কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি যা কিছু করেছেন তার সব কিছুই করেছেন সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে। ফলে নবীজী (সা:)‘য়ের ভূ-রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রায়োরিটির মাঝে প্রকাশ পেয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞা ও প্রায়োরিটি। সেটির প্রতি অবহেলা ও অবজ্ঞা দেখানোর অর্থ মহান আল্লাহর প্রতি অবহেলা ও অবজ্ঞা দেখানো। সেটি তো কবিরা গুনাহ। অথচ আজকের মুসলিমরা সে গুনাহতে লিপ্ত। নবীজী (সা:)‘য়ের সে মহান সূন্নত থেকে আজকের মুসলিমগণ কোন শিক্ষাই নেয়নি। ফলে মুসলিম বিশ্বের কোথাও বেঁচে নাই সে দুর্গ। আর দুর্গের পতন হলে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত বাঁচে না, ফলে প্রায় ১৫০ কোট মুসলিমকে আজ বাঁচতে হচ্ছে পরাধীনতা ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে।
প্রশ্ন হলো, নবীজী (সা:)’য়ের দেখানো রোডম্যাপকে পাশ কাটিয়ে বা সেটিকে অনুসরণ না করে নিরাপত্তা, বিজয় ও ইজ্জত জুটবে -সেটি কি কখনো আশা করা যায়? জান্নাত পেতে হলে যেমন নবীজী (সা:)‘য়ের পূর্ণ অনুসরণ চাই, তেমনি পূর্ণ অনুসরণ চাই এ পৃথিবীতে সফল, সুন্দর ও নিরাপদ জীবন পেতে। মুসলিমদের আজকের সকল ব্যর্থতার মূল কারণ, তাদের জীবনে নবীজী (সা:)‘য়ের পূর্ণ অনুসরণ নাই। তাদের অপরাধ, নবীজী (সা:) থেকে তারা নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের পদ্ধতি শিখলেও শেখেনি ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও পরিচালনার কৌশলটি। নবীজী (সা:) শুধু কুর’আনের বাণী বাহক ছিলেন না; তাকে প্রেরণ করা হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য অনুকরণীয় সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল চরিত্র রূপে। তাকে অনুসরণ করার অর্থ মহান আল্লাহ তায়ালার অনুসরণ -সেটি বলা হয়েছে সুরা নিসার ৮০ নম্বর আয়াতে। তাই নবীজী (সা:)’য়ের অবাধ্যতার অর্থ মহান আল্লাহর অবাধ্যতা। এ অবাধ্যতা ব্যক্তিকে কাফির বানায়। অথচ মুসলিমদের মাঝে সে অবাধ্যতাই প্রকট ভাবে দৃশ্যমান হয় ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে অবহেলা ও অবজ্ঞার মধ্য দিয়ে। তারা ইসলামী রাষ্ট্রনির্মাণের কথাটিই মুখে আনে না। তারা গুরুত্ব দেয় স্রেফ মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণে। ফলে বাংলাদেশের মত ক্ষুদ্র দেশে তিন লাখের বেশি মসজিদ ও বহু হাজার মাদ্রাসা নির্মাণ করলেও কোন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেনি। ফলে কোথাও প্রতিষ্ঠা দেয়নি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের বদলে তারা নির্মাণ করছে জাতীয়তাবাদী, উপজাতীয়তাবাদী, রাজতন্ত্রী ও সেক্যুলার রাষ্ট্র। কিন্তু তাতে মুসলিমদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাড়েনি। মুসলিম দেশে বিপুল সংখ্যায় মসজিদ মাদ্রাসা নির্মিত হলেও দেশগুলিতে বিজয় বেড়েছে সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট ও রাজতান্ত্রিক শত্রু শক্তির। এভাবে বনি ইসরাইলীদের মত আজকের মুসলিমগণও নিজেদের প্রমাণ করেছে ইসলামের ব্যর্থ ও অবাধ্য ছাত্র রূপে।
আজকের অধিকাংশ মুসলিম যে মৌল বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে তা হলো, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত না হলে অসম্ভব হয় পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজ তথা পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচার কাজ। তখন অসম্ভব হয় ইসলাম ও তার শরিয়াকে বিজয়ী করা। তখন মুসলিম ভূমিতে মুসলিমগণ ইতিহাস গড়ে ইসলাম থেকে দূরে সরায়। ইসলামী রাষ্ট্র না থাকায় অর্থ, মুসলিম জীবনে ইসলামের পূর্ণ পালন না থাকা। তখন মুসলিমগণ ব্যর্থ হয় পূর্ণ মুসলিম হতে। এরই প্রমাণ, তারা বাঁচছে শরিয়া আইন, প্যান-ইসলামী মুসলিম ঐক্য, দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ, শুরা ভিত্তিক শাসন, সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার ন্যায় ফরজ কাজগুলি নিত্য দিনের জীবন থেকে বাদ দিয়ে। বরং মুসলিম নগরে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে পতিতাপল্লীর নামের জ্বিনার বাণিজ্য, সূদী ব্যাংক, জুয়ার আখড়া, মদের দোকান এবং নাচ গান ও সিনেমার নামে অশ্লিলতা। বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা ১৫০ কোটির অধিক হলেও তাদের হাতে পৃথিবীর কোথাও ইসলামের বিজয় আসেনি। মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মানচিত্রে এক ইঞ্চি ভূমিও যোগ হয়নি। অথচ বড় বড় বিজয় এসেছিল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটেছিল নবীজী (সা:) ও তাঁর কয়েক হাজার সাহাবীদের হাতে। লক্ষণীয় হলো, সে আমলে বিজয় অর্জনে মূল হাতিয়ার রূপে কাজ করেছিল ইসলামী রাষ্ট্র ও তার বিশাল সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো। আজ সেরূপ রাষ্ট্র না থাকায় কোন বিজয় জুটছে না।
নবীজী (সা:)’য়ের মোজেজা
ইসলামের বিজয়ের অর্থ: রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হবে -শুধু সেটি নয়। স্রেফ মুসলিম নামধারি কোন শাসকের শাসনও নয়। সে রাষ্ট্রে বহু লক্ষ মসজিদ বা বহু হাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা পাবে -সেটিও নয়। বরং সেটি হলো সে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পাবে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর শরিয়া আইন। বিলুপ্ত হবে সর্বপ্রকার দুর্বৃত্তি ও অবিচার এবং প্রতিষ্ঠা পায় সত্য ও সুবিচার। নবীজী (সা:)’য়ের বিস্ময়কর মোজেজা শুধু এ নয়, নিরক্ষর হয়েও তিনি হৃদয়ে নির্ভুল ভাবে ধারণ করতে পেরেছিলন পবিত্র কুর’আনের ন্যায় বিশাল গ্রন্থকে। নবীজী (সা:)’য়ের সবচেয়ে বড় মোজেজাটি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। নবীজী (সা:) নবুয়ত পান ৪০ বছর বয়সে এবং নবুয়ত প্রাপ্তির পর মাত্র ২৩ বছর তিনি বেঁচেছেন। সে ২৩ বছরের মাঝে প্রথম ১৩ বছর চরম বাধা-বিপত্তির মাঝে কেটেছে মক্কায়। তাঁর জীবন থেকে তিনটি মূল্যবান বছর হারিয়েগেছে মক্কা উপকণ্ঠে শেবে আবু তালেবের নিদারুন বন্দী জীবনে। তখন মক্কার সকল গোত্রের কাফিরগণ তাদের বয়কট করেছিল। মক্কায় অবস্থানকালে তিনি তাঁর সামর্থ্যকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি। তিনি তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজটি করেন মদিনায় হিজরতের পর মাত্র ১০ বছরের মধ্যে। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি সাহাবাদের গড়ে তোলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র বেড়ে উঠে এ পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র ও সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তি রূপে। অবশেষে সে রাষ্ট্রের উপর প্রতিষ্ঠা পায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।
বড় বড় শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে নবীজী (সা:) বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু সে বিজয় বিনা যুদ্ধে আসেনি। মাত্র ১০ বছরের শাসনামলে তাঁকে ৮৩টি যুদ্ধ লড়তে হয়েছে। ২৮টি যুদ্ধ লড়েছেন সশরীরে যুদ্ধে নেমে। শুধু নবীজী (সা:)কে নয়, প্রতিটি সাহাবাকে যুদ্ধে নামতে হয়েছে। অর্ধেকের বেশি সাহাবা শহীদ হয়েছেন; এবং খোদ নবীজী (সা:) রণাঙ্গণে আহত হয়েছেন। সে সময় যারা যুদ্ধে নামেনি তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। সেদিন এটি প্রমাণিত হয়েছিল, নামাজী, রোজাদার ও হাজীদের মাঝে শুধু মুজাহিদ থাকে না, বিপুল সংখ্যক মুনাফিকও থাকে। কিন্তু নবীজী (সা:) কিরূপে সেদিন কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হলেন এবং কি ছিল তাঁর স্ট্র্যটিজি -সেটি হলো মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয়।
ইসলামের অতি মৌল কথা হলো, নবীজী (সা:) যা কিছু করেছিলেন -সেগুলি করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও নির্দেশ মোতাবেক। তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডা ও স্ট্র্যাটেজিকে কার্যে পরিণত করেছেন মাত্র। কিন্তু আজকের মুসলিমদের পরাজয়ের মূল কারণ, তারা নবীজী (সা:)‘য়ের সে পথে নাই। তারা নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের হুকুমগুলি মানতে রাজী, কিন্তু মানতে রাজী নয় তাঁর ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সূন্নতকে। তারা বাঁচছে নবীজী (সা:)‘য়ের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা নিয়ে। অথচ নবীজী (সা:)‘য়ের অবাধ্যতার অর্থ মহান আল্লাহর অবাধ্যতা। ইসলামের ব্যর্থ ও অবাধ্য ছাত্র রূপে ইহুদিরা যেমন ইতিহাস গড়েছিল, সে পথটি বেছে নিয়েছে আজকের মুসলিমগণও। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রকল্পে নবীজী (সা:)’য়ের কাছে যা গুরুত্ব পেয়েছিল তার সার সংক্ষেপ হলো:
এক: বিপ্লবের শুরুটি হবে দর্শনের বিপ্লব দিয়ে; সে বিপ্লবের জন্য প্রত্যেকের উপর বাধ্যতামূলক হতে হবে কুর’আন শিক্ষা।
দুই: লড়াইয়ের মূল ক্ষেত্র হতে হবে মানবের চেতনার ভূমি; বিপ্লবের শুরু হতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব দিয়ে।
তিন: জিহাদে কবিরা তথা বড় যুদ্ধটি হবে জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে; এ যুদ্ধের অস্ত্র হবে পবিত্র কুর’আন।
চার: ঈমানদারদের মাঝে গড়তে হবে ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামী ভাতৃত্ব ও একতা। 18/10/2026