• ঢাকা |

বাঙালি মুসলিমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি শিক্ষাক্ষেত্রে


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 
শিক্ষাই নির্ধারণ করে জাতির ভবিষ্যত
একটি জাতির বেড়ে উঠার মূলে যেমন সফল শিক্ষাব্যবস্থা, তেমনি পতন ডেকে আনে তার ব্যর্থ শিক্ষা ব্যবস্থা। দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অঙ্গণে গভীর বিপর্যয় দেখে নিশ্চিত বলা যায়, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বিশাল ব্যর্থতা রয়ে গেছে। মানব সন্তানকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলার কাজটি যে হয়নি -সেটি বুঝতে তখন বাকি থাকে না। নবীজী (সা:)‘য়ের হাতে ইসলামের যাত্রাটি নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত দিয়ে শুরু হয়নি, বরং শুরু হয়েছিল কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করে। তাই ইসলামের শুরু ইকরা তথা কুর’আন পাঠ দিয়ে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, নবীজী (সা:) যা কিছু করেছেন, সেটি করেছেন সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহর নির্দেশে। মহান রব’য়ের নীতিই ছিল তার নীতি।

এমন কি যারা উন্নত মানব, সভ্য রাষ্ট্র ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়তে চায়, তারাও তাদের নতুন প্রজন্মকে কর্ম ক্ষেত্রে নামানোর আগে প্রায় ২০ বছর স্কুল কলেজে সুশিক্ষিত রূপে গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত রাখে। এ ক্ষেত্রে অবহেলা ও কার্পণ্য হলে সে জাতি ব্যর্থ হতে বাধ্য। শিল্পোন্নত দেশগুলির রাষ্ট্রীয় বাজেটের সবচেয়ে বড় খাতটি হলো শিক্ষাখাত। অনেক দেশে প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি শিক্ষালাভ ফ্রি। এসব দেশে সরকারের কড়া নজরদারি থাকে শিক্ষাদানের মানের উপর। বাংলাদেশের ন্যায় সেসব দেশে শাসক দল কখনোই নিজেদের দলীয় গুণ্ডা নামিয়ে শিক্ষার পরিবেশ তছনছ করে না। শিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষা  মুলতবি করে বছরের পর বছর সেশনজট ঘটায় না। অথচ বাংলাদেশে সেটিই নীতি। একটি গাছকে ফলবান বানাতে হলে দীর্ঘকাল তার গোড়ায় পানি ও সার দিতে হয়। গাছকে পাহারা দিতে হয়। এখানে অবহেলা চলে না। একটি গাছ কতটা ফল দিবে তা নির্ভর করে সে যত্নের উপর।   

যে জাতি দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়, সে জাতির ব্যর্থতার কারণ বুঝতে পণ্ডিত হওয়া লাগে না। বাংলাদেশী শিশুরা মাতৃগর্ভ থেকে দুর্বৃত্তি, সন্ত্রাস ও অসভ্যতা শিখে নিয়ে দুনিয়ায় আসে না। সেগুলি শেখে দেশের শিক্ষা, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ থেকে। শিক্ষাঙ্গণে হয়না তাদের সভ্য মানব রূপে গড়ে তোলার কাজ। বাঙালি মুসলিমদের মূল ব্যর্থতাটি কৃষি, শিল্প ও অর্থনীতিতে নয়; বরং সেটি হলো শিক্ষা নীতি ও শিক্ষাঙ্গণে। শিক্ষা নীতি ও শিক্ষাঙ্গণে ব্যর্থতার মূল কারণ, রাজনীতির উপর ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্তদের দখলদারি। দেশের এ দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদগণ চায়না্, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত মানব গড়ার হাতিয়ারে পরিণত হোক। নিজেরা ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্ত হওয়ায়, সেরূপ সভ্য কাজে তাদের আগ্রহ না থাকারই কথা। বরং তারা চায় তাদের ক্ষমতাদখল, ব্যাংক দখল ও চাঁদাবাজী  রাজনীতি বেশি বেশি রাজনৈতিক সৈনিকের সরবরাহ পাক -যারা রাজপথে কাজ করবে তাদের লাঠিয়াল রূপে।  ব্রিটিশ আমলে এ শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে ব্রিটিশ প্রশাসনে চাকর বাকর সরবরাহ দেয়ার কাজে। সে নীতিতে আজও পরিবর্তন আসেনি।

নবীজী (সা:) যে শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন সে শিক্ষানীতি মুসলিম বিশ্বের কোথাও বেঁচে নাই। এর পিছনে বোধগম্য কারণও রয়েছে। যে ব্যক্তি কুঁড়ে ঘর নির্মাণ করতে চায় এবং যে ব্যক্তি তাজ মহল গড়তে চায় - উভয়ের প্রস্তুতি এবং নির্মাণ সামগ্রী কখনো একই রূপ হয়না। তেমনি যে রাষ্ট্র দুর্বৃত্তি বিশ্বে বার বার প্রথম হতে চায় এবং যে রাষ্ট্র চায় মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নবীজী (সা:) আদলে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করতে -এ উভয় রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতি কখনো একই রূপ হয়না। নবীজী (সা:)’য়ের শিক্ষানীতির থেকে বাংলাদেশের শিক্ষানীতি এজন্যই এতো ভিন্ন। নবীজী (সা:)’য়ের শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য ছিল, মানব সন্তানদের শুধু জ্ঞানবান করা নয়, বরং তাদেরকে মহান রব’য়ের কাছে প্রিয়তর করা এবং জান্নাতের যোগ্যরূপে গড়ে তোলা। শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভ -উভয়ই গণ্য হতো ইবাদত রূপে। নবীজী (সা:) জ্ঞানার্জনে এমন কি চীনে যাওয়ার নসিহত যেমন করেছেন, তেমনি নসিহত করেছেন কুর’আনকে হৃদয়ে ধারণ করতে।

নবীজী (সা:)‘য়ের জ্ঞানদানে গুরুত্ব পেয়েছিল প্রতিটি মানব সন্তানের জ্ঞানের উন্নয়ের সাথে নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়ন। উন্নত চরিত্রের মানুষ গড়ায় তো তাদেরই আগ্রহ থাকে -যাদের আগ্রহ থাকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়। এবং আগ্রহ থাকে আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠ আনসার হওয়ায়। কিন্তু যারা চায় স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে, কুর’আন ভিত্তিক শিক্ষানীতি তাদের জন্য বিপদজনক গণ্য হবে -সেটি বরং স্বাভাবিক। কারণ, তারা জানে, ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কুর’আনী জ্ঞান সমৃদ্ধ ইসলামী চেতনা নিয়ে বের হলে তারা তাদের অনৈসলামী সেক্যুলার শাসনের পতন ঘটাতে জিহাদে নামবে। তারা সৈনিক হবে ইসলামী রাষ্ট্রের। এজন্যই তাদের শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হয়, ছাত্রদের পবিত্র কুর’আন এবং নবীজী (সা:) জীবন ইতিহাসে অজ্ঞ রাখা। এ জন্যই একজন বাংলাদেশী রবীন্দ্রনাথ ও শেখ মুজিবের উপর দীর্ঘ রচনা লিখতে পারলেও নবীজী (সা:)‘য়ের জীবনীর উপর রচনা লিখতে পারে না। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত যে জিহাদ -সেটিও সে বুঝে না। জিহাদ তার কাছে সন্ত্রাস বা জঙ্গীবাদ মনে হয়। বাংলাদেশের শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী চরিত্রটি ব্রিটিশ আমল থেকেই; কিন্তু ১৯৭১’য়ের পর থেকে সে নীতিতে আরো তীব্রতা আনা হয়েছে।    

নবীজী (সা:)‘য়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও টেক্সট বুক

নবীজী (সা:)‘য়ের শিক্ষাব্যবস্থার মূল টেক্সট বুক ছিল পবিত্র কুর’আন। পবিত্র কুর’আনের মাধ্যমেই সমগ্র মানব জাতিকে পাঠ দেন সর্বজ্ঞানী ও সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহান আল্লাহ তায়ালা। জ্ঞানের ভূমিতে মানব সন্তানদের কোথায় শূণ্যতা, কোথায় সংকট এবং কিরূপে বাড়ানো যায় তাদের ঈমানের পুষ্টি  -সেটি সর্বজ্ঞানী মহান স্রষ্টার চেয়ে অধিক আর কে জানেন? সে শূণ্যতা, সংকট ও অপুষ্টি দূর করতেই তিনি কুর’আন নাযিল করেছেন শিক্ষাদানের পূর্ণাঙ্গ টেক্সটবুক রূপে। এ পবিত্র কিতাব বিস্ময়কর সফলতা দেখিয়েছে নবীজী (সা:)’য়ের যুগে। এ কিতাব থেকে পাঠদান ও পাঠ গ্রহণের ফলেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নির্মিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুর’আন থেকে পাঠগ্রহণকে যেমন ফরজ করেছেন, তেমনি ফরজ করেছেন পাঠদানকে। এটিই হতে হয় মুসলিম দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূলনীতি। তাই যে শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠদানের এ ফরজ পালন হয়না, সে শিক্ষায় মুসলিমের কোন কল্যাণ নাই। এ বিষয়ে নির্দেশ এসেছে নিচের আয়াতে:

فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَن يَخَافُ وَعِيدِ

অর্থ: “অতএব (হে নবী), যে আমার শাস্তিকে ভয় করে, তাকে কুর‘আনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন।”  -(সুরা ক্বাফ, আয়াত ৪৫


শিক্ষার অর্থ নসিহত দেয়া, পথ দেখানো এবং বিবেককে জাগ্রত করা। শিক্ষক নসিহত দিবে এবং পথ দেখাবে সৎ, উত্তম ও কল্যাণকর কাজের। এবং সেটি হতে হবে পবিত্র কুর‌‘আন থেকে। কারণ এ বিশ্ব চরাচরে কোনটি সঠিক, কোনটি উত্তম ও কল্যাণকর -সেটি জানিয়ে দেয় একমাত্র পবিত্র কুর’আন। ইসলাম কারো উপর জোর পূর্বক কিছু চাপিয়ে দেয় না; বরং নসিহত করে। পবিত্র কুর’আন ঈমানদারের বিবেককে জাগ্রত করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর খলিফার দায়িত্ব পালনের কথা। মহান রব’য়ের খলিফা রূপে মুমিনের নিজ দায়িত্বের স্মরণ হলো তাঁর যিকর। মুমিনকে বাচতে হয় সে যিকর নিয়ে। এ কিতাব থেকে তারাই ফায়দা পায় যাদের রয়েছে শ্রবন, দর্শন এবং হৃদয়ে ধারণ করার সামর্থ্য; যারা বিবেকশূণ্য, ভাবনাশূণ্য ও তাড়নাশূণ্য - এ কিতাবে তাদের জন্য ফায়দা সামান্যই। নিচের আয়াতে বলা হয়েছে:

إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَذِكْرَىٰ لِمَن كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ

অর্থ: “এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্যে, যার রয়েছে অনুধাবন করার মত অন্তর। অথবা সে নিবিষ্ট মনে শ্রবণ করে।” -(সুরা ক্বাফ, আয়াত ৩৭)।

মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে জালেম শুধু তারা নয়, যারা অন্যের উপর জুলুম নির্যাতন ও খুন খারাবি করে। বরং জালেম তারাও যারা নিজের ঈমান, বিবেক ও আত্মাকে হত্যা করে। ঈমানে পুষ্টি জুগায় পবিত্র কুর’আন -যার উল্লেখ এসেছে সুরা আনফালের ২ নম্বর আয়াতে। তাই কুর’আন থেকে দূরে থাকার অর্থ ঈমানকে হত্যা করা। ঈমানকে হত্যার অপরাধ অতি গুরুতর। দৈহিক হত্যা কাউকে জাহান্নামে নেয় না; কিন্তু ঈমান হত্যার কাজটি হলে তাকে জাহান্নামে যেতে হয়। তাই এটি গুরুতর জুলুম। অথচ বাংলাদেশের স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে  ঈমান হত্যার কাজটি হচ্ছে মহামারি আকারে। সেটি যেমন কুর’আন থেকে দূরে রেখে, তেমনি নানা রূপ দুষ্ট দর্শন ও মিথ্যা মতবাদে দীক্ষা দিয়ে। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুর’আনে এদেরকে বড় মাপের জালেম বলেছেন -যার উল্লেখ এসেছে নিচের আয়াতে। এ জুলুমের অপরাধে তাদের তিনি অবশ্যই শাস্তি দিবেন -নিচের আয়াতটিতে সে ঘোষণাও এসেছে। বস্তুত ঈমানশূণ্য ও বিবেকশূণ্য জালেমের জীবনে বিদ্রোহ, জুলুম নির্যাতন, খুন খারাবি ও নানা পাপের পথের যাত্রার শুরু তো এখান থেকেই। বলা হয়েছে:

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن ذُكِّرَ بِآيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا ۚ إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنتَقِمُونَ

অর্থ: “যে ব্যক্তিকে তার রব তথা পালনকর্তার আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়, অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে? আমি নিশ্চয়ই এই অপরাধীদেরকে শাস্তি দেব ।” -(সুরা সাজদাহ, আয়াত ২২)।


শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে অপরাধকর্মের কারখানা


পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিম দেশগুলিতে পবিত্র কুর’আনের ন্যায় মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ টেক্সট বুক থেকে পাঠদানের কাজটি হয়না। ফলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম ছাত্র ছাত্রীগণ ডিগ্রি পাচ্ছে বটে, কিন্তু সে শিক্ষা থেকে ওহীর জ্ঞানের পুষ্টি পাচ্ছে না তাদের ঈমান। সে পুষ্টিহীনতায় মারা পড়ছে তাদের ঈমান। সে মৃত ঈমানের স্পষ্ট আলামত দেখা যায় তাদের চরিত্র, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। এমনকি দ্বীনি মাদ্রাসাগুলিও তেমন সফলতা দেখাতে পারছে না। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয়েছে অপরাধকর্মের কারখানায়। এবং সে গুরুতর অপরাধ হলো ঈমান হত্যার এবং ছাত্র ছাত্রীদের অপরাধী রূপে গড়ে তোলার।

বাংলাদেশের কপালে যারা ৫ বার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বৃত্তকবলিত রাষ্ট্রের কালিমা লেপন করলো -তারা ক্ষেত খামার ও কলকারখানা থেকে বেড়ে উঠেনি। তারা বেড়ে উঠেছে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় বিবেক হত্যা ও ঈমান হত্যার কারখানাগুলি থেকে। এরূপ ব্যাপক দুর্বৃত্তায়নের ফলে বাঙালি মুসলিমগণ দারুন ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে নবীজী (সা:)’য়ের যুগের ন্যায় সবল ঈমানের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে। তাদের দুর্বল ঈমান নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতে হাজির করলেও মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদে হাজির করে না। এবং হাজির করে না ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে। এমন কি নির্বাচনে শরিয়া পক্ষে ভোটদানের জন্য যে সামান্য ঈমান দরকার -সে ঈমানটুকুও তারা দেখাতে পারছে না। তাদের ভোটে বাংলাদেশে বিজয় পেয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, দলীয় ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের হারাম রাজনীতির নৃশংস ও প্রতারক দুর্বৃত্তরা। এরা দেশে নৃশংস  চাঁদাবাজী, দখলবাজী, গুম, খুন, ঘুষ ও সন্ত্রাসের প্লাবন এনেছে। মশা উৎপাদনের নোংরা জলাশয় নির্মূল না করে শুধু মশানাশক বিষ ছিটিয়ে লাভ নাই। প্রতিদিন নিহত মশার চেয়ে অধিক মশা সে জলাশয়ে জন্ম নেয়। তেমনি দুর্বৃত্ত নির্মূলের কারখানা নির্মূল না করে দেশ থেকে দুর্বৃত্তির রাজনীতি নির্মূল করা অসম্ভব। এবং সে কারখানাগুলি হলো দেশের শিক্ষাঙ্গণ।          

শিক্ষানীতিই নির্ধারণ করে জনগণের দর্শন, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি এবং চারিত্রিক পরিশুদ্ধির মান। ব্যর্থ শিক্ষানীতির কারণে মুসলিম সন্তানদের পরিশুদ্ধির কাজটি কোথাও সঠিক ভাবে হচ্ছে না। ফলে মুসলিম শিশু বেড়ে উঠছে অজ্ঞতা, অসভ্যতা, বর্বরতা, দুর্নীতি ও মাদকের প্রতি আসক্তি নিয়ে। এরই প্রমাণ, বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি দুর্বৃত্তিতে এ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। এরূপ কদর্য নৈতিক অবস্থা সম্ভবত জাহিলী যুগের আরব জাহিলদেরও ছিল না। বাংলাদেশে অসভ্য কর্মের নতুন রেকর্ড নির্মিত হয়েছে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। সেদিন নির্বাচনের আগের রাতে সমগ্র দেশ জুড়ে ভোট ডাকাতির। নির্বাচনের দিন ভোটারদের ভোট দিতে দেয়া হয়নি, বরং রাতে ভোট দিয়েছে পুলিশ, নির্বাচনি কর্মচারী ও শাসক দলের ক্যাডারগণ। খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা পলায়ন করলেও চাঁদাবাজগণ পলায়ন করেনি। ফলে বাংলাদেশ এখনো ভাসছে দুর্বৃত্তির জোয়ারে। অথচ এ দেশের তথাকথিত আলেম ও জনগণের গর্ব মসজিদ মাদ্রাসার বিশাল সংখ্যা ও তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় বিপুল লোক সমাগম নিয়ে।   


শিক্ষাব্যবস্থা: শত্রুশক্তির নাশকতার হাতিয়ার


দেশে একটি সুষ্ঠ ও সফল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার মূল দায়িত্বটি রাষ্ট্রের। সেটিকে অবশ্যই কুর’আন ভিত্তিক হতে হয়। পবিত্র কুর’আনকে বাদ দিয়ে মুসলিমদের শিক্ষার কোন সিলেবাসই রচিত হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানদান বাদ দিলে জ্ঞানার্জনের ফরজ পালিত হয়না। একটি মুসলিম রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রণয়ন -যা দিয়ে মুসলিম নাগরিকদের জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় হয়। কৃষক চাষাবাদ করতে পারে, শ্রমিক কারখানায় শ্রম দিতে পারে, সরকারি কর্মচারি অফিসে কাজ করতে পারে; কিন্তু সফল একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ তো রাষ্ট্রের। একমাত্র তখনই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
 

কিন্তু রাষ্ট্র যখন ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হয় -তখন সেটি হয় না। তখন ঘটে উল্টোটি। তখন দুর্বৃত্ত শাসক শক্তির স্ট্র্যাটেজি হয়, পবিত্র কুর’আনকে ছাত্র ছাত্রীদের দৃষ্টির অগোচরে রাখা। শিক্ষাব্যবস্থা তখন নাশকতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। সে নাশকতাটি ইসলামের বিরুদ্ধে এবং মুসলিম সন্তানদের ঈমান ধ্বংসের কাজে। বাংলাদেশে তো সেটিই দিনের পর দিন হচ্ছে। এবং সেটি হচ্ছে মুসলিম জনগণের রাজস্বের অর্থে। তখন শিক্ষালয়ে বহু কিছুই পড়ানো হয় বটে, কিন্তু কুর’আন থেকে জ্ঞানদানের কাজটি না হওয়ায় মুসলিম সন্তানের জ্ঞানার্জনের ফরজটি আদায় হয়না। ফলে পরিকল্পিত ভাবেই ঈমানদার বানানোর কাজটি করা হয়না। ফ্যাসিস্ট মুজিব ও হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিণত হয় ছাত্র ছাত্রীদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর হাতিয়ারে। ছাত্র ছাত্রীদের গড়ে তোলা হয় ইসলামের শত্রু রূপে। ২০১৩ সালে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে এসব মগজ-ধোলাইকৃত ছাত্র ছাত্রীদের দেখা গেছে ইসলামপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে “বিচার নয়, ফাঁসি চাই” স্লোগান দিতে। তাদের দাবী মেনে নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার কারাদণ্ডকে ফাঁসিতে রূপান্তরিত করা হয়।

 
ঈমানদারের দায় ও ব্যর্থতা

 
প্রতিটি মুসলিমের জিহাদ তাই শুধু দেশের সীমান্তে প্রতিরক্ষা দেয়া নয়; বরং সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামের শত্রুদের হাত থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতি বাঁচানোর জিহাদ। ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে হাসিনা ও তার ফ্যাসিবাদী শক্তির পতন হয়েছে; কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ভারত সে পতিত শক্তিকে আবার  ক্ষমতায় বসাতে চায়। কারণ, বাংলাদেশের মাটিতে একমাত্র তারাই ভারতের অনুগত সেবক পক্ষ। শয়তানী শক্তির সে ষড়যন্ত্র রুখতে প্রতিটি ঈমানদারকে প্রতি মুহুর্ত বুদ্ধিৃবৃত্তিক ও রাজনৈতিক জিহাদ নিয়ে বাঁচতে হয়। শয়তানের যুদ্ধ যেমন প্রতিক্ষণের, তেমনি ঈমানদারের প্রতিরোধের যুদ্ধটিও হতে হয় প্রতিক্ষণের। শত্রুশক্তির ষড়যন্ত্র, হামলা ও অধিকৃতির মুখে নিরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা হলো নিরেট মুনাফিকির আলামত। 


নবীজী (সা:) এবং খোলাফায়ে রাশেদার আমলে প্রত্যেক সাহাবী শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে জিহদে যোগ দিতে প্রতিমুহুর্ত প্রস্তুত থাকতেন। ফলে তাদের আমলে মুসলিম ভূমি কখনোই শত্রুদের হাতে অধিকৃত হয়নি। তাদের জিহাদ শুধু সশস্ত্র যুদ্ধে সীমিত ছিল না, বরং সেটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক অঙ্গণেও। যখনই তারা জিহাদে অবহেলা দেখিয়েছে তখনই মুসলিম ভূমি এজিদের ন্যায় নৃশংস দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়েছে। তখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শুরু হয়েছে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে লাগাতর নাশকতা। এবং সে নাশকতার শুরু উমাইয়াদের গোত্রবাদী নাশকতা দিয়ে। তাদের সে বর্বর অপরাধ কর্ম থেকে বাঁচেনি ইমাম হোসেন (রা:)’র ন্যায় জান্নাতের যুবনেতা ও নবীজী (সা:)’য়ের প্রিয় নাতি। আজ প্রায় সমগ্র মুসলিম দুনিয়া -বিশেষ করে আরব দেশগুলি অধিকৃত হয়ে আছে এজিদের আদর্শিক আত্মীয়দের হাতে। ইসলামের এ দেশী শত্রুদের হাত থেকে ১৯৪৭’য়ের অখণ্ড পাকিস্তান যেমন বাঁচেনি, তেমনি ১৯৭১’য়ে সৃষ্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতাও বাঁচেনি। দেশটিতে গণতন্ত্র বার বার কবরে গেছে। স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তদের হাতে নৃশংস নাশকতার শিকার হয়েছে ইসলামপন্থী নেতাকর্মীগণ। দেশটিতে পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছে কেবল ভারতীয় স্বার্থের সেবকগণ। তাদের হাতে গণহত্যা হয়েছে যেমন ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে, তেমনি ২০২৪ সালে ঢাকার রাজপথে। আজও তারা ক্ষুধার্ত শকুনের ন্যায় অপেক্ষা আছে।

বাংলাদেশের সংবিধান, রাজনীতি, প্রশাসন, পুলিশ, আইন আদালত, শিক্ষাব্যবস্থাসহ প্রতিটি ক্ষেত্র গুরুতর রোগাগ্রস্ত। সর্বক্ষেত্রে সংস্কার চাই। তবে হৃৎপিণ্ড রোগাগ্রস্ত হলে ভাঙা পা জুড়া লাগিয়ে রোগীকে বাঁচানো যায় না। প্রথমে হৃৎপিণ্ডের চিকিৎসা চাই। তেমনি দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। এটিই হলো ঈমানদার, চরিত্রবান ও যোগ্যবান মানব নির্মাণের কারখানা। সেটি বিকল রেখে কোন সাফল্যই সম্ভব নয় -না রাজনৈতিক অঙ্গণে, না প্রশাসনিক ও বৈচারিক অঙ্গণে। কোন ক্ষেত্রেই তখন সৎ নাগরিক ও সৈনিক জুটবে না। তাছাড়া শিক্ষা থেকে শুরু করাটি নবীজী (সা:)‘য়ের সূন্নত। তিনি রাষ্ট্র নির্মাণের ১৩ বছর পূর্বে অজ্ঞতার নির্মূলে জিহাদ শুরু করেন। সে যুদ্ধে তাঁর অস্ত্রটি ছিল পবিত্র কুর’আন। আজও সে সূন্নতের বিকল্প নাই। ১৩/১০/২০২৬