মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নড়াইল: নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় দুই বছরে কেবল কাগজে-কলমে গড়ে উঠেছে ২৭টি পার্টনার ফিল্ড স্কুল (PFS)। বাস্তবে কোথাও কৃষক ছিল না, কোথাও হয়নি একটিও ক্লাস। এই অনিয়মের পেছনে দায়ী হিসেবে উঠে এসেছে কালিয়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ইভা মল্লিকের নাম। তার বিরুদ্ধে কৃষি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ভাতা লোপাট, প্রনোদনা বিতরণে দুর্নীতি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় অতিরিক্ত কৃষি অফিসার পদে বদলি করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পত্রে এ বদলির আদেশ জারি করা হয়। যদিও তার পদমর্যাদা (গ্রেড-৬) অপরিবর্তিত রয়েছে, তবে তাকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অধীনে কাজ করতে হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।
কাগজে স্কুল, মাঠে শূন্যতা
২০২৩ সালের আগস্টে কালিয়ায় শুরু হয় পার্টনার ফিল্ড স্কুল প্রকল্প। ২৫ জন কৃষককে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক কৃষি চর্চা শেখানোই ছিল লক্ষ্য। প্রতিটি স্কুলে ১০ সপ্তাহে ১০টি ক্লাসের কথা থাকলেও বেশিরভাগ স্কুলেই সেশন শেষ হয় ১ থেকে ৫ দিনের মধ্যে। প্রকল্পের ১৪টি স্কুলের প্রশিক্ষক ছিলেন খোদ কৃষি কর্মকর্তা ইভা মল্লিক। নিয়মিত ভাতা নিলেও, বেশিরভাগ ক্লাসে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন বলে কৃষকদের অভিযোগ।
ক্লাস শেষে কৃষকদের নাস্তা ও সম্মানী বাবদ ২৮০০ টাকা করে পাওয়ার কথা থাকলেও মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো অর্থ পাননি অনেকে।
ভাতা নয়ছয়, লাইসেন্স নবায়নে ঘুষের অভিযোগ
ইভা মল্লিকের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, যেমন:
অফিস সহকারীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত বলয়ের লোক দিয়ে আর্থিক হিসাব পরিচালনা
সার ও বীজ ডিলারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে লাইসেন্স নবায়ন
প্রনোদনা বণ্টনে স্বজনপ্রীতি
প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়িমসি ও অর্থ আত্মসাৎ
একাধিক কৃষি প্রকল্প—যেমন সমলয়, তৈলজাতীয়, রাজস্ব, পুষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ
২০২৫ সালের ৭ জুলাই, এক স্থানীয় সার ও বীজ ডিলার দুদকে ইভা মল্লিকের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে বলা হয়, কৃষি কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি পার্শ্ববর্তী একটি ব্যাংকে তার পরিবারের সদস্যের অ্যাকাউন্টে প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন, যা তার আয় ও দায়িত্বের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বদলির পর স্বস্তি
বদলির খবর নিশ্চিত করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন। তিনি জানান, "গ্রেড-৬ অক্ষত থাকলেও তাকে এখন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অধীনে কাজ করতে হবে।"
কালিয়া উপজেলা কৃষি অফিসে এই খবরে স্বস্তির হাওয়া। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, “উপজেলার কৃষি উন্নয়ন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল তার জন্য। এখন হয়তো কিছুটা গতি আসবে।”
ইভা মল্লিকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।