• ঢাকা |

এ জীবন কিরূপে বিফল হয় এবং কিরূপে সফল হয়?


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সফল হতে যে পরীক্ষায় পাশ করাটি অপরিহার্য

মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ভূমিকম্প, সুনামী বা ঘুর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দিয়ে সৃষ্টি করেননি। কিন্তু প্রতিটি সুস্থ মানুষকেই আর্থিক, শারিরীক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য দিয়েছেন স্বৈরাচারী জালেম শাসকের বিরুদ্ধে খাড়া হওয়ার। ব্যক্তির সে সামর্থ্যই হলো মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত সর্বশ্রেষ্ঠ আমানত। সে আমানতের বিনিয়োগ করতে হয় মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা পূরণে তথা তাঁর দ্বীনের বিজয়ে। নইলে সে আমানতের খেয়ানত হয়। আর প্রতিটি খেয়ানতই তো কবিরা গুনাহ। তাছাড়া পরীক্ষা না নিয়ে বিশাল পুরস্কার দেয়া মহান আল্লাহ তায়ালার সূন্নত নয়। পবিত্র কুর’আনে এ বিষয়ে বার বার হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে। তাই বার বার পরীক্ষা দিতে হয়েছে এমন কি নবী রাসূলদেরও। সেটি ঈমান, আমল ও ছবরের। যারা সে পরীক্ষায় পাশ করে তাদের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার পুরস্কারটি হলো অনন্ত কালের জন্য নিয়ামত ভরা জান্নাত। সেখানে সে পাবে এক মৃত্যুহীন-আনন্দময় জীবন। সেখানে যা চাইবে, তৎক্ষণাৎ তাই দেয়া হবে। মানব জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় পাওয়া। পরীক্ষা নেয়ার জন্যই যে এ জীবন, সে ঘোষণা এসেছে নিচের আয়াতে:

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ

অর্থ: “(তিনিই সে মহান আল্লাহ) যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, সেটি এজন্য যে যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন -কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।”-(সুরা মুলক, আয়াত ২)।

যারা প্রকৃত মু’মিন, তারা মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে নির্ধারিত অনিবার্য পরীক্ষার গুরুত্ব বুঝে। এ জীবনে সফল হতে এ পরীক্ষায় পাশ করাটি যে অপরিহার্য -সেটি তারা বুঝে। অতএব সে পরীক্ষাকে সামনে রেখেই তারা বেড়ে উঠে এবং প্রস্তুতি নেয়। ক্লাসের ভাল ছাত্ররা কখনোই পরীক্ষা থেকে দূরে থাকে না। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের কারণে এমন কি গায়ে জ্বর ও ব্যথা নিয়েও তারা পরীক্ষায় হাজির হয়। কারণ জানে, পরীক্ষা থেকে দূরে থাকার অর্থ প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হওয়া। তেমনি ঈমান ও আমলের  পরীক্ষা থেকে দূরে থাকার অর্থ জান্নাত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা। তাই ঈমানদার মাত্রই পরীক্ষায় পাশ করতে কোমর বেঁধে নামে। মুমিনের জীবনে পরীক্ষা হয় পদে পদে। সেটি প্রতি মুহুর্তের চালচলন, আচরণ, লেনদেন, সততা, কর্ম ও ছবরের মধ্য দিয়ে। তবে চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় জিহাদের ময়দানে। সেখানে বিনিয়োগ করতে হয় শুধু অর্থ, শ্রম, সময় ও মেধার নয়, বরং নিজ রক্তের। সে চুড়ান্ত পরীক্ষায় পাশ করতে গিয়ে নবীজী (সা:)’য়ের শতকরা ৫০ ভাগের অধিক সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। সে পরীক্ষার তথা লড়াইয়ের শুরুটি দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষা সংস্কৃতির অঙ্গণ থেকে। সে লড়াই অনেক সময় সশস্ত্র রূপ নেয়। সে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে স্থির হয় দেশ জান্নাতের বাহন হবে, না জাহান্নামের বাহন হবে -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদেরকে সে রণাঙ্গণে অবিরাম লড়তে দেখা যায়। কিন্তু যারা রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষা সংস্কৃতির সে রণাঙ্গণ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে -বুঝতে হবে পরীক্ষা দেয়া ও পরীক্ষায় পাশ করা নিয়ে তাদের আগ্রহ নাই। বুঝতে হবে তারা ব্যর্থ হয়েছে মহান রব’য়ের পরিকল্পনা বুঝতে। না বুঝে তারা গা ভাসিয়ে দেয় জাহান্নামের স্রোতে।  

শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন শুধু আযাব নিয়ে নয়, বরং প্রতিটি বাংলাদেশীর জন্য ঈমানের পরীক্ষা নিয়ে হাজির হয়েছিল। ঈমানদার কতটুকু ঈমানের অধিকারী -সে পরীক্ষাটি শুধু দৈহিক রোগব্যাধী, অঙ্গহানী, আপনজন হারানো ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে হয়না, বরং সে পরীক্ষাটি হয় মাথার উপর জালেম শাসকের নৃশংস শাসন চাপিয়ে দিয়েও। জালেম শাসকের শাসনকালে জিহাদের আযান দেয়া হয় প্রতিটি ব্যক্তির কানে। মোয়াজ্জিন এখানে খোদ মহান আল্লাহ তায়ালা। সে আযানের ধ্বনি পবিত্র কুর‌’আনের ছত্রে ছত্রে। যারা কুর’আন বুঝে তেলাওয়াত করে -তারা সে আযান স্পষ্ট শুনতে পায়। কিন্তু যারা কুর’আন বুঝে না, তারা সে আযানও শুনতে পায়না। ফলে আযানের মাঝেও তারা ঘুমিয়ে থাকে। অথচ মহান আল্লাহ তায়ালা প্রতিক্ষণ দেখেন, কারা সে আযান শুনলো এবং সে আযানে সাড়া দিল। তিনি দেখেন, তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করতে কে কতটা অর্থ, শ্রম, মেধা, সময় ও রক্তের বিনিয়োগ করলো। সর্বদ্রষ্টা মহান রব ব্যক্তির প্রতিটি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ভাবনা ও তাড়নার খবর রাখেন। সে সাথে কাঁধের উপর বসে কর্মের হিসাব রাখছেন দুই জন ফেরেশতা। ফলে প্রতিটি ব্যক্তির উপর নানা রূপ খবরদারি। গোপনা রাখার সুযোগ নাই। যারা ঈমানদার হওয়ার দাবীতে সোচ্চার, এ পরীক্ষার মধ্য দিয়েই পরিমাপ করা হয় তার ঈমানের।

 

প্রিয় বান্দাদের উঠিয়ে নেন জিহাদের ময়দান থেকে

মহান আল্লাহ তায়ালার রীতি হলো, জিহাদের ময়দান থেকেই তিনি সরাসরি জান্নাতে উঠিয়ে নেন তাঁর পথে আত্মদানকারী প্রিয় শহীদদের। মহন রব’য়ের পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি এসেছে নিচের আয়াতে:

إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌۭ فَقَدْ مَسَّ ٱلْقَوْمَ قَرْحٌۭ مِّثْلُهُۥ ۚ وَتِلْكَ ٱلْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ ٱلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَآءَ ۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلظَّـٰلِمِينَ

অর্থ: “যদি কোন আঘাত তোমাদের স্পর্শ করে, তবে সেরূপ আঘাত তো (তোমাদের বিরোধী) কওমকেও স্পর্শ করেছে। এবং আমি এরূপ দিনগুলির মানবের মাঝে পালাক্রমে আবর্তন ঘটাই। এর মধ্য দিয়ে কারা প্রকৃত ঈমান এনেছে আল্লাহ সেটি প্রকাশ করে দেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে তুলে নেন শহীদদের। এবং আল্লাহ জালেমদের ভালবাসেন না।” –( সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪০)। ‍

তবে এরূপ আঘাত এবং জিহাদের ক্ষেত্রগুলি শুধু পরীক্ষার ক্ষেত্রই নয়, মু’মিনের ঈমান ও আমলের পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রও। সেসাথে কাফির শক্তির নির্মূলের ক্ষেত্রও। সে ঘোষণাটিও এসেছে মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে নিচের আয়াতে:

وَلِيُمَحِّصَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَيَمْحَقَ ٱلْكَـٰفِرِينَ

অর্থ: “এবং (বিপদ এবং জিহাদে জান মালের ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে) অবশ্যই পরিশুদ্ধ করেন ঈমানদারদেরকে এবং ধ্বংস করেন কাফিরদের।”-(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪১)। ‌

প্রশ্ন হলো, যারা কখনো বিপদে পড়লো না, পরীক্ষার হলেও প্রবেশ করলো না এবং বিনিয়োগ করলো না নিজ অর্থ, মেধা, শক্তি ও রক্তের -সেকি কখনো সে পরীক্ষায় পাশের কথা ভাবতে পারে? সে যে পরীক্ষায় নিশ্চিত ফেল করবে এবং ফেল করার কারণে জাহান্নামে পৌঁছবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? তাছাড়া জিহাদে সংশ্লিষ্ট না হলে সমাজ থেকে দুর্বৃত্ত শক্তির নির্মূলই বা কিরূপে সম্ভব হবে। কিরূপে পরিশুদ্ধ হবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র? এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পবিত্র কুর’আনে বার বার আলোচিত হয়েছে। কিন্তু ক’জন তা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে? অথচ পরীক্ষায় পাশের জন্য পবিত্র কুর’আন হলো মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত টেক্সট বুক। এ টেক্সট বুক না পড়ে এবং না বুঝে পরীক্ষায় পাশ করা অসম্ভব। মুমিনের জন্য পরীক্ষায় পাশকে সহজ করতেই মহান আল্লাহ তায়ালা নামাজ রোজা ফরজ করার বহু বছর আগে পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে কুর’আন থেকে শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভের সে কাজটি হচ্ছে না। সেকাজের জন্য শুধু পবিত্র কুর’আন তেলাওয়াত করতে জানলে চলে না, বুঝার সামর্থ্যও চাই। সে সামর্থ্য কি বাংলাদেশে লাখো মানুষের মাঝে একজনেরও আছে। বহু হাজার মাদ্রাসাও নির্মিত হয়েছে। সেসব মাদ্রাসা বিশেষ মজহাব, ফেরকা ও তরিকার অনুসারী গড়তে সফল হলেও ক’জনকে প্রকৃত কুর’আনের অনুসারী করতে পেরেছে? কুর’আনের অনুসারী হলে তো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদেও তাদের দেখা যেত। তারা কি নিজেদের কর্মকে শুধু ইমামতি, মোয়াজ্জিনী ও মাদ্রাসার শিক্ষকতার মাঝে সীমিত করতো? ব্যর্থতার মূল কারণ তো এ পবিত্র কুর’আন বুঝায় ও তার অনুসরণে ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার কারণে মহান আল্লাহ তায়ালার আযান তাদের বিবেকের উপর কোন আছড়ই করছে না; যেন তালা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।  

 

মূল সমস্যাটি বাঁচার নিয়তে

ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর বাঁচার নিয়ত। ব্যক্তির ধর্ম, কর্ম, চরিত্র, আচরণ, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতি কিরূপ হবে সেটি নির্ধারণ করে তার বাঁচার নিয়ত। ব্যক্তি যা চায় এবং যে ভাবে বাঁচতে চায় -সেটির প্রকাশ ঘটে তাঁর নিয়তে। নিয়তের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর ঈমান। নিয়তের নির্মাণ এবং সে নিয়ত নিয়ে বাঁচার দায়ভারটি ব্যক্তির নিজের। কিন্তু সে নিয়ত কতটা সফল হবে বা বিফল হবে -সে বিষয়টি একমাত্র আল্লাহ তায়ালার হাতে। ঈমানদার পুরস্কার পায় তার নিয়ত এবং নিয়তকে সফল করার কাজে তার নিজ মেধা, অর্থ, শ্রম ও রক্তের বিনিয়োগের কারণে। তাই ঈমানদারকে শুধু দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য থাকলে হয় না, থাকতে হয় সে সামর্থ্যের বিনিয়োগে প্রবল নিয়তও। তাই নিয়ত শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের ন্যায় খণ্ড খণ্ড ইবাদতে থাকলে চলে না, থাকতে হয় সমগ্র জীবন নিয়ে এবং এ জীবনে বাঁচার প্রতিটি পর্বে -এমন কি মৃত্যুবরণের ক্ষেত্রেও।

ব্যক্তির প্রতিটি কর্মের মূল্যায়ন হয় তার নিয়তের ভিত্তিতে -বোখারী শরিফের এটিই প্রথম হাদীস। তাই কোটি টাকা দানে, এমন কি প্রাণদানেও কোন সওয়াব নাই -যদি নিয়তটি আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্য না হয়। মানুষের প্রতিটি ভাবনা, তাড়না ও কর্মই ইবাদতে পরিণত হয় যদি উদ্দেশ্য হয় একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করা এবং তাকে খুশি করা। চিন্তু ভাবনা এবং কাজ কর্ম তো কম বেশি সবাই করে। কিন্তু ঈমানদার চিন্তু ভাবনা এবং কাজ কর্মগুলি মহামূল্য ইবাদতে পরিণত করে। সে গুলিতে বিশাল value add তথা মূল্য সংযোজন করে সেগুলিকে আল্লাহমুখী করে তথা আল্লাহকে খুশি করার নিয়ত যোগ করে। তখন তার প্রতিটি কথা, কর্ম, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, লেখালেখি অতি উচ্চ মূল্যের ইবাদতে পরিণত -যা রোজহাশরের বিচার দিনে ভারী নেক আমল গণ্য হয়। তাই প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার নিয়ত। অধিকাংশ মানুষ শুধু তার কর্ম, চরিত্র, আচরণ, রাজনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলিতেই শুধু ভুল করে না, প্রকাণ্ড ভুল করে নিয়ত বাঁধার ক্ষেত্রেও। সে ভয়ানক ভুল থেকে কিরূপে বাঁচাতে হয় এবং কিরূপ হতে হয় সঠিক নিয়ত -সেটিও দয়াময় মহান রব শিখিয়েছেন নিচের আয়াতে:

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

অর্থ: “(হে রাসূল) আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে।”-(সুরা আনয়াম, আয়াত ১৬২) ।

 

যে দর্শন বিপ্লব আনে

উপরের আয়াতের মধ্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দর্শন আছে -যা জীবনে বিপ্লব আনে এবং প্রতি পদে ঈমানদারকে পথ দেখায়। এর অর্থ, ঈমানদারের প্রতি মুহুর্তের প্রচেষ্টা, প্রতিটি ইবাদত কর্ম, প্রতিটি যুদ্ধ বিগ্রহ এবং সর্বোপরি তাঁর বাঁচায় ও প্রাণদানে একমাত্র নিয়েত হবে একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করা। এর অর্থ, ঈমানদার শুধু বাঁচার জন্য বাঁচবে না, সে বাঁচবে মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা জন্য। সে এমন কোন কাজই করবে না এবং এমন কোন নিয়তই করবে না -যা মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও এজেন্ডার সাথে সাংঘর্ষিক। অর্থাৎ তাকে হতে হবে মহান  আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে একাত্ম। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাই হবে ঈমানদারের এজেন্ডা। যেহেতু ব্যক্তির প্রতিটি সামর্থ্যই মহান রব’য়ের আমানত, সে আমানত ব্যয় হবে একমাত্র তাঁরই নির্দেশিত পথে। নইলে খেয়ানত হয়। আর খেয়ানত করা মুনাফিকের ধর্ম। মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার পথে সংঘাত আসবে। হতাহতের ঘটনাও ঘটবে। আহত হয়ে এবং মৃত্যুর মুখোমুখী দাঁড়িয়ে ঈমানদার ব্যক্তি তাঁর দুঃখ ভুলে যায় এবং প্রশান্তি খুঁজে পায় তাঁর নিয়তের মধ্যে। বিপদে পতিত হওয়া ঈমানদার ব্যক্তির মনের কথাটি মহান রব বর্ণনা করেছেন নিচের আয়াতে:

الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

অর্থ: “যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই ফিরে যাবো তাঁরই সান্নিধ্যে।”–(সুরা বাকারা, আয়াতে ১৫৬)।

পবিত্র কুর’আনের উপরিউক্ত ঘোষণাটি এ জীবনে বাঁচার পিছনে এটি দর্শন দেয় এবং বাঁচার জন্য একটি নিয়ত বেঁধে দেয়। সে বাঁচবে মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য; তাঁর পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি থাকবে তাঁর দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য। মহান আরল্লাহতায়ালার জন্য বাঁচার অর্থ: তাঁর এজেন্ডার সাথে পূর্ণ একাত্ম হয়ে বাঁচা। সেটি যেমন রাজনীতিতে, তেমনি চিন্তা-ভাবনা, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধবিগ্রহে। তাই কেউ সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, রাজতন্ত্রী ও স্বৈরাচারী এজেন্ডা নিয়ে বাঁচলে বুঝতে হবে তার বাঁচাটি মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য হচ্ছে না। তার এ জীবনের পুরা বাঁচাটিই যে ব্যর্থ হচ্ছে -সেটি বুঝতে তখন অস্পষ্টতা থাকে না। এমন ব্যর্থ ব‌্যক্তিরা পরকালে শাস্তি পায় যেমন জাহান্নামের আগুনে পৌঁছে, তেমনি শাস্তি পায় জাহান্নামে পৌঁছার আগেও। এমন দুর্বৃত্তরাই সমাজ ও রাষ্ট্রকে আযাবের হাতিয়ারে পরিণত করে। রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহর কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হবে ব্যক্তির ঈমান ও নেক আমল। বুঝতে হবে, নামাজী ও হাজী হওয়া এবং ঈমানদার হওয়া এক কথা নয়। বহু ঘুষখোর প্রতারকও নামাজী ও হাজী হতে পারে। কিন্তু তারা ঈমানদার হতে পারে না। ব্যক্তির ঈমান দেখা যায় তাঁর নেক আমলের মাঝে। তাই ঈমান বাড়লে, নেক আমলও বাড়ে। আর ঈমান বিলুপ্ত হলে বাড়ে দুর্বৃত্তি। আর প্রতিটি দুর্বৃত্তির মাঝে ব্যক্তির বেঈমানী দেখা যায়। যে বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হলো, বুঝতে কি বাকি থাকে দেশটিতে বেঈমানদের সংখ্যা এবং বেঈমানীর প্লাবন কতটা বিশাল?

 

ফরজ হলো কর্মে ও ভাবনায় “লিল্লাহ” হওয়া         

মুসলিম জীবনে ক্ষণিকের জন্যও মহান রব’য়ের এজেন্ডার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অবকাশ নাই। “ইন্না লিল্লাহি”‍ (নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর জন্য)’র মূল অর্থ সেটিই। এ দর্শন মুসলিম জীবনে প্রতি মুহুর্তে পথ দেখায়; প্রতি পদে কম্পাসের কাজ করে। ইবলিস দীর্ঘকাল মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করেছে। কিন্তু সে ইবাদত তাকে মুসলিম বানাতে পারিনি। মহান রব’য়ের একটি মাত্র হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তাকে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত করেছে। ইবলিসের মূল ব্যর্থতাটি হলো, সে ব্যর্থ হয়েছে একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য তথা “লিল্লাহি” হতে। ঈমানদার ব্যক্তির “লিল্লাহ” হতে হয় তাঁর নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধবিগ্রহসহ প্রতিটি ভাবনায় ও কর্মে। সেটি না হলে নামাজী, হাজী, ইমাম, মোহাদ্দেস, আল্লামা, পীর বা দরবেশ হয়েও সে ইবলিসের ন্যায় শয়তানে পরিণত হয়। মুসলিম উম্মাহর মাঝে এমন শয়তানদের সংখ্যাটি বিশাল বলেই মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়া ও তাঁর এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে আজ সৈনিক জুটছে না। ফলে বিশ্বের কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি ইসলামী রাষ্ট্র -যেরূপ নবীজী (সা:) নির্মাণ করেছিলেন। অথচ বিপুল সংখ্যায় সৈনিক জুটছে জাতীয়তাবাদ, দলীয় ফ্যাসিবাদ, সেক্যুলারিজম, রাজতন্ত্রের ন্যায় জাহিলিয়াত প্রতিষ্ঠা দিতে।  

“লিল্লাহ” হওয়ার বদলে যারা যুদ্ধ করে এবং মারা যায় ভাষা, বর্ণ, গোত্র, ভূগোল, দল, মতবাদকে বিজয়ী করতে - জনগণ বা সরকার থেকে তারা যতই বাহবা, মেডেল বা পদবী পাক না কেন, মারা যায় বেঈমান রূপে। ব্যক্তির প্রতিটি দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যই মহান আল্লাহ তায়ালার দেয়া, অতএব তার রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, বক্তৃতা, লেখালেখি, যুদ্ধবিগ্রহ একমাত্র “লিল্লাহ” হওয়া ফরজ; হারাম হলো অন্য খাতে সে সামর্থ্যের বিনিয়োগ। সেটি মহান আল্লাহর সাথে গাদ্দারী। এবং এরূপ হারাম বিনিয়োগ ব্যক্তির জীবনকে বিফল করে দেয়ে এবং জাহান্নামে নেয়।  

ঈমানদারকে শুধু নামাজ রোজা শিখলে চলেনা, তাকে জানতে হয় তাঁর মহান রব’য়ের কুর’আনী ঘোষিত এজেন্ডাকে। এবং প্রতিক্ষণ একাত্ম থাকতে হয় সে এজেন্ডার সাথে। এক্ষেত্রে কেউ বিদ্রোহ করলে সেটি সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে। কারণ, প্রতিটি সৃষ্টিই প্রতিক্ষণ তাঁর নজরের নিচে। তিনি শুধু ব্যক্তির কর্মই দেখেন না, তিনি জানেন তার হৃদয়ের গভীরে লুকানো স্বপ্ন ও তাড়নাকেও। তাই যার জীবনে নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, তাসবিহ পাঠ থাকলেও মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া প্রতিষ্ঠা দেয়ার জন্য রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ নাই -বুঝতে হবে সে ব্যক্তি ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে একাত্ম হতে। এর অর্থ, সে ব্যর্থ হয়েছে “লিল্লাহ” হতে। এমন নামাজীদের বিদ্রোহ ও ব্যর্থতা কি অভিশপ্ত ইবলিসের বিদ্রোহ ও ব্যর্থতার চেয়ে কম? ইবলিস বিদ্রোহ করেছিল সেজদার হুকুম পালনে, আর মুসলিম নামধারী নামাজী বেঈমানদের বিদ্রোহটি মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মত দেশে এমন বিদ্রোহীরাই তো শয়তানের এজেন্ডার সাথে একাত্ম হয় এবং মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে পরাজিত রাখে। এমন বিদ্রোহীদের কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধের ময়দানে শয়তানের এজেন্ডা প্রবল ভাবে বিজয়ী।

শয়তানের ঘোষিত এজেন্ডাটি হলো আদম সন্তানদের জাহান্নামে নেয়া। সে এজেন্ডাকে সফল করতে শয়তানের কাজ মানুষকে শুধু মূর্তিপূজারী বানানো নয়। বরং চায়, মুসলিমদের মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডা থেকে দূরে সরাতে। তাদেরকে মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়া, তাঁর বৈচারিক নীতি, তাঁর শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রকল্প এবং তাঁর দুর্বৃত্তির নির্মূলে ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদী বিধানকে ব্যর্থ করে দেয়া। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে শয়তানের বিজয় এসব ক্ষেত্রে শতভাগ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটির রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, প্রশাসন, আদালত, মিডিয়া এবং সামরিক বাহিনীতে শয়তান বিপুল সংখ্যক সৈনিক পেয়েছে।  শয়তানের এ সৈনিকগণ যেহেতু নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করে, তাদেরকে কাফির বলা যাবে না। কিন্তু যারাই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, প্রশাসন, আইন-আদালত, মিডিয়া, শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইসলামকে পরাজিত করে রেখেছে -তারাই বিশুদ্ধ মুনাফিক। নবীজী (সা:)‘য়ের যুগে এমন মুনাফিকদের মুনাফিক বলা হয়েছে। যেমন আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার তিন শত সহচরকে মুনাফি বলা হয়েছে। তাদের জীবনে বরং আজকের মুনাফিকদের চেয়ে অধিক ধর্মকর্ম ছিল। তারা নবীজী (সা:)’য়ের পিছনে নামাজ পড়েছে; তাদের জীবনে রোজা, তাসবিহ পাঠ ও কুর’আন তেলাওয়াতও ছিল। তাদের মূল ব্যর্থতা, তারা দূরে থেকেছে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদ থেকে। 

 

যে অভিযোগে নবীজী (সা:) মুসলিমদের খাড়া করবেন আদালতে

তাই মু’মিনের দেহে যতক্ষণ প্রাণ থাকে, ততক্ষণ সে বাঁচে একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য। একমাত্র তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে সে লড়াই করে ও কুর’বানী পেশ করে। কিরূপে মহান আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করা যায় -সেটি বুঝতে অনেকে ভুল করে। অনেকে ভাবে, সেটি শুধু তাঁর নামের তাসবিহ পাঠ, কুর’আন পাঠ এবং নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতের ন্যায় ইবাদতে মগ্ন থাকা। রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, প্রশাসন, আইন আদালত, শিক্ষা সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের ময়দানেও যে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডা রয়েছে এবং তাকে খুশি করতে হলে জরুরি হলো সে এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়া -সে বিষয়টি তারা বিবেচনায় আনে না। ফলে তাদের জীবনে প্রকাণ্ড ভূলটি এখানেই ঘটে। জায়নামাজে তাদের যে নিয়ত, সে নিয়ত তাদের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণে দেখা যায়না। সেখানে কাজ করে নিজ শাসক, নিজ নেতা, নিজ দল এবং নিজের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার নিয়ত। এটিই হলো কুর’আন থেকে দূরে সরা এবং সেক্যুলারাইজেশনের ফল। পূর্ণ বিজয় এখানে শয়তানের। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশীদের গর্ব বেশি বেশি মসজিদ মাদ্রাসার নির্মাণ নিয়ে, অথচ তারা নিজ দেশে বাঁচিয়ে রেখেছে শয়তানের বিশাল বিজয়। মুসলিমদের অপরাধ এখানে কুর’আন পরিত্যাগ করার।  নবীজী (সা:) এ অভিযোগে অপরাধীদের মহান রব’য়ের আদালতে তুলবেন আখেরাতে। মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে সে ঘোষণা এসেছে নিচের আয়াতে: 

وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَـٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا

অর্থ: “(আল্লাহর দরবারে) রাসূল বললেন, হে আমার রব, আমার উম্মত এই কুর’আনকে পরিত্যক্ত সাব্যস্ত করেছে।” –(সুরা ফুরকান, আয়াত ৩০)।

যারা আশা করে নবীজী (সা:)’য়ের উম্মত হওয়ার কারণে রোজ হাশরের বিচার দিনে তিনি তাদের পক্ষে সুপারিশ করবেন, তাদের জন্য এ আয়াতে রয়েছে ভয়ানক দুঃসংবাদ। কুর’আন পরিত্যাগ করার অভিযোগে মহান রব’য়ের আদালতে তাদের খাড়া করা হবে আসামী রূপে। এ মামলায় নবীজী (সা:) হবেন বাদী। তাঁর অভিযোগ যে কতটা সত্য -সেটির সাক্ষী তো আজকের মুসলিমগণ নিজেরাই। তারা কুর’আনকে পরিত্যাগ করেছে বহু আগেই। কুর’আন হলো সিরাতাল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের রোডম্যাপ। যারা সে রোডম্যাপ পরিত্যাগ করে তারা কি জান্নাত পায়? তারা কি পাবে নবীজী (সা:)’য়ের শাফায়াত? ফলে কুর’আন পরিত্যাগ আজকের মুসলিমদের জন্য কি ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে আখেরাতে -সেটি বুঝতে এরপরও কি কিছু বাকি থাকে? ০৫/১০/২০২৬