• ঢাকা |

রাষ্ট্রই যখন নাশকতার হাতিয়ার


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি রাষ্ট্র যখন পরিচালনায়

মানব জাতির সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতাটি কৃষি, শিল্প ও গৃহনির্মাণে নয়; বরং রাষ্ট্র নির্মাণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়। রাষ্ট্রাও তখন ভয়ানক নাশকতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। মানবের জান মালের সবচেয়ে বেশী ক্ষয়ক্ষতিটি ভূমিকম্প, ঘুর্ণিঝড়, সুনামী বা মহামারির কারণে হয়নি, বরং হয়েছে রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়াতে। সে ব্যর্থতার কারণে অসংখ্য আগ্রাসী যুদ্ধ, গৃহ যুদ্ধ, বর্ণবাদী ও জাতীয়তাবাদী নির্মূলের যুদ্ধ এবং বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় নৃশংস নাশকতার কাণ্ড ঘটেছে। একমাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বহু কোটি মানুষ মারাগেছে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনের কম্যুনিস্টদের হাতে। রাষ্ট্র কিরূপে আযাবের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। দেশটি পরিণত হয়েছে অপরাধীদের অপরাধ কর্মের হাতিয়ারে। বাংলাদেশে চোরডাকাত, নেশাখোর, ড্রাগ ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসীদের বহু দল আছে। কিন্তু কোন অপরাধী সংগঠনই জনগণকে এতো আযাব দেয়নি, যতটা আযাব দিচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি। অতীতে এ রাষ্ট্র জনগণকে দিয়েছে নৃশংস ফ্যাসিবাদ, হত্যা, গণহত্যা, আয়না ঘর এবং ভোট ডাকাতি ও গুম-খুনের রাজনীতি।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারিক জিয়ার সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উপর দখল জমিয়েছে অপরাধীদের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে। তাঁর মন্ত্রী ও এমপি’দের অনেকেই ঋণখেলাপি। তার দলীয় কর্মীদের মাঝে লক্ষ লক্ষ চাঁদাবাজ ও প্রতারক। সে নিজেকেও একজন প্রতারক প্রমাণিত করেছে। তাঁর প্রতারণা জুলাই সনদের সাথে। অপরাধীদের সুযোগ করে দিতে পুলিশকে করেছে নিষ্ক্রিয়। দেশ জুড়ে বেড়েছে চাঁদাবাজী, দখলবাজী, নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মাসাৎ এবং দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি নিয়ে। অবস্থা দেখে মনে হয়, সরকারের এজেন্ডা দূর্নীতির দমন বা নির্মূল নয়, বরং দূর্নীতির প্রতিযোগিতায় বিশ্বে প্রথম হওয়া। অতীতে বিএনপি সে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে ৪ বার বিশ্বে প্রথম করেছিল। ২০২৬ সালে ক্ষমতয় আসে দলটি দেশকে পুণরায় সেদিকেই ধাবিত করছে।       

মানব যেমন নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতের ন্যায় ইবাদতে পথভ্রষ্ট হতে পারে, তেমনি পথভ্রষ্ট হতে পারে রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও। আর যেখানেই পথভ্রষ্টতা, সেখানেই যাত্রাটি জাহান্নামের পথে। গাড়ি নিয়ে গভীর খাদে পড়তে একবার দুর্ঘটনাই যথেষ্ট। তেমনি জাহান্নামে যেতে বার বার পথ হারাতে হয় না, সে ভয়ানক বিপদটি ঘটে সিরাতাল মুস্তাকীমের কোন এক স্থানে একবার পথ হারালেই। তাই জান্নাতে যেতে সর্বক্ষণ সিরাতাল মুস্তাকীমে থাকতে হয়; প্রতি পদে বাঁচতে হয় বিচ্যুতি থেকে। বহু মানুষ কাফির, মুনাফিক ও জালেম হয় নামাজ রোজায় ভ্রষ্টতার  কারণে নয়, বরং রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভ্রষ্টতার কারণে। আদালতে সিরাতাল মুস্তাকীম হলো শরিয়া পালন; সেখানে শরিয়া পালনের কাজটি না হলে পথ হারাতে হয় এবং জাহান্নামে যেতে হয়। তেমনি নিশ্চিত জাহান্নামের পথ হলো চাঁদাবাজী, দখলবাজী, ঘুষ, সূদ ও সন্ত্রাসের পথ। সিরাতাল মুস্তাকীমে যেতে হলে এগুলি থেকে অবশ্যই বাঁচতে হয়। তাই যারা বাঁচে অনৈসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়াশূণ্য আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে এবং যারা বাঁচে চাঁদাবাজী, দখলবাজী, ঘুষ, সূদ ও সন্ত্রাস নিয়ে -বুঝতে হবে তারা সিরাতাল মুস্তাকীম হারিয়েছে এবং ছুটে চলছে জাহান্নামের দিকে। ভুল পথে যারা দৌড়ায় তাদের দোয়া, তাওবাহ, দান খয়রাত এবং আরাফাতের ক্রন্দন কি জান্নাতে নেয়? দোয়া কবুলের শর্ত হলো, ভুল পথ ছেড়ে জান্নাতের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীম ধরতে হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা সিরাতাল মুস্তাকীমের যাত্রীদের ভুল ক্রটি ও গুনাহ মাফ করে দেন, জাহান্নামের যাত্রীদের নয়।     

ধর্মের কাজ প্রতিক্ষেত্রে মানুষকে সঠিক পথ দেখানো এবং ভুল পথ থেকে বাঁচানো। ইসলাম তাই শুধু ফরজ ও হালাল বিষয়গুলির কথা বলে না, হারাম বিষয়গুলির কথাও বলে। সে কাজটি না হলে মানুষ ভুল পথ আবিষ্কার করে নেয় এবং জাহান্নামের পথ বেছে নেয়। অধিকাংশ ধর্মগুলি মানুষকে উপাসনার পথ দেখালেও রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পথ দেখায় না। অধুনা মানব জাতির নানা ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের সামনে সিরাতাল মুস্তাকীম তথা সঠিক পথটি না থাকা। সেরূপ সিরাতাল মুস্তাকীম যেমন খ্রিষ্টানদের সামনে নাই, তেমনি নাই ইহুদিদের সামনে। এবং নাই বৌদ্ধ ও হিন্দুদের সামনেও। ফলে তারা সঠিক পথ পায়নি। সে শূণ্যতা পূরণে তারা স্বেচ্ছায় বর্ণবাদী, জাতীয়তাবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী হয়েছে। আর এ মতবাদগুলি তাদের ভয়ঙ্কর অপরাধী বানিয়েছে। অধিকৃত দুর্বল দেশগুলিতে এরা অন্য ভাষা, অন্য ধর্ম ও অন্য বর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে নির্মূলে নেমেছে। বাস্তবতা হলো, এ পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে ভয়ানক বিপর্যয়ের কারণটি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ইবাদতের ভিন্ন ভিন্ন ধরণ নয়; বরং রাষ্ট্র নির্মাণে ভ্রান্ত মতবাদ এবং ভয়ঙ্কর ভ্রষ্টতা। সে ভ্রষ্টতার কারণে রাষ্ট্র নির্মাণে মানুষ বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী, জাতীয়তাবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী হয়েছে। অথচ ইসলাম যেহেতু পথ দেখায়, মুসলিমগণ বহু দেশ জয় করলেও কখোনই তারা বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী, জাতীয়তাবাদী, জ ও উপনিবেশবাদী হয়নি। বরং প্রতিটি বিজিত দেশকে তারা আপন দেশ মনে করে সমগ্র সামর্থ্য দিয়ে সে দেশকে গড়েছে। সে দেশগড়ার স্বাক্ষর আজও যেমন স্পেনে দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় ভারতে। অথচ সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী চোর ডাকাতগণ কখনো সে কাজটি করে না। তারা বরং চোর ডাকাতদের ন্যায় লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে নিজ দেশ গড়ে। তারই প্রমাণ, ১৭০০ সালে, বিশ্ব অর্থনীতির শতকরা ২৭ ভাগ জুগানো ভারত; কিন্তু ব্রিটিশদের লুণ্ঠন ও দেশী শিল্পধ্বংসের কারণে ভারতে সে সামর্থ্য কমতে কমতে শতকরা ৩ ভাগ পৌঁছে। (Shashi Tharoor, Inglorious Empire, What the British Did to India; 2016).    

মানব কল্যাণে ইসলামের যে বিশাল অবদান -সেটি মসজিদ মাদ্রাসা বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের কারণে নয়। বরং সেটি ইসলামী রাষ্ট্রের কারণে। ইসলাম এক্ষেত্রে অন্য ধর্মগুলি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্য ধর্মে রাষ্ট্র নির্মাণ বাধ্যতামূলক তথা ফরজ নয়। সেসব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাগণ রাষ্ট্রনির্মাতা ও রাষ্ট্রের পরিচালক ছিলেন না। হযরত মূসা (আ:) যেমন ছিলেন না, তেমনি হযরত ঈসা (আ:)ও ছিলেন না। রাষ্ট্র নির্মাণ করে এবং সে রাষ্ট্র পরিচালনা করে তারা দেখিয়ে যেতে পারেননি কিরূপে রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হয় এবং কিরূপে সে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। হযরত মূসা (আ:)’য়ের ব্যর্থ হওয়ার কারণ তার সঙ্গীদের অসহযোগীতা। একই রূপ অসহযোগীতা পেয়েছেন হযরত ঈসা (আ:)। এক্ষেত্রে ইসলাম এবং নবীজী (সা:)’য়ের সাফল্য অনন্য। ইসলাম শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতের ন্যায় ইবাদতের ক্ষেত্রেই সিরাতাল মুস্তাকীম তথা রোড ম্যাপ পেশ করে না, সিরাতাল মুস্তাকীম পেশ করে রাষ্ট্র নির্মাণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও। ইসলাম এন্যই একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান।

 

ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ কেন অপরিহার্য?

হিংস্র পশুর হামলা, ঝড় বৃষ্টি এবং শীত গ্রীষ্মে নিরাপত্তা পেতে মজবুত গৃহ নির্মাণ করতে হয়। নইলে জীবন যাপনের কাজটি সুখের হয়না। তেমনি শত্রু শক্তির হামলা থেকে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পেতে এবং পূর্ণ দ্বীন পালনের নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ পেতে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হয়। একাজ ফরজ; এবং রয়েছে জিহাদের মর্যাদা। নবীজী (সা:) তাই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছিলেন এবং ১০টি বছর ধরে সে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। এভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও পরিচালনার কাজটি তিনি হাতে কলমে সাহাবাদের শিখিয়ে গেছেন। জীবন যাপনের প্রতিক্ষেত্রে ইসলাম এভাবেই সিরাতাল মুস্তাকীম দেখিয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ইসলাম তাই এক পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মুসলিমগণ তাই সিরাতাল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথ পেয়েছে প্রতি ক্ষেত্রে। এজন্যই মুসলিমগণ রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যধর্মের অনুসারীদের ন্যায় বর্ণবাদী, নির্মূলমুখী ও শোষণকারী হয়নি। কোন দেশ জয় করলে সে দেশের জনগণের ভাগ্যের সাথে নিজেদের ভাগ্যকে একাত্ম করে নিয়েছে; তারা সেখানে শোষক ও অত্যাচারি শাসক রূপে হাজির হয়নি।

রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সেরূপ সিরাতাল মুস্তাকীম না থাকাটি যে কোন ধর্মের ক্ষেত্রে এক বিশাল শূণ্যতা। এমন শূণ্যতা মানব জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়। লক্ষ্যণীয় হলো, খ্রিষ্ট ধর্ম, ইহুদী ধর্ম, হিন্দু ধর্মের ন্যায় অধিকাংশ ধর্মে রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচলনায় কোন সিরাতাল মুস্তাকীম নাই। ফলে রাষ্ট্র নির্মাণে তারা ন্যায় নীতির সীমা অতিক্রম করেছে এবং প্রচণ্ড বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী ও গোত্রবাদী হয়েছে। এমন কি ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী হয়েছে। সে শূণ্যতার কারণে খ্রিষ্ট ধর্ম নিয়ে ইউরোপবাসী যেখানেই গেছে সেখানেই নৃশংস গণহত্যা ও বর্ণবাদী নির্মূলে ইতিহাস গড়েছে। স্পেন থেকে ৭ শত বছরের মুসলিম শাসন নির্মূলের সাথে নির্মূল করেছে মুসলিমদেরও। জেরুজালেম দখলে নেয়ার পর খ্রিষ্টান ক্রসেডারগণ সেখানে গভীর রক্তপাত ঘটিয়েছে। তারা উত্তম আমেরিকা থেকে রেড ইন্ডিয়ানদের, দক্ষিণ আিমেরিকা থেকে ইনকাদের, আস্ট্রেলিযা থেকে এ্যাবঅরিজনদের এবং নিউজিল্যান্ড থেকে মাউরিদের নির্মূল করেছে। অথচ মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে জুলুম, অন্যায়, বর্ণবাদের নির্মূলে এবং ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায়। একই রূপ নৃশংসতা হিন্দুদের। ভারতে এখন যে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের শাসন; তাদের যুদ্ধটি মুসলিম নির্মূলে।

অন্যায়ের নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে ময়দানে নামলে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক -এমন কি সশস্ত্র যুদ্ধ অনিবার্য ও অবিরাম হয়ে উঠে। কারণ, ইসলামের শত্রুগণ নিরস্ত্র নয়। ইসলামের বিরুদ্ধে নীরব ও নিষ্ক্রিয় নয়। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধটি বিরামীহন। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যুদ্ধে প্রয়োজনীয় শক্তি ও সামর্থ্য আসে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক বল, সামরিক বল ও অর্থবল থেকে। নবীজী (সা:) সেরূপ একটি রাষ্ট্র গড়তে পেরেছিলেন বলেই তিনি বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে দ্রুত বিপ্লব আনতে পেরেছিলেন। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে সফল না হলে ইসলামকে প্রতিষ্ঠার কাজে সফল হওয়া যায়না। ইতিহাস তার সাক্ষী। ইসলামকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে হযরত মূসা (আ:) ও হযরত ঈসা (আ:)’র যে ব্যর্থতা -সেটির কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে তাদের ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে তাদের অনুসারীদের উদ্বাস্তুর বেশে দেশে দেশে ঘুরতে হয়েছে। পৌত্তলিক রোমান রাজা কনস্টানটাইনের খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহন করার ফলে খ্রিষ্টানগণ নিরাপত্তা পেলেও স্বৈর শাসকের প্যাগানিজম বা পৌত্তলিকতা থেকে খ্রিষ্ট ধর্ম বাঁচেনি। সেটি বুঝা যায় ভ্যাটিকনসহ গীর্জাগুলিতে মূর্তির ছড়াছড়ি দেখে। অথচ হযরত ঈসা (আ:) এবং তাঁর সত্যিকার অনুসারীদের হাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে রোমান রাজার পৌত্তলিক আগ্রাসন থেকে খ্রিষ্ট ধর্ম নাজাত পেত।  

 

শত্রুশক্তির টার্গেট: নবীজী (সা:)’য়ের ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্র

ইসলামের শত্রুগণ মুসলিম উম্মাহর শক্তির মূল উৎস্যটি জানে। সেটি হলো নবীজী (সা:)’য়ের অনুসৃত কুর’আনী ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্র। মুসলিম উম্মাহর সকল অতীত অর্জনের মূল কারণ এই বিশুদ্ধ ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্র। সে সময় মুসলিমদের কাছে আজকের ন্যায় বিশাল জনশক্তি ছিল না, তাদের হাতে আজকের ন্যায় তেল, গ্যাস, ইত্যাদি সম্পদও ছিল না। ইসলাম এসেছে মহান রাব্বুল আলামীন থেকে এবং ইসলামী রাষ্ট্র হলো ইসলাম তথা মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার হাতিয়ার। মুসলিমগণ যখনই ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদে লিপ্ত হয়, তখনই লাগাতর সাহায্য আসতে শুরু করে মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে। মহান রব’য়ের সে সাহায্যই মুসলিমদের সেদিন বিজয়ী করেছিল। এ জন্যই শত্রুশক্তির হামলাার টার্গেট উভয়ই। তারা যেমন মুসলিমদের নবীজী (সা;)’য়ের ইসলাম থেকে দূরে সরাতে চায়, তেমনি রুখতে চায় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ উভয় ক্ষেত্রেই শত্রু শক্তির সাফল্যটি বিশাল। তারা যেমন বিশুদ্ধ ইসলাম থেকে মুসলিমদের দূরে সরাতে পেরেছে, তেমনি রোধ করতে পেরেছে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। ফলে মুসলিম বিশ্বের কোথাও বেঁচে নাই ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে সে রাষ্ট্রে মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়া আইন, কুর’আনী জ্ঞানদান, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা জিহাদ, প্যান ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব দেখা যেত। এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন নবীজী (সা:) এবং তাঁর সাহাবাগণ। অপর দিকে আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সা:)’য়ের ইসলাম নিয়ে বাঁচলে তাদের মাঝে দেখা যেত ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে জিহাদ এবং সে জিহাদে জান ও মালের কুরবানী -যেমনটি দেখা যেত নবীজী (সা:) এবং তার সাহাবাদের জীবনে।

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রুখতে ইসলামী বিরোধী শক্তির কোয়ালিশনটি দুনিয়া জুড়ে। কোথাও কোন ট্রাইবাল বা ন্যাশনাল স্টেট নির্মিত হলে সেটিকে তারা সাথে সাথে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের সদস্য হতেও সে রাষ্ট্রের কোন বাধা থাকে না। কিন্তু স্বীকৃতি দেয় না কোথাও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হলে। বরং শত্রুশক্তি যুদ্ধ শুরু করে সে রাষ্ট্রকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে। নবীজী (সা:) যুগের রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আধুনিক কাফির শক্তিসমূহের অভিযোগ, তারা কেন সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগেই ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করলো না? সে সময় সে কাজটি করা হলে ইসলাম আজ আর কোন প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া হতো না, তারা ইসলামের বিপদমুক্ত হতো!এ অভিযোগ এনে লন্ডনের অধুনালুপ্ত The Evening Standard পত্রিকায় কিছু কাল আগে একটি উপসম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল।

 

কিভাবে রক্ষা পেয়েছিল ইসলামের বিশুদ্ধতা?

মুসলিমদের গৌরব যুগে ইসলাম তার বিশুদ্ধতা শতভাগ ধরে রাখতে পেরেছিল। সেটি এজন্য যে, মুসলিমগণ সফল হয়েছিল ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিষ্ঠা দিতে এবং সে রাষ্ট্রের প্রথম শাসক ছিলেন খোদ নবীজী (সা:); এবং সেটি দীর্ঘ ১০ বছরের জন্য। নবীজী (সা:)’য়ের পর নিরাপত্তা পেয়েছে খোলাফায়ের রাশেদার হাতে তাদের ৩০ বছর শাসন কালে। এভাবে মুসলিমগণ ৪০টি বছর ধরে পবিত্র কুর’আনের বিশুদ্ধতা নিয়ে বেড়ের উঠার অতি সহায়ক পরিবেশ পেয়েছে। এ দীর্ঘ সময়ে গড়ে উঠেছে শত শত হাফিজে কুর’আন। এ সময়ের মধ্যে কুর’আন বিশুদ্ধ ভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং একই ভাবে সবার মাঝে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নামাজ, রোজা, হজ্জ ও যাকাতের ন্যায় ইবাদতের বিধানগুলি। ফলে শয়তানী শক্তি সুযোগ পায়নি ইসলামকে দূষিত করার। ফলে বিন্দুমাত্র বিনষ্ট হয়নি ইসলাম ও কুর’আনের বিশুদ্ধতা। অথচ হযরত মূসা (আ:) ও হযরত ঈসা (আ:)’য়ের অনুসারীগণ সেরূপ একটি নিরাপদ পরিবেশ একটি দিনের জন্যও পাননি। তারই ফল হলো, তাওরাত ও ইঞ্জিল বেঁচে নাই বিশুদ্ধতা নিয়ে।

মুসলিমগণ কোন অমুসলিম রাজার সাহায্য নিলে সে রাজা মুসলিমদের ঘাড়ে তার নিজ এজেন্ডা চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ পেত -যেমনটি ঘটেছে খ্রিষ্টধর্মের ক্ষেত্রে। চারা গাছ মারা যায় বা তার কাণ্ডটি বেঁকে যায় -যদি গজানোর সাথে সাথে সেটি কারো পায়ের নিচে পড়ে পিষ্ট হয়। তাই কাণ্ডটি মজবুত না হওয়া অবধি প্রতিক্ষণ নিরাপত্তা দেয়াটি জরুরি। সেটি ধর্মের ক্ষেত্রেও। ইসলামের ক্ষেত্রে সে কাজটি করেছে নবীজী (সা:) ও তাঁর খোলাফায়ে রাশেদার সম্মিলিত ৪০ বছরের শাসন। ইসলামের বিশুদ্ধতা রক্ষায় এ সময়কালটি ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাওরাত ও ইঞ্জিল যে তার বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হারিয়ে ফেলবে -সেটি সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালা জানতেন। এবং পবিত্র কুর’আন যে তার পূর্ণ বিশুদ্ধতা নিয়ে বাঁচবে -সেটিও তিনি জানতেন। তাই তিনি পবিত্র কুর’আনকে ক্বিয়ামত অবধি সমগ্র মানব জাতির জন্য তাঁর একমাত্র চুড়ান্ত ধর্মগ্রন্থ তথা রোড ম্যাপ রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। তাওরাত, ইঞ্জিল বা অন্য কোন ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি আসেনি। 

স্বৈরশাসকগণ তাদের দুর্বৃত্তি থেকে কোন কিছুকেই রেহাই দেয়না। এমন কি ধর্মকেও নয়। তাই শেখ হাসিনার স্বৈর শাসনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মূর্তি নির্মাণ ও মূর্তি নিয়ে মিছিল করার সংস্কৃতি। হিন্দুদের পূজাকে বাঙালি মুসলিমের সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টাও সে করেছে। সেটি চালু করতে হাসিনা স্লোগান তুলেছিল, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।” সে উৎসব বলতে পূজার উৎসবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এভাবে প্রশস্ত করেছিল জাহান্নামের পথ। শেখ হাসিনা একবার ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে বলেছিল, “মা দুর্গা গজে (হাতিতে) চড়ে আসলে ফসল ভাল হয়। ফসল এভাব ভাল হবে -কারণ মা দুর্গা গজে চড়ে এসেছে।” এটি তো নিরেট পৌত্তলিকতা। হাসিনা এভাবেই হিন্দু ধর্মের প্রচারকে পরিণত হয়েছিল। মুসলিম নামধারীরাও যে হিন্দুত্ববাদের ধারক ও প্রচারক হতে পারে তার নমুনা ছিল হাসিনা। হিন্দুত্ববাদীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ার বিপদ এখানেই। তখন শুরু হয় হিন্দুত্বের ও মুর্তি নির্মাণের সংস্কৃতি।

তাই শুধু জান মাল ও ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তার জন্য নয়, বিশুদ্ধ ইসলাম নিয়ে বাঁচার জন্যও অতি জরুরি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। মুসলিম জীবনে এটিই হলো শ্রেষ্ঠতম ইবাদত তথা জিহাদ। জিহাদ শুধু মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও তার অখণ্ডতা বাঁচানোর জন্যই অপরিহার্য নয়, অপরিহার্য হলো বিশুদ্ধ ইসলাম নিয়ে বাঁচানোর জন্যও। শত্রুশক্তি যেমন মুসলিম ভূমির উপরই দখল নিতে চায়, তেমনি দখল নিতে চায় মুসলিম উম্মাহর চেতনার ভূমির উপরও। বিশুদ্ধ ইসলাম নিয়ে বাঁচার লড়াইটি হলো মুমিনের বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। পৃথিবী পৃষ্ঠে জিহাদের চেয়ে বড় নেক কর্ম নাই। সত্যিকার মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা এবং সভ্য ও কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণে জিহাদ হলো একমাত্র হাতিয়ার। জিহাদ নিয়ে বাঁচতে ব্যর্থ হলে বাঁচতে হয় রাষ্ট্রীয় অসভ্যতা ও নৃশংসতা নিয়ে। যার নমুনা হলো ফ্যাসিস্ট মুজিব ও ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের বাংলাদেশ। তখন শিক্ষা-সাংস্কৃতিক অঙ্গণে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঞ্জিনীয়ারিং হয় ইসলাম থেকে দূরে সরনোর কাজে। শুধু ঈমানদার রূপে নয়, এমন মানবিক অধিকার রূপে বাস করাও অসম্ভব হয়। তখন নিরপরাধ নাগরিকদের গুম করা, বিনা বিচারে হত্যা করা, আয়ান ঘরের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বন্দী রাখা, বিচারের নামে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসি দেয়া ও রাস্তায় ট্যাংক ও সাঁজোয়ো যান নামিয়ে এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে নিরস্ত্র প্রতিবাদী ছাত্রদের গণ করা তখন রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এরূপ অসভ্য ও নৃশংস বর্বর কাজে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীগুলিকে দেখা গেছে ২০২৪’য়ের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলন থামাতে। অপর দিকে নবীজী (সা:)’য়ের হাতে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হয়েছিল বলেই মানব জাতি পেয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। এবং ইসলাম বেঁচেছে পূর্ণ বিশুদ্ধতা নিয়ে। ৪/১০/২০২৬