সাব্বির হোসাইন: বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অগ্রদূত ও তেজস্বী শাসক বীর ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত স্থান গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর। এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণেই শায়িত আছেন বাংলার সেই বীর সন্তান। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য স্থানটি পরম শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা থাকলেও, প্রচারণার ঘাটতি ও সরকারি আনুকূল্যের অভাবে দৃষ্টিনন্দন এই সমাধিসৌধটি আজও পর্যটকদের নজরকাড়তে ব্যর্থ হচ্ছে।
১ ডিসেম্বর,২০২১ খ্রিস্টাব্দে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে সমাধিটি আধুনিক নকশায় সংস্কার করা হয়। লাল সিরামিক ইটের সমন্বয়ে নির্মিত ১৭.৫ ফুট উঁচু এই সমাধিসৌধ প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যরীতির এক অনন্য নিদর্শন। ২৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের এই সমাধি চত্বরের প্রবেশদ্বারে ঈশা খাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী খোদাই করে দেওয়া হয়েছে। তবে সঠিক প্রচারণার অভাবে এই নান্দনিক উদ্যোগও পর্যটকদের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারছে না।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ঈশা খাঁ গাজীপুরের বক্তারপুর ও কিশোরগঞ্জের এগারসিন্ধুর পাশাপাশি ২২টি পরগনা শাসন করতেন। জীবনের সায়াহ্নে তিনি বক্তারপুরে সামরিক ক্যাম্প গড়ে তোলেন এবং এখানেই অসুস্থ হয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯০৬ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত ঐতিহাসিক এফ বি ব্রাডলি-বার্টের ‘দা রোমান্স অফ অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল’ গ্রন্থেও বক্তারপুরে ঈশা খাঁর সমাধি থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
নিকটবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের মনে এ নিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ী মাসুম সরকারের মতে,
"এই মহান শাসকের স্মৃতি আমাদের অহংকার। অথচ প্রচারের আলো না পাওয়ায় এলাকাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ডানা মেলতে পারছে না। দর্শনার্থীদের আগমন বাড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতো।"
অন্যদিকে স্থানীয় শিক্ষক মোহাম্মদ আলী জানান, রাজধানী ঢাকা ও কালীগঞ্জ সদরের কাছে হওয়া সত্ত্বেও অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা ও আবাসিক সুবিধার অভাবে দর্শনার্থীরা উৎসাহিত হচ্ছেন না। তিনি আরও বলেন,
"পাশে বিস্তৃত বিল বেলাই রয়েছে। এই সমাধিসৌধকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের জন্য থাকার সুব্যবস্থা করা গেলে এটি একটি চমৎকার পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে পারে।"
বক্তারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান ফারুকের মতে, আগামী প্রজন্মের কাছে ঈশা খাঁর বিক্রম ও বীরত্বগাথা পৌঁছে দিতে এই স্থানটির সংরক্ষণ ও পরিচিতি অত্যন্ত জরুরি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, মাজারের সীমানা প্রাচীর ও সৌন্দর্যবর্ধন শেষ হয়েছে; এখন দর্শনার্থী বাড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুপরিকল্পিত প্রচার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বাহ্যিক সংস্কার নয়, বরং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দেশের পর্যটন মানচিত্রে বক্তারপুরকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলেই এই ঐতিহাসিক স্থানটির যথাযথ মর্যাদা রক্ষা ও পর্যটনের প্রসার সম্ভব।