আবুল কালাম আজাদ: বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থেকে শুরু করে নেতৃস্থানীয় সব কর্মকর্তাই নিয়োগ দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। তারা কৃষি ব্যাংকের ধরন ও কৃষি ঋণ বিতরণ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। আবার প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এ কারণে পুরো ব্যাংকেরই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।’
যার কারনে,বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। কেবল গত ছয় অর্থবছরেই রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত এ ব্যাংকটিকে গুনতে হয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা নিট লোকসান। মূলধন ঘাটতি গিয়ে ঠেকেছে ২৯ হাজার ২০৭ কোটি টাকায়। ব্যাংকটির ঋণখেলাপির চিত্রও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের জুন শেষে মোট ঋণের ৪৯ দশমিক ৪৪ শতাংশই খেলাপি, যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বলে ব্যাংকের নথিপত্রে উঠে এসেছে।
আর্থিক এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতির চেয়েও এখন বেশি নাজুক কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা। কেবল গত এক বছরেই বদলি করা হয়েছে ৪ হাজার ৯০৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। এর মধ্যে অনেকে বদলি হয়েছেন একাধিকবার। পদোন্নতি ও বদলিকে ঘিরে ব্যাংকটির অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুসের বিনিময়ে পছন্দের স্থানে বদলি কিংবা পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে তা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। যদিও স্বাধীনভাবে তাদের কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন কমিটির এক সদস্য।
কৃষি ব্যাংকের বেশির ভাগ কর্মকর্তা আগে থেকেই কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের কর্মসূচির পরিবর্তে রাজনৈতিক দলাদলিতে ব্যস্ত। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তা আরো বেড়েছে। আগে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ ও ‘স্বাধীনতা ব্যাংকার্স পরিষদ’-এর মাধ্যমে ব্যাংকটির সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হতো। এক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতেন সিবিএ নেতারা। এখন ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিতে ‘জাতীয়তাবাদী ফোরাম’ ও ‘জিয়া পরিষদ’ নামে দুটি সংগঠন মুখোমুখি অবস্থানে। যদিও শক্তিশালী অবস্থানে জাতীয়তাবাদী ফোরাম। ব্যাংকটির যাবতীয় পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলি নিয়ন্ত্রণ করছেন সংগঠনটির নেতা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. জাহিদ হোসেন। এক্ষেত্রেও সিবিএর বর্তমান নেতারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বদলি বাণিজ্য ও রাজনৈতিক দলাদলির কারণে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা একেবারেই ভেঙে পড়েছে বলে ব্যাংকটির একজন মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থেকে শুরু করে নেতৃস্থানীয় সব কর্মকর্তাই নিয়োগ দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। তারা কৃষি ব্যাংকের ধরন ও কৃষি ঋণ বিতরণ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। আবার প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এ কারণে পুরো ব্যাংকেরই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।’
তবে এসব বিষয়ে বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও কৃষি ব্যাংকের এমডি সঞ্চিয়া বিনতে আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল নম্বরে দুইদিনে একাধিকবার কল করলেও ধরেননি। খুদেবার্তা পাঠালেও কোনো জবাব দেননি।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছরের অক্টোবরে সঞ্চিয়া বিনতে আলীকে কৃষি ব্যাংকের এমডি নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যাংকটির একাধিক মহাব্যবস্থাপকের অবশ্য অভিযোগ, এমডির সঙ্গে তাদেরই দেখা হয় না। কখনই তিনি ফোন ধরেন না।
কৃষি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির আমানত স্থিতি ছিল ৫০ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ স্থিতি ৩৫ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা ছিল। বিতরণকৃত এ ঋণের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা শ্রেণীকৃত বা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্যাংকটি, যা বিতরণকৃত ঋণের ৪৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। যদিও গত বছরের জুন শেষে কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল মাত্র ৪ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ।
মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রভাবেই কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এতটা বেড়ে গিয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ব্যাংকটির একাধিক শাখা ব্যবস্থাপক জানান, আগে শ্রেণীকৃত ঋণের মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে কৃষি ব্যাংক ছয় মাস সময় পেত। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মানতে গিয়ে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো তাদেরও খেলাপি ঋণের মেয়াদ গণনার সময় তিন মাসে নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ কৃষি ব্যাংকের বেশির ভাগ ঋণই প্রান্তিক কৃষকরা নিয় থাকেন। ঋণ নিয়ে কৃষকরা যে শস্য আবাদ করেন, সেটি উঠে আসতে তিন মাসের বেশি সময় লাগে।
এ বিষয়ে একজন শাখা ব্যবস্থাপক নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, ‘আমরা কৃষকদের বোরো আবাদের জন্য ঋণ দিই। বোরোর চারা রোপণ থেকে ধান উঠে আসতে তিন মাসের বেশি সময় লাগে। তাই একজন কৃষক কীভাবে বোরো আবাদের জন্য ঋণ নিয়ে তিন মাসের মধ্যে ফেরত দেবেন? খেলাপির নীতিমালা পরিবর্তনের সময় সেটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এ কারণে কৃষি ব্যাংকের শস্য আবাদের ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’
মেয়াদ গণনায় পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃষি ব্যাংকের পুনঃতফসিল করা শস্য ঋণ খেলাপি করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিনা ডাউনপেমেন্টে শস্য ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়ার নির্দেশনা ছিল। ওই নির্দেশনা মেনে খেলাপি হওয়া শস্য ঋণ পুনঃতফসিল করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল এসে পুনঃতফসিল করা সব ঋণ খেলাপি করে দিয়েছে। ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা না বুঝে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।
দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক হিসাবায়ন হয় ডিসেম্বরভিত্তিক। তবে এক্ষেত্রে অর্থবছরের ভিত্তিতে তথা জুনভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবই এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক হিসাবে ওই অর্থবছরে কৃষি ব্যাংকের নিট লোকসান ছিল ৬ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ব্যাংকটি ১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকার পরিচালন লোকসান দিয়েছে। কর পরিশোধ ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের পর গত অর্থবছরের লোকসান ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৮৫ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ২৮২ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ২৪১ কোটি ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৭৯ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে কৃষি ব্যাংক। সব মিলিয়ে কেবল গত ছয় অর্থবছরেই ব্যাংকটির নিট লোকসানের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকায়। বছরের পর বছর ধরে লোকসান গোনায় কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ২০৭ কোটি টাকায়।
কৃষি ব্যাংকের নাজুক এ পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আইএমএফের চাপের কারণে দেশের সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ গণনার মেয়াদ তিন মাসে নামিয়ে আনা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের তেমন কিছু করার ছিল না। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কৃষি ব্যাংকের জন্য এ নীতিমালায় ছাড় থাকা দরকার। দেশের কৃষক, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে কৃষি ব্যাংককে সবল করতে হবে। ব্যাংকটির যাবতীয় অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ ভূমিকা রাখবে। আর প্রকৃত কৃষক যাতে কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’
দেশের কৃষকদের ঋণ দিতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কৃষি ব্যাংক ভেঙে রাজশাহী অঞ্চলের শাখাগুলোকে নিয়ে ‘রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)’ প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষি ব্যাংকের মতো রাকাবের আর্থিক অবস্থাও এখন বেশ নাজুক। কয়েক বছর ধরে বিশেষায়িত এ দুটি ব্যাংক একীভূত করার আলোচনা চলছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এখনো সে প্রক্রিয়া শুরুই করা যায়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বেসরকারি খাতের পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে কাজ করছে। এটি সফল হলে সরকারি-বেসরকারি অন্য ব্যাংকগুলোর দিকে নজর দেবে। সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ নিলে কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের একীভূকরণ অনেক সহজ হবে।