প্রেস বিজ্ঞপ্তি: “Inspired by History, Innovating the future” — এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের আয়োজনে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (KIB) কমপ্লেক্স, ফার্মগেট-এ অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ‘Al Khwarizmi Science Fest 2025’ আজ এক বর্ণাঢ্য সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।
সমাপনী অধিবেশন ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী ‘আল-খাওয়ারিজমি সায়েন্স ফেস্ট ২০২৫’ সমাপ্ত হয়। আজ ৩০ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আয়োজনে তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ইন্টেল কর্পোরেশনের (Intel) সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ড. মাসুদুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম, সদ্য বিদায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এবং নর্থরোপ গ্রুম্যান (Northrup Grumman) এর ডিজাইন আর্কিটেক্ট আহমেদ এস মজুমদার,। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও বাচিক শিল্পী সাইফুল আরেফিন লেলিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মাসুদুর রহমান বলেন, “বর্তমান বিশ্ব আজ দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে আমাদের তরুণদের শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা হলে চলবে না, বরং উদ্ভাবক হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে হবে। আল-খাওয়ারিজমিরা যেভাবে আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, তোমাদেরও সেই গৌরবময় ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “ইসলাম কখনোই বিজ্ঞানবিমুখ নয়, বরং পবিত্র কুরআনে বারবার মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তোমরা যদি উচ্চতর নৈতিকতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে পারো, তবেই দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে। তোমাদের উদ্ভাবন যেন মানবকল্যাণ ও ইনসাফ কায়েমের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।”
সমাপনী বক্তব্যে সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, স্বর্ণযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের ঐতিহ্য ধারণ করে ছাত্রশিবির একটি দেশপ্রেমিক ও আলোকিত প্রজন্ম গড়তে চায়, যারা বিজ্ঞান চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে আগামীর নেতৃত্ব দেবে। অনুষ্ঠান শেষে গণিত অলিম্পিয়াড, প্রজেক্ট শোকেসিং এবং রুবিক্স কিউব প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
এসময় অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, সাহিত্য সম্পাদক ডা. নাঈদ তাজওয়ার, মানবাধিকার সম্পাদক সিফাত উল আলম, গবেষণা সম্পাদক ফখরুল ইসলাম, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহীসহ কেন্দ্রীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
দুই দিনব্যাপী এই মেলায় মোট ১৮০টি উদ্ভাবনী প্রজেক্ট প্রদর্শিত হয়, যার মধ্যে সিনিয়র গ্রুপে ১২০টি এবং জুনিয়র গ্রুপে ৬০টি প্রজেক্ট ছিল। গণিত অলিম্পিয়াডের ৩টি ক্যাটাগরিতে (জুনিয়র, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি) ১৪০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক ‘ক্যাপচার দ্য ফ্ল্যাগ’ (CTF) প্রতিযোগিতায় ১০০টি গ্রুপে ৪০০ জন এবং রুবিক্স কিউব প্রতিযোগিতায় ৭০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিজয়ীদের মাঝে নগদ অর্থ পুরস্কার, মেডেল, সার্টিফিকেট ও টি-শার্ট, গিফটব্যাগ প্রদান করা হয়,। প্রজেক্ট ডিসপ্লেতে প্রথম স্থান অধিকারী দলকে ৬০,০০০ টাকা এবং পরবর্তী স্থানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৪০, ৩০ ও ২০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় সেশনে বুয়েটের ন্যানো মেটেরিয়াল এন্ড সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফখরুল ইসলাম এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুর রব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন। এ সময় ‘বাংলার ম্যাথ’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ শাহরিয়ার শুভ এবং ‘লার্ন উইথ পাভেল’ এর পরিচালক পাভেল মোহাম্মাদ এক বিশেষ প্যানেল ডিসকাশন পরিচালনা করেন। শিক্ষার্থীদের জন্য মেলা প্রাঙ্গণে ছিল ফিজিক্স, বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, রোবোটিক্স ও কুরআনিক সায়েন্স জোনসহ নানা আকর্ষণীয় আয়োজন।
দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাঈদুল ইসলাম। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল ওয়াটার রকেট উৎক্ষেপণ এবং সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনায় মনোজ্ঞ ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এবারের ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ ‘প্রজেক্ট ডিসপ্লে’ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ৬০,০০০ টাকা নগদ অর্থ ও সম্মাননা জিতেছে টিম ‘ইনক্রিবো’ (প্রজেক্ট: স্মার্ট গ্রোসারি স্টোর)। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে টিম ‘সোলভেন’ (প্রজেক্ট: নিউ সিটি), তৃতীয় স্থান টিম ‘মিসাওয়াশ এক্স’ (প্রজেক্ট: প্রতিরোধ বায়োকিট), চতুর্থ স্থান টিম ‘এ্যাবসলিউট জিরো’ (প্রজেক্ট: মাল্টিপারপাস রিভোট ভার্সন ৮) এবং পঞ্চম স্থান অধিকার করে টিম ‘ঈসাইন’ (প্রজেক্ট: ভার্টিকাল এক্সিস উইন্ড টারবাইন উইথ পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন)।
রুবিক্স কিউব প্রতিযোগিতায় দ্রুততম সময়ে সমাধান করে প্রথম স্থান অধিকার করেন মুনতাজিম বিল্লাহ। এ ইভেন্টে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন যথাক্রমে আব্দুল্লাহ, মুশফিকুল ইসলাম, দ্বীপ সরকার ও ফারহান তানভীর।
গণিত অলিম্পিয়াডের তিনটি ক্যাটাগরিতে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থীকে গোল্ড, সিলভার ও ব্রোঞ্জ মেডেল প্রদান করা হয়। এর মধ্যে জুনিয়র ক্যাটাগরিতে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন শামসুক হক খান স্কুলের ইফাজ আরমান খান, নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলের মাহির মোহাম্মদ শাহরিয়ার, মোহাম্মদপুর প্রিপ্রেটরি স্কুলের রাইয়ান সোহান, গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের ইলহাম চৌধুরী এবং সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের নওশাদ জামান। সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে গোল্ড মেডেল জয় করেন বিডিসি একাডেমির মো. মুহতাদি আহরার, বিএল সরকারি হাইস্কুলের পার্থ মণ্ডল, ঢাকা শিক্ষাবোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল এণ্ড কলেজের জায়েদ মুস্তাকিন, সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সাঈফ মিহনান সাবির এবং ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের ইজতিহাদ মুহাম্মদ ফাহাদ।
হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে গোল্ড মেডেল পান নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী তাশদিক আহমেদ তন্ময়, আল ওয়াহিদ ও রিমন আহসান, ঢাকা কলেজের কাজী রায়হান উদ্দিন এবং ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের জুনাইদ আহমেদ।
গণিত অলিম্পিয়াডের তিনটি ক্যাটাগরির মধ্যে সর্বাধিক নম্বর প্রাপ্তি এবং সার্বিক নৈপুণ্যের ভিত্তিতে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী তাশদিক আহমেদ তন্ময় এই গৌরব অর্জন করেন। অসামান্য মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘শহীদ ওসমান হাদী এওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।