বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন রিয়াদ সফরকে সামনে রেখে ঢাকা–রিয়াদ কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সৌদি আরবের দুটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর এবং সর্বশেষ সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুলকরিম আল-খারেইজির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—দুই দেশ ঐতিহ্যগত শ্রমবাজার ও ধর্মীয় সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফরের প্রস্তুতি নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ–সৌদি সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।
ঢাকা সফরে সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মঙ্গলবার দুই দিনের সরকারি সফরে ঢাকায় পৌঁছান সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুলকরিম আল-খারেইজি। সফরে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ–সৌদি সম্পর্ককে "নতুন উচ্চতায়" নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বহুমাত্রিক, কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়।
অন্যদিকে সৌদি প্রতিনিধি দল আবারও দেশটির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে রিয়াদ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে।
প্রথম সৌদি সফরকে ঘিরে বাড়ছে প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম সৌদি আরব সফর।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বাণিজ্যসহ একাধিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা বা চুক্তি হতে পারে।
গত মাসে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন আবিয়াহ প্রধানমন্ত্রীর হাতে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র তুলে দেন। বর্তমানে দুই দেশের কর্মকর্তারা সফরটি ফলপ্রসূ করতে নিবিড় প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
শ্রমবাজারের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত
সৌদি আরব বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য কেবল জনশক্তি রপ্তানির মধ্যে সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখা নয়।
ঢাকা এখন সৌদি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়—
অবকাঠামো উন্নয়ন
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
লজিস্টিকস
খাদ্য নিরাপত্তা
উৎপাদনশিল্প
ডিজিটাল প্রযুক্তি
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল
এসব খাতে সৌদি বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতায় নতুন গতি আসতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
নিরাপত্তা সহযোগিতায়ও নতুন অধ্যায়
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সৌদি নেতৃত্বাধীন মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সে যোগ দিয়েছে। ১৪টি দেশের এই জোটের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালী, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবাধ নৌচলাচল বজায় রাখা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধু সামুদ্রিক নিরাপত্তা নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় দেশটির ক্রমবর্ধমান ভূমিকারও প্রতিফলন।
ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ
ওয়ালিদ আল-খারেইজির ঢাকা সফরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের উপ-পরিবহনমন্ত্রী রুমাইহ আল-রুমাইহ বাংলাদেশ সফর করেন।
সে সফরে পরিবহন, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য সৌদি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়।
স্বল্প সময়ে পরপর দুটি উচ্চপর্যায়ের সৌদি প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে সৌদি আরব বাংলাদেশকে শুধু শ্রমশক্তির উৎস হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের সুযোগ
মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটের গুরুত্ব বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও নতুন সুযোগ খুঁজছে।
সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০ কর্মসূচির আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও শিল্পখাতে যে ব্যাপক রূপান্তর চলছে, সেখানে বাংলাদেশ পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে রিয়াদ।
সামনে কী?
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফর সফল হলে বাংলাদেশ–সৌদি সম্পর্ক একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
শ্রমবাজার ও ধর্মীয় সম্পর্কের ঐতিহ্য বজায় রেখেই বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংযোগ—এসব খাতে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—ঢাকা ও রিয়াদ আর কেবল পুরোনো সম্পর্ক ধরে রাখতে চায় না; বরং আগামী দশকের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি শক্তিশালী, বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে উভয় দেশই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।