• ঢাকা |

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন : লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও চ্যালেঞ্জসমূহ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৬ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ড. মো. মনছুর আলম: পদ্মা ব্যারেজ  প্রকল্প হলো বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট দূর করা, সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি মেগা প্রকল্প। এটি রাজবাড়ী জেলার পাংশা ও পাবনা সুজানগরের সাতবাড়িয়া অঞ্চলে পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছে।

প্রকল্পটি লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য হলো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর আশপাশের ২৪টি জেলার পানিসংকট নিরসন করা, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ, লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া এবং ধান ও মাছের উৎপাদন বাড়ানো,  দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লোনা পানির প্রবেশ কমানো, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং পানিপ্রবাহ কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন।

পদ্মা ব্যারেজের এই লক্ষ্য ও উদেশ্যকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রথম ধাপের কাজের জন্য প্রায় ৩৪,৬০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে সাত বছরে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

কিন্তু ব্যারাজ জিনিসটা আসলে কী? এর প্রয়োজনীয়তাই বা কেন?

ব্যারেজ হলো পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নদী বা জলাধারের ওপর আড়াআড়িভাবে নির্মিত বিশেষ একটি অবকাঠামো। ড্যাম বা বাঁধের সঙ্গে এর বড় পার্থক্যের জায়গা হলো বাঁধের মাধ্যমে সাধারণত জলাধারের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে পানি ধরে রাখা হয়। অন্যদিকে, ব্যারেজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বন্ধ করার পরিবর্তে সেটির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এক্ষেত্রে মূল অবকাঠামোতে একাধিক দরজা রাখা হয়, যেখান দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়।

 

সাধারণত ব্যারেজ নির্মাণের আগে সেটার উজানে এক বা একাধিক কৃত্রিম খাল খনন করা হয়। এরপর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ওইসব খালে পানি ঢোকানো হয়। সেই পানি পাম্পের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সেচ আকারে দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় ব্যারেজের মাধ্যমে এক নদীর পানি অন্য নদীতে নিয়ে সেটির প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে সেটিই করার পরিকল্পনা রয়েছে।নতবে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যেখানে ব্যারেজ প্রয়োজন, সেখানে যদি এটি নির্মাণ করা যায় এবং ঠিকঠাকমত কাজে লাগানো যায়, তাহলে অনেক ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। আবার এর ব্যত্যয় ঘটলে হিতে বিপরীতও হতে পারে আমরা মনে করি। 

 

তাহলে পদ্মা নদীতে ব্যারেজ কেন?

 

২০২৬ সালে এসে সরকার পদ্মা নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দিলেও বিষয়টি নিয়ে আগে থেকে বিভিন্ন সরকারের সময় আলোচনা হয়েছে।

 

এই ব্যারেজ প্রকল্পটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নীতিগত ধারাবাহিকতা রয়েছে। ১৯৬১ সালে ভারতে ফারাক্কা ব্যারাজের নির্মাণ কাজ শুরু করে। যার প্রেক্ষিতে ১৯৬২-৬৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম জরিপ সম্পন্ন হয়। ২০০৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ২০১৩ সালে প্রকল্পটি গৃহীত হলেও ২০১৫ সালে ভারতের আনুষ্ঠানিক আপত্তির মুখে ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'নকশায় ত্রুটি' দেখিয়ে নাকচ করে দেন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্প মূল্যায়ন সভায় প্রকল্পটি পুনরায় টেবিলে আসে; তবে 'পদ্মা ব্যারাজ' নাম দিয়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একেনেকে পাশ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মূহুর্তে স্থগিত হয়। ১৩ মে'২৬ এসে তারেক রহমানের সরকার এই ঐতিহাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একনেক সভায় অনুমোদন করেন। 

 

বিশেষজ্ঞরা সমীক্ষায় যে বিষয়গুলো উঠে আাসে তাহলো, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে উজানে পানি প্রত্যাহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষি ও মৎস্য খাতে যেমন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে তেমনি নৌ চলাচল ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে।  এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গত নির্বাচনের আগে পদ্মায় ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। ক্ষমতায় এসে মূলত সেটিই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন তিনি। 

 

পদ্মা ব্যারেজে যা থাকছে?

 

প্রায় দুই দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওই ব্যারেজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দু'টি ফিশ পাস রাখা হবে। এর মধ্যে ব্যারেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত যে কাঠামোর মাধ্যমে নদীর অতিরিক্ত পানি বাইরে বের করে দেওয়া হয়, সেটাই হলো স্পিলওয়ে। আর আন্ডার স্লুইস হলো ব্যারেজের পানির প্রবাহ ও পলি ব্যবস্থাপনার জন্য নির্মিত আরেকটি বিশেষ কাঠামো।

 

এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করার আশা করছেন সরকার। সংরক্ষিত ওই পানি বণ্টনের জন্য তিনটি 'অফটেক অবকাঠামো' নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

'অফটেক অবকাঠামো' হলো যে নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়, সেটির পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টনের জন্য যে বিশেষ অবকাঠামো। 

 

একইসঙ্গে, প্রথম ধাপের কর্মকাণ্ডের আওতায় গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ দশমিক ছয় কিলোমিটার এবং হিসনা নদীতে ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং ড্রেজিং কাজ করা হবে।

 

দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

 

কী কাজে লাগবে?

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।

 

এক্ষেত্রে ব্যারাজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ওইসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।

 

এরপর সেই পানি দিয়ে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর অঞ্চলে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ দেওয়া হবে বলে প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

সেটি সম্ভব হলে দেশে আরও প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং সোয়া দুই লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তারা।

 

একইসঙ্গে, নদী তীরবর্তী এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকার পাবে।

 

২০৩৩ সালের পর দ্বিতীয় ধাপে ব্যারেজ ঘিরে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

 

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, নদীগুলোতে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কমবে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা পাবে এবং সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে।

 

এ ছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

সবমিলিয়ে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সরকারের কর্মকর্তারা।

 

চ্যালেঞ্জসমূহ :

 

প্রকল্পটির নাম "পদ্মা ব্যারাজ"  নয়; "গঙ্গা ব্যারাজ" নামকরণ করতে হবে৷ পদ্মা ব্যারাজ রাখা ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে ভুল হবে। এতে গঙ্গা নদীতে ভাটির দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিকার আমরা যেচে ছেড়ে দিচ্ছি; ভারত সেটাই চায়। মূলত পদ্মা গোয়ালন্দে এসে যমুনার সঙ্গে মিলনের আগ পর্যন্ত নদীটি 'গঙ্গা'। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনার মিলনের মাধ্যমে পদ্মা নদীর জন্ম বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।  এছাড়া আরো যে চ্যালেঞ্জ আছে তা হলো —

 

প্রথমত: প্রকল্পটি অনেক ভাটিতে সাতবাড়িয়া-পাংশা নির্মিত হওয়ার কারণে গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজের মূল চ্যালেঞ্জ হবে পলি/ বালি বা ব্যবস্থাপনা। বর্ষায় গঙ্গা বিশ্বের সর্বোচ্চ পলিবহুল নদীগুলোর একটি। আবার শুকনো মৌসুমে কোটি কোটি ঘনমিটার বালি উত্তোলন হয়। বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।  খোদ ফারাক্কা ব্যারাজেরও মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে পলি ব্যবস্থাপনা। ফারাক্কার উজানে গঙ্গায় ব্যাপক ভাঙন রয়েছে। যে কারণে বিহার রাজ্য বলছে, ফারাক্কা তুলে দিতে হবে।

 

দ্বিতীয়ত: ক্রমবর্ধিষ্ণু বদ্বীপ গঠনে ভাটা পড়ে যাবে। এতে বাংলাদেশ জনবসতির ঘনত্ব বৃদ্ধি পাবে। প্রতিবেশগত উৎকর্ষতা বজায় রাখা আরেকটি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। 

 

তৃতীয়ত : গঙ্গা ব্যারাজের মতো স্থাপনা বা প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্ব উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে অবশ্যই পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করতে হবে। ভারত বর্তমানে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়ে গড়িমসি করছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সম্ভব  না হলে প্রয়োজনে বহুপক্ষীয় বা আন্তজার্তিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে।  এছাড়া সার্ক এর মাধ্যমে করা যেতে পারে। ফলস্বরূপ ভবিষ্যতে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ ও পরিচালনা সহজ হবে।

চতুর্থত : বাংলাদেশের নদনদীতে পানি রিজার্ভের জন্য রাবার ড্যাম তৈরি করা হয়েছে। এর সুফলের চেয়ে কুফল বেশি।  বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। 

পঞ্চমত : বাংলাদেশে পদ্মা-গঙ্গার শাখা-প্রশাখা নদীগুলো বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর নাব্যতা ফিরে দিতে হবে। নদীগুলো সচল না হলে অসময়ে বন্যার কবলে পড়বে দেশ। এছাড়া ব্যাপক ফসল হানীসহ ভাঙনের কবলে পড়তে হবে।