‘সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূতে ধরেছে’—গোলাম পরওয়ার
নিজস্ব প্রতিবেদক: জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের উদ্যোগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে বিজয়নগর মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে দলটির কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ‘সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূতে ধরেছে’। তাঁর দাবি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার একের পর এক ‘গণবিরোধী’ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং জনগণের স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান করছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের দামের ওপর। অথচ ক্ষমতা গ্রহণের সাত মাসের মধ্যেই তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হয়নি এবং সংসদে জুলাই সনদ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে করণীয় নির্ধারণের আহ্বান জানান।
‘জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে’
জ্বালানি তেলের নতুন দাম সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সমাবেশে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি অভিযোগ করেন, গভীর রাতে প্রতি লিটার তেলের দাম ২০ টাকা করে বাড়িয়ে সরকার জনগণের ওপর নতুন করে ভোগান্তির বোঝা চাপিয়েছে। তাঁর দাবি, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লেও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।
তিনি অবিলম্বে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের সঙ্গে দেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প ও বাজারব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে। তাঁর অভিযোগ, জনগণের স্বার্থ বিবেচনা না করে দফায় দফায় তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি
সমাবেশে ডাকসুর ভিপি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী সাদিক কায়েমও বক্তব্য দেন। তিনি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের দাবি জানান।
তিনি বলেন, জনগণের ভোগান্তি নিরসনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
‘সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি বড় সমস্যা’
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমীর ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে এবং এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে জনজীবনে।
সরকার মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখালেও দেশের জ্বালানি খাতে সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
সমাবেশ শেষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতাদের নেতৃত্বে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিজয়নগর মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক ক্ষতি ও জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।