এস এম নাসিম: গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ইন্টারনেট ভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এই সময় দফায় দফায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। ফলে বহির্বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৬–১৭ জুলাই রংপুরসহ দেশব্যাপী ছাত্রদের ওপর পুলিশি গুলিবর্ষণ ও হামলার ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে প্রথম দফায় ১৮ জুলাই সারাদেশে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধের মূল নির্দেশনা দিয়েছিল তথ্যমন্ত্রী নিজেই—“ডেটা সেন্টারে আগুন” অজুহাতটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ২৩-২৪ জুলাই ধাপে ধাপে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু শুরু হয়, কিন্তু মোবাইল নেটওয়ার্ক ২৮ জুলাই দুপুরে চালু হয়, যদিও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটাক প্রায় ৩১ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ছিল।
এই সময় সংবাদমাধ্যম অনলাইনে তাজা খবর প্রচার করতে পারছিল না, ফলে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, ই‑কমার্স ও কল সেন্টারগুলো প্রায় তিন দিনের মধ্যে প্রতি দিন কয়েক মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
ইন্টারনেট বন্ধের পরের তিন দিনে সারাদেশে সহিংসতার চিত্র বিরাট আকার ধারণ করে। ১৯ জুলাই একদিনে ৫০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এক সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবে ১৫০, স্বতন্ত্র সূত্রে ২০০ ছাড়িয়ে যায়।
১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে সারাদেশে কারফিউ জারি করে সরকার। সেনা মোতায়েন, “শ্যুট অ্যাট সাইট” নির্দেশ দেয়া হয়। প্রায় ১৭ বছর পর দেশে এ ধরনের কারফিউ জারি হয়। কারফিউয়ের মধ্যে মেট্রোরেল স্টেশনে ভাঙচুর ও আগুনে ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। বিভিন্ন স্থানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়া হয়, সাধারণ মানুষ হতাহত হন।
ওই সময় ৬ বছর বয়সী শিশু রিয়া গোপ ও নারায়ণগঞ্জে সুমাইয়ার নিহতের ঘটনা আলোচনা সমোলজনার জন্ম দেয়। কারফিউ চলাকালে ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম, আসিফ সজীব, সারজিদ আলমসহ বেশ কয়েকজন সমন্বয়ককে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে দেশজুড়ে প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করে সরকার।
১৯ জুলাই রাতে শেখ হাসিনার ক্ষমা,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেতুমন্ত্রীর পদত্যাগ,গুলিতে জড়িতদের বিচার ও ক্ষতিপূরণসহ দশ দফার দাবি জানিয়ে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা। পরবর্তী দাবি সংখ্য়া আট পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়, যা সমন্বয়কদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে।
২৮ জুলাই রাতে পুলিশের হেফাজতে (DB অফিস) একটি ভিডিও বার্তায় নাহিদ ইসলাম সহ নেতারা আন্দোলন প্রত্যাহার ঘোষণা করেন, পরে অভিযোগ ওঠে এটি ডিবি জোরপূর্বক করিয়েছে।
এরপর, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ১৩টি দেশের দূতাবাস সহিংসতা ও গ্রেফতার প্রসঙ্গে উদ্বেগ জানায়। জাতিসংঘ নিজেও হতাহত ও গ্রেফতারের তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানায়। অ্যামনেস্টি আন্তর্জাতিক রাজ্যের আইনবহির্ভূত অস্ত্র ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
জুলাই গণআন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া, কারফিউ ও সহিংসতায় পরিচালিত দমন-পীড়ন—সব মিলে এটি বাংলাদেশের একটি অন্যতম বিদ্রোহী সময় হিসেবে ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে যায়। তথ্যনির্ভরতা বন্ধ, সাধারণ জনগণের ভয় এবং আন্তর্জাতিক চাপ— সব মিলিয়ে অস্থিরতার এই মুহূর্তগুলি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।