• ঢাকা |

ভারতীয় চ্যালেঞ্জ, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের দায় এবং বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৫ জানুয়ারী, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

ভারতের ঘোষিত এজেন্ডা

স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভারতের ষড়যন্ত্রটি প্রতিদিন ও প্রতি মুহুর্তের। একারণে বাঙালি মুসলিমের জীবনে প্রতিদিন একাত্তর। আর একাত্তর বাঙালি মুসলিম জীবনে কখনোই একাকী আসে না। সাথে আনে ভারতীয় ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ, সীমাহীন লুণ্ঠন, মুজিবের বাকশাল, রক্ষিবাহিনী, গণতন্ত্রের কবর, দুর্ভিক্ষ। এবং আনে হাসিনার গুম, খুন, ফাঁসি, ভোটডাকাতি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড. শাপলা চত্বর ও আয়না ঘর। ১৯৭১ থেকে শুরু করে আজ অবধি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি এবং জনগণের জান-মালের বিরুদ্ধে যত নাশকতা হয়েছে তার সাথে ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। ২০২৪‌’য়ে আগস্ট ভারতসেবী হাসিনার পতন হলেও ভারতের ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। বাংলাদেশ জুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে ভারতীয় আগ্রাসনের নতুন পরিকল্পনা। পশ্চিম বঙ্গ বিজিপি’র সংসদীয় নেতা শুভেন্দ্র অধিকারী প্রকাশ্যে বলেছে, “ইসরাইল যেরূপ গাজা ধ্বংস করেছে, বাংলাদেশকেও আমরা তেমনি মাটিতে মিশিয়ে দিব।” বাংলাদেশকে কেন ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজায় পরিণত করতে চায় এবং কেন সেখানে গণহত্যা সংঘটিত করতে চায় -শুভেন্দ্র অধিকারী তার কোন কারণই উল্লেখ করেনি। তবে কারণটি বলা না হলেও সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ ভারতের খাঁচা থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হতে চায় -সেটিই বাংলাদেশের অপরাধ। সেরূপ একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকে রুখতেই ভারত এ এলাকায় আরেক ইসরাইলী দানব হতে চায়। বাংলাদেশের জন্য এটি হলো বিশাল চ্যালেঞ্জ।   

১৯৭১’য়ে ভারত পাকিস্তানকে ভেঙেছিল। এবার বাংলাদেশেরও কোমর ভাঙতে চায়। কারণ, তাদের বিশ্বাস, পাকিস্তানের বীজ বাংলাদেশীদের মাঝেও রয়ে গেছে। তারা জানে, ১৯৪৭’য়ে বাঙালি মুসলিমরাই সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তান। মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকাতেই এবং মুসলিম লীগের মূল দুর্গ ছিল অবিভক্ত বাংলা। তাছাড়া তারা আরো জানে, পাকিস্তান শুধু একটি দেশের নাম নয়, এটি এক প্যান-ইসলামী আদর্শ, স্বপ্ন, ভিশন ও মিশনের নাম -যা যুগে যুগে এবং দেশে দেশে অসংখ্য বিজয় এনেছে। তাই স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ মানে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ। ভারত তাই সে চ্যালেঞ্জকে নির্মূল করতে চায়। ভারতের সকল ভূ-রাজনীতি মূলত সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই।

 

ভারতীয়দের পাকিস্তান ভীতি ও ইসলাম ভীতি

ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের রয়েছে প্রচণ্ড পাকিস্তান ভীতি। তাদের বিশ্বাস, ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙে গেলেও বাঙালি মুসলিমদের মাঝে পাকিস্তানী চেতনা রয়ে গেছে। কারণ, দেশ ভাঙলেও চেতনাকে ভাঙা যায়না। তাদের সে পাকিস্তান ভীতি ও মুসলিম ভীতি প্রবলতর হয়েছে ২০২৪’য়ের আগস্ট বিপ্লবের। কারণ, ভারতসেবী হাসিনা সরকারের উৎখাতে সবচেয়ে সম্মুখ ভাগের ভূমিকাটি রেখেছিল ইসলামপন্থীরাই। তাদের পাকিস্তান ভীতি তীব্রতর হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার” গগণবিদারী এ স্লোগানটি শুনে। এতো কাল যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেক্যুলারিজম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের দুর্গ রূপে পরিচিত ছিল -সেখানে এরূপ স্লোগান উঠবে, সেটি তারা ভাবতেও পারিনি। যাদের চেতনায় শরিষার দানা পরিমাণ ভারত প্রেম ও একাত্তরের সেক্যুলার বয়ান বেঁচে আছে তারা কি এমন স্লোগান মুখে আনতে পারে? 

ভারতের রয়েছে প্রচণ্ড ইসলাম ভীতিও। সে ভীতি আরো বেড়েছে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের জনসমর্থন পাকিস্তানের চেয়েও অধিক দেখে। সে ভীতি প্রচণ্ডতর হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, চটগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় বাংলাদেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের ভূমিধ্বস বিজয়ে দেখে। ভারতীয় সেনা বাহিনীর বিশাল যুদ্ধের ফসল যে বাংলাদেশ, সেখানে ইসলামপন্থীগণ এরূপ বিজয়ী হবে সেটি হিন্দুত্ববাদী ভারত কখনো কল্পনাও পারিনি। প্রয়াত বিজিপি নেতা এবং ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর ন্যায় এখন অনেক ভারতীয় বলতে শুরু করেছে, ভারত এক পাকিস্তানকে ভেঙে দুই পাকিস্তান বানিয়েছে।

 

ভারতের হাতে ধর্ষিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র

ভারতই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল শত্রু। সেটির প্রমাণ ভারত নিজেই। ১৯৭১’য়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলদারির পর থেকে ভারত পরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা হতে দেয়নি। বাংলাদেশকে স্বাধীন ও শক্তিশালী রূপে বেড়ে উঠতেও দেয়নি। বাংলাদেশের কোমর ভাঙার কাজের শুরু একাত্তরে ভারতের বিজয়ের পরই। ভারতীয় বাহিনী লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অব্যবহৃত বহু হাজার কোটি টাকার অস্ত্র, যানবাহন ও ক্যান্টনমেন্টের আসবাবপত্র।  ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান অধিকৃত বিজয়ের পর ভারতের সমর্থন নিয়ে চেপে বসেছে শেখ মুজিবের বাকশালী ফ্যাসিবাদ। পরবর্তীতে আসে জেনারেল এরশাদের সামরিকতন্ত্র এবং ভোটডাকাত হাসিনার গুম, খুন, গণহত্যা, ভোটডাকাতি ও আয়না ঘরের নৃশংসতা। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন স্থান পায় কবরস্থানে। এসবই ঘটেছে ভারতের সমর্থণ ও সহযোগিতা নিয়ে। বরং মুজিব ও হাসিনার গণতন্ত্র হরণ, ভারত তোষণ ও ইসলামপন্থীদের দমনের নীতি ভারত থেকে প্রচুর সাবাশও পেয়েছে।

একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগেই ভারত সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দীন আহমেদকে দিয়ে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। সে চুক্তিতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের কোন প্রতিশ্রিত ছিল না। বরং ছিল ভারতের অধীনত এক গোলাম বাংলাদেশের কথা। সে ৭ দফা চুক্তিতে ছিল, বাংলাদেশে থাকবে না কোন সেনাবাহিনী। থাকবে না কোন স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি। পররাষ্ট্র নীতি পরিচালিত হবে ভারতের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে। ফলে অনুমতি ছিল না স্বাধীন ভাবে কোন দেশের সাথে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের। অনুমতি ছিল সেনাবাহিনীর বদলে রক্ষিবাহিনীর ন্যায় প্যারা মিলিটারি বাহিনী গঠনের। এ জন্যই শেখ মুজিব সেনা বাহিনীর শক্তি না বাড়িয়ে রক্ষিবাহিনীকে শক্তিশালি করেছিল। 

১৯৭১’য়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া আওয়ামী লীগ নেতারা ছিল ভারতের মাটিতে উদ্বাস্তু ও অসহায়। তাদের পায়ের নীচে মাটি ছিল না। তারা নির্ভর করতো ভারতের করুণার উপর। এপ্রিলের শেষ ভাগেই পাক আর্মি পুরা দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।  ফলে তাদের জন্য দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অথচ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতার নেশায় তারা ছিল উম্মাদ। কোন নারী এরূপ আশ্রয়হীন, উদ্বাস্তু ও অসহায় হলে সহজেই বার বার ধর্ষণের শিকার হয়। একই কারণে আওয়ামী লীগ ভারতের হাতে হয়েছে রাজনৈতিক ধর্ষণের শিকার। ভারত যুদ্ধ করে ক্ষমতায় বসাবে এ আশায় ভারতীয় শাসকচক্র যা বলেছে, তাতেই তারা স্বাক্ষর করে দিয়েছে। কথিত আছে, ৭ দফা দাস চুক্তি স্বাক্ষরের পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম নাকি বেহুশ হয়ে পড়ে। ভারতের হাতে এভাবে শুরুতেই ধর্ষিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র। 

 

ভারত যা পেতে চায়

ভারতের সাথে মুজিবের ২৫ সালা চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও তাজুদ্দীনের সাথে স্বাক্ষরিত ৭ দফা চুক্তি বাতিল হয়েছে -তার কোন প্রমাণ নাই। ভারত চায়, বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার বাঁচুক সে ৭ দফা চুক্তির প্রতিটি শর্ত মেনে। ভারত চায়, বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার হাসিনার ন্যায় ভারতকে করিডোর দিবে, সমুদ্র ও নদী বন্দরের সুবিধা দিবে, মুক্ত বাজার দিবে, কেড়ে নিবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুসলিমদের দূরে সরাবে ইসলাম থেকে। বিরোধীদের রাখা হবে কারাগারে অথবা আয়না ঘরে। সে সাথে চায়, বাঙালি মুসলিমের সংস্কৃতি হবে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, মূর্তি নির্মাণ, মূর্তিতে পূজাদান এবং বর্ষবরণ ও বসন্ত বরণের দিনে রাস্তায় আলপনা ও জীবজন্তুর মূর্তি নিয়ে মিছিল। এভাবেই অসম্ভব করতে চায় বাঙালি মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে।

ভারতের দেখানো পথে চললে ভারত সরকার বাংলাদেশের পক্ষে সারা বিশ্ব জুড়ে সুনাম গাইতে রাজী -যেমন সুনাম গেয়েছে ফ্যাসিস্ট মুজিব ও হাসিনার পক্ষে। মুজিবের হাতে গণতন্ত্রের কবর, বাকশালী স্বৈরাচার, দুর্নীতি, ২০ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী খুন এবং হাসিনার গুম, খুন, ভোট ডাকাতি