• ঢাকা |

জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা, ‘নতুন ফ্যাসিবাদ এলে জনগণ আবারও প্রতিরোধ গড়বে’


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৪ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদদের আত্মত্যাগের দলিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আন্দোলনের ইতিহাসকে প্রামাণ্যচিত্রে লিপিবদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত ‘জুলাই জাগরণ ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আন্দোলনের উত্তরাধিকার, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা বক্তব্য উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ইতিহাস সংরক্ষণ কেবল অতীতকে স্মরণ করার বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। দুই বছর আগে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি বলেন, আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে ছাত্রশিবিরের মাসব্যাপী উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং শিশু-কিশোর থেকে তরুণ—সব প্রজন্মের কাছে এ ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।

 

অনুষ্ঠানস্থলে নির্মিত প্রতীকী কবর ও স্মৃতি প্রদর্শনী পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ মানুষকে আন্দোলনের আত্মত্যাগ ও ত্যাগের মূল্য উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে।

 

ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তারাই আগামী দিনে দেশ গঠনের নেতৃত্ব দেবে বলে তিনি আশাবাদী। বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।

 

সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে জনগণ আবারও প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তবে আমরা তা চাই না, কারণ আপনারাও একসময় মজলুম ছিলেন।”

 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি, তথ্য ও দলিল সংগ্রহ করে সেগুলোকে প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। বিচারকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সেরা ডকুফিল্মগুলো নির্বাচন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

 

তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে এবং বিভিন্ন স্থানে সংগঠনের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের নেতাকর্মীরা সংযম বজায় রাখছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিশোধমূলক বক্তব্যও দেন, যা অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

 

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কোনো স্বৈরাচার বা দমনমূলক শাসন দীর্ঘদিন মেনে নেয় না। জুলাই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

 

তিনি আরও বলেন, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা এবং ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা আন্দোলনের স্মৃতিকে নতুনভাবে ধারণ করতে সহায়ক হয়েছে। আহত ও শহীদ পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি সরকারকে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান।

 

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়েছেন। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ভয়-ভীতি ও দমন-পীড়নের মধ্যেও নেতাকর্মীরা কর্মসূচি চালিয়ে গিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। আন্দোলনের ইতিহাস ধরে রাখতে সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

 

অনুষ্ঠানে ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। প্রথম স্থান অর্জন করে ‘গ্রামের চোখে জুলাই’, নির্মাতা মাহমুদ এইচ এম (নোয়াখালী)। তিনি পান ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদ। দ্বিতীয় হয় ‘জুলাইয়ের ছিটেফোঁটা’ (গাজীপুর মহানগর), পুরস্কার ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তৃতীয় স্থান অর্জন করে ‘দ্রোহের জুলাই’ (নরসিংদী জেলা শাখা), পুরস্কার ১ লাখ টাকা। চতুর্থ হয় ‘বুলেটের বৃষ্টি পেরিয়ে’ (ঢাকা মহানগর পূর্ব), পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা এবং পঞ্চম স্থান পায় ‘The Silent Echo’, যার জন্য দেওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা।

 

অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিভিত্তিক এ আয়োজনে বক্তাদের বক্তব্যে একদিকে যেমন জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়েও নানা মন্তব্য উঠে এসেছে। ফলে সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি রাজনৈতিক বার্তা বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চেও পরিণত হয়।