রামেকে ৫ দিনে ৩ মৃত্যু, ভর্তি ১৩০
প্রতিদিন গড়ে ২৬ জন নতুন রোগী
শামীম রহমান, রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। সাধারণ উপসর্গের বাইরে এবার রোগীদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম ও জটিল হৃদরোগ মায়োকার্ডাইটিসের মতো মারাত্মক জটিলতা। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোনো কোনো রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়ে মৃত্যু ঘটছে।
গত পাঁচ দিনে (১৯ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর) রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে। আর একজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুজনিত জটিলতায় হৃদযন্ত্রের স্পন্দন বন্ধ হয়ে।
একই সময়ে নতুন করে ১৩০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০৭ জন। সর্বশেষ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ ও রোগীদের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছানো। অনেক রোগী জ্বরের শুরুতে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে সময় পার করছেন। হাসপাতালে আসার সময় তাদের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ছে। ফলে ডেঙ্গুর মারাত্মক জটিলতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু: রামেক হাসপাতালের নথিপত্র অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে মারা যাওয়া তিনজনই প্রান্তিক জনপদের বাসিন্দা।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার মো. আনোয়ার মণ্ডল (৫২) ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ২১ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও মাত্র আট ঘণ্টার মধ্যে ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
একই জটিলতায় প্রাণ হারায় রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ১৬ বছর বয়সী কিশোরী সাথী রাণী। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২০ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মারা যায় সে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাথী রাণীর ক্ষেত্রেও রোগটি দ্রুত ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে রূপ নেয়।
সবশেষ ২২ সেপ্টেম্বর সকালে মারা যান চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোলাডাঙ্গার কৃষক আব্দুল করিম (৪৫)। তিনি ১৬ সেপ্টেম্বর রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ক্ষেত্রে ‘সন্দেহভাজন ডেঙ্গু মায়োকার্ডাইটিস’ ধরা পড়ে।
এর ফলে হৃদযন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন দেখা দেয় এবং আকস্মিক কার্ডিয়াক ডেথে তার মৃত্যু হয়।
পাঁচ দিনে ভর্তি ১৩০: রামেক হাসপাতালে গত পাঁচ দিনের ভর্তি ও ছাড়পত্রের পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গু রোগীর চাপের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
১৯ সেপ্টেম্বর নতুন করে ২০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। এদিন ১২ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় এবং একজনের মৃত্যু হয়।
২০ সেপ্টেম্বর নতুন ভর্তি হন ৩১ জন। ছাড়পত্র পান ১৮ জন এবং মারা যান একজন।
২১ সেপ্টেম্বর নতুন করে ২৬ জন ভর্তি হন। এদিন ২৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ওই দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১০৪ জন।
২২ সেপ্টেম্বর নতুন ভর্তি হন ২৯ জন। ছাড়পত্র পান ২৫ জন এবং একজনের মৃত্যু হয়। এদিন চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ছিল ১০৭ জন।
২৩ সেপ্টেম্বর নতুন করে ২৪ জন রোগী ভর্তি হন। বিপরীতে ২৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সর্বশেষ এদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১০৬ জন।
হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ দিনে প্রতিদিন গড়ে ২৬ জন ডেঙ্গু রোগী নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা: রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামিম আহমেদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিপরীতে ২৫ জন রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। আব্দুল করিমের মৃত্যুর পর বর্তমানে হাসপাতালে মোট ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চিকিৎসকদের মতে, জ্বরকে অবহেলা করা কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগী গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন। ফলে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম কিংবা মায়োকার্ডাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দিলে তাদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী এনএস-১ (NS1) পরীক্ষা করানোর পাশাপাশি রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখতে হবে।
বিশেষ করে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে সময় নষ্ট না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।