• ঢাকা |

অপরাধী মুজিব ও আওয়ামী লীগের নাশকতার রাজনীতি


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

আওয়ামী লীগের নাশকতার রাজনীতি শুধু ১৯৭১'য়ের রক্তাক্ত যুদ্ধ ও পাকিস্তান ভাঙার  মধ্যে সীমিত নয়। 
৭৪ এর দুর্ভিক্ষ হলো স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। এটি মুজিবের আরেক বড় নাশকতা।তবে সেই ট্র্যাজিক অধ্যায়টিকে আজ প্রায় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পাঠ্যবই থেকেও রাখা হয়েছে বহুদূরে।

দুর্ভিক্ষে যখন দেশের মানুষ কচু-ঘেঁচু আর ডাস্টবিনের আবর্জনা খাচ্ছিল, লক্ষ লক্ষ মানুষ মরছিলো তখন তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার সংসদে ও আন্তর্জাতিক মহলে দাবি করেছিল, প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে মাত্র ২৬ থেকে ২৭ হাজার মানুষ মৃত্যু বরণ করেছিল! 

অথচ নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation' এ স্পষ্ট লিখেছেন— ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে খাদ্যের কোনো বাস্তব অভাব ছিল না। দুর্ভিক্ষটি ছিল সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও মানবসৃষ্ট, যা সরকারের চরম অব্যবস্থাপনা, কালোবাজারি ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ব্যাপক চাল চোরাচালানের কারণে ঘটেছিল। 

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মহিউদ্দিন আলমগীরের ক্লাসিক গ্রন্থ 'Famine in South Asia' এবং বিভিন্ন স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, অনাহার ও এর পরবর্তী মহামারী-রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ (১.৫ মিলিয়ন)! 

দুর্ভিক্ষের চরম মুহূর্তে শেখ মুজিবুর রহমান যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান, তখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের অনাহারের নির্মম চিত্র নিয়ে তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করে।  ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'Bangladesh: A Legacy of Blood'-এ উল্লেখ করেছেন যে, দেশের ভেতরের প্রকৃত সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৎকালীন সরকার প্রায়শই 'সাময়িক সংকট' বা 'বিরোধী দলের অপপ্রচার ও গুজব' বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। 

শাসকগোষ্ঠীর এই চরম সত্য অস্বীকারের নীতিকে বিখ্যাত লেখক নিয়ামত ইমাম তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাস 'The Black Coat'-এ ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে সত্য গোপন করে মাত্র ছাব্বিশ হাজার মৃত্যুর বানোয়াট গল্প প্রচার করে এক ডিস্টোপিয়ান শাসন কায়েম করা হয়েছিল।

শেখ মুজিব বিদেশি মিডিয়া গুলোতে দাম্ভিকতা আর তাচ্ছিল্যের সাথে বলেন, "আমরা খাবার দিয়েছি বলেই মাত্র কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে!" এতগুলো জীবনকে তার কাছে জীবনই মনে হয়নি, কারণ তার কাছে ক্ষমতা ছিলো।

দুর্ভিক্ষের চরম পর্যায়ে যখন কুড়িগ্রামের চিলমারীর 'বাসন্তী' এক টুকরো কাপড়ের অভাবে জাল গায়ে দিয়ে লজ্জানিবারণ করছিল, ঠিক সেই সময় মুজিবের  পরিবারে চলছিল রাজকীয় উৎসব। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে গণভবনে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ের উপঢৌকনে সোনা-গহনার পাহাড় আর রাজকীয় আতিথেয়তা দুর্ভিক্ষে সর্বস্ব হারানো মানুষের ক্ষোভকে তীব্রভাবে উস্কে দেয়।

এর ঠিক আগেই ১৯৭৩ সালের শেষদিকে ঢাকার একটি ব্যাংকে শেখ কামাল ডাকাতি করতে যান। দু'পক্ষের লড়াইয়ের এক পর্যায়ে শেখ কামাল গুলিবিদ্ধ হন। শেখ মুজিব সেসময় কামালের উপর ক্ষোভ ঝাড়লেও শেখ হাসিনা তার শাসনামলে এসে পুরো ঘটনাই অস্বীকার করেন।  তৎকালীন পত্রিকাগুলো একে 'ব্যাংক লুটের চেষ্টা' হিসেবে ছাপে। 
যদিও সরকার পরবর্তীতে এটাকে 'ডাকাত ধরার ভুল অভিযান' দাবি করে। তবে সাধারণ মানুষ সরকারের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে। এবং তাদের মনে এই ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত করে যে, সাধারণ মানুষ যখন ক্ষুধার জ্বালায় জ্বলছে, তখন রাজপরিবার ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া। 

ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার আর জাসদসহ বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদ যখন তীব্র হতে শুরু করে, তখন সরকার পৈশাচিক দমনপীড়ন নীতি বেছে নেয়।

রক্ষীবাহিনী গঠন করে হাজার হাজার বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক কর্মীকে গুম ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের ঢাকা থেকে জোরপূর্বক অমানবিক ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

অবশেষে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে মাত্র ১১ মিনিটে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও সরকারি মদদপুষ্ট চারটি বাদে বাকি সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে একদলীয় স্বৈর্তান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা 'বাকশাল'  কায়েম করা হয়। 

 ড. নাওমি হোসেইন তাঁর গবেষণায় লিখেছেন— "জনগণ যদি ক্ষুধার্ত থাকে, তবে ক্ষমতায় থাকার দিন ফুরিয়ে আসে"। যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। সেনাবাহিনীর গ্রেফতার অভিযানের সময় শেখ কামালের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে বন্ধুক যুদ্ধ শুরু হয়। এবং এর এক পর্যায়ে  শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হয়।  তখন দেশের কোনো সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ করেনি। 
 দীর্ঘদিনের দুর্ভিক্ষে স্বজন হারানো, বাকশালের শৃঙ্খল আর রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনে পিষ্ট জনতা এই পতনকে  স্বস্তি ও মুক্তির আনন্দ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এ কারণেই সেদিন রাজপথ ছিল শান্ত, আর শহরজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের হিড়িক পড়েছিল। 

ইতিহাসের সত্যকে কখনো চেপে রাখা যায় না। আজ হোক বা কাল,অন্ধকার ভেদ করে সত্য বেরিয়ে আসবেই। লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যকেও জানার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি জানাতে পারেন আপনার মতামত। 

-Md Hadiuzzaman
তথ্যসূত্রঃ- 
The Bangladesh Famine of 1974 - Wikipedia
 Poverty and Famines - Amartya Sen, 
Bangladesh: A Legacy of Blood - Anthony Mascarenhas