মো. মুখলেছুর রহমান: বাংলাদেশে গ্যাস সংকট যেন একটি নিয়মিত বাস্তবতা। মাঝেমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক সংযোগে গ্যাসের চাপ কমে যায়, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহে সংকট সৃষ্টি হয় এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। বর্তমান সংকটও তার ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। কিন্তু এটিকে কেবল একটি কারিগরি ত্রুটি, দুর্ঘটনা বা সাময়িক সরবরাহ বিঘ্ন হিসেবে দেখলে সমস্যার কারণ নিরূপণ করা যাবেনা, সংকটের নিরসনও হবে না। বাস্তবে এই সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং ক্রমবর্ধমান আমদানি-নির্ভরতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে বলে বিজ্ঞজন মনে করেন।
স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস। তুলনামূলকভাবে কম মূল্যের এই জ্বালানি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার শিল্প, তৈরি পোশাক, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, সিএনজি খাত এবং গৃহস্থালির জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ছিল এই সস্তা দেশীয় গ্যাস।
কিন্তু কালের বিবর্তনে পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। একদিকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি শ্লথ হয়েছে অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নগরায়নের কারণে গ্যাসের চাহিদা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।ফলে দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সৃষ্ট ব্যবধান পূরণ করতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে।
এলএনজি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য নানা ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে থাকে। কারণ এলএনজির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বৈশ্বিক সংঘাত, যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ডলারের বিনিময় হার, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা কিংবা বড় উৎপাদক দেশগুলোর নীতিগত পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে এর মূল্য প্রায়শই উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। ফলে একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তখন অনেকাংশেই তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ মাত্র দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটের (FSRU) মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই দুটি স্থাপনার যেকোনো একটিতে কারিগরি ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড, ঘূর্ণিঝড়, উচ্চ সমুদ্রের ঢেউ বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত বন্ধের ঘটনা ঘটলেই সারাদেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়ে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্ভোগে পড়ে। একটি মাত্র অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে গোটা অর্থনীতি যদি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয়না, বিদ্যমান সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা নাজুক।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এবং এটিই বাস্তবতা যে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং সীমিত সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতাই বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, জ্বালানি নিরাপত্তার মৌলিক নীতি হলো কোনো একটি উৎস, প্রযুক্তি বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনও সেই অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি।
একইভাবে বাজার কাঠামোর বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় গ্যাস আমদানি, পাইকারি বিপণন এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার হাতে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনায় অংশগ্রহণ রয়েছে বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের। এই অংশীদারিত্ব আধুনিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক হলেও এর সঙ্গে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প সক্ষমতা নিশ্চিত না হলে সামগ্রিক ব্যবস্থাটিই অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু গ্যাস কেনার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি নির্ভর করে সরবরাহের ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা, বিকল্প ব্যবস্থা, কৌশলগত মজুত এবং সংকট মোকাবেলায় যথাযথ প্রস্তুতির ওপর। উন্নত অনেক দেশ জরুরি ও আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এলএনজি আমদানির উৎস নির্বাচনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট—উভয় পদ্ধতিতে এলএনজি সংগ্রহ করা হয়। কোন উৎস থেকে আমদানি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, কোন চুক্তির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অধিক সুবিধাজনক, পরিবহন ব্যয় কত, সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য—এসব বিষয়ে নিয়মিত স্বাধীন অর্থনৈতিক মূল্যায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আর্থিক প্রভাব বহু বছর ধরে দেশের অর্থনীতির ওপর বিদ্যমান থাকে।
জ্বালানি খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত দিক হলো দেশীয় অনুসন্ধান। বহু বছর ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান প্রত্যাশিত মাত্রায় পরিচালিত হয়নি। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রাঞ্চলেও অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব। যা বর্তমান সরকার পরিকল্পনা করছে বলে সংবাদ মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। এ কথা খুবই স্পষ্ট, দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত না করে শুধু আমদানিনির্ভর নীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হতে পারে না।
অন্যদিকে ভবিষ্যতের জ্বালানি কৌশলকে কেবল গ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, জলবিদ্যুৎ আমদানি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের সমন্বিত ব্যবহার ধীরে ধীরে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ এখন “এনার্জি মিক্স” বা বহুমাত্রিক জ্বালানি উৎসের কৌশল গ্রহণ করছে। বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগোতে হবে।
জ্বালানি খাতে সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আমদানি চুক্তি, মূল্য নির্ধারণ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং অপারেশনাল ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জ্বালানি খাতের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে।
আজকের গ্যাস সংকট আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আর তা হলো, শুধু সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার প্রকৃত সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং বহুমাত্রিক বিনিয়োগ। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, একাধিক আমদানি উৎস নিশ্চিত করা, সরবরাহ অবকাঠামোর বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, কৌশলগত গ্যাস মজুত গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ—এসবকে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি কৌশলের অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিষয় নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, খাদ্য উৎপাদন, রপ্তানি, মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই আজকের সংকটকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশের উচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি, স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও বহুমাত্রিক জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা। কারণ টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও ভবিষ্যৎ-উপযোগী জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়।
মো. মুখলেছুর রহমান
অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক।
ইন্টারন্যাশনাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, পেট্রো এশিয়া গ্লোবাল, দুবাই।