ফিরোজ মাহবুব কামাল
বাংলাদেশে ভারতের এজেন্ডা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের মূল স্ট্রাটেজিক লক্ষ্য হলো, ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে ইসলামের দুর্গ হতে না দেয়া। কারণ বাংলাদেশ ইসলামের দুর্গ হলে ভারতের ২২ কোটি মুসলিম আত্মবিশ্বাস ও নৈতিক বল পাবে -বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলা ও আসামের মুসলিম জনগণ। উল্লেখ্য যে, পশ্চিম বাংলার শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ এবং আসামের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ জনগণ মুসলিম। তাই ভারতের স্ট্র্যাটেজি শুধু ভারতের অভ্যন্তরে বসবাসকারী মুসলিমদের দুর্বল করা নয়, বরং প্রতিবেশি দেশগুলিতে মুসলিমদের দুর্বল রাখাও। সেরূপ একটি লক্ষ্য নিয়ে ভারত পাকিস্তানের বিনাশে ১৯৪৭ সাল থেকেই লাগাতর লেগেছিল। সে লক্ষ্য অর্জনেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৭১’য়ে ভারত যুদ্ধ করেছিল। এখন সেরূপ একটি অভিন্ন যুদ্ধ বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধেও। কারণ, যেখানেই মুসলিম আছে, সেখানেই শয়তানের পৌত্তলিক খলিফাদের যুদ্ধ আছে। মুসলিমদের অবস্থান যেখানেই হোক -তাদের তারা শত্রু মনে করে। তাই ভারতের এজেন্ডা শুধু ভারতীয় মুসলিমদের দুর্বল রাখা নয়, বরং পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুসলিমদেরও দুর্বল রাখা।
ভারত চায়, বাংলাদেশে এমন এক তাঁবেদার সরকারের প্রতিষ্ঠা -যারা সুরক্ষা দিবে ভারতীয় স্বার্থের। তবে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারী নিয়ে ভারত খুশি নয়। বরং চায়, বাংলাদশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ঘিরে ভারতের যে ৭টি রাজ্য রয়েছে সেখানেও ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারীতে বাংলাদেশ সর্বপ্রকার সহায়তা দিক। বাংলাদেশের চেয়েও বৃহত্তর এ এলাকাটি হলো ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের জন্য সবচেয়ে দুর্বল স্থান। কারণ, এ বিশাল এলাকায় হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ঠ; সংখ্যাগুরু হলো খৃষ্টানগণ। ভারতের ভয়, এ এলাকাটি আরেক কাশ্মীরে পরিণত হতে পারে। এজন্যই ভারত চায়, সে এরূপ একটি পরিস্থিতি রুখতে বাংলাদেশ ভারতকে সহযোগীতা করুক। উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিতে স্বাধীনতার যুদ্ধ চলছে বহু কাল ধরেই। ভারত নিশ্চয়তা চায়, বাংলাদেশ যেন কখনোই স্বাধীনতাকামীদের সহয়তা না দেয়। অথচ ভারত এক্ষেত্রে তার নিজের ইতিহাসটি ভুলে যায়। প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্যকরাই ভারতের বিদেশ নীতি। তাই অতীতে তারা পাকিস্তানে বাঙালি, শ্রীলংকায় তামিল এবং বাংলাদেশে চাকমা বিচ্ছিন্নতাবাদী যেমন সাহায্য দিয়েছে, তেমনি আজ পাকিস্তানের বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্য দিচ্ছে। অথচ ভারত সে ভারতীয় নীতির প্রয়োগ বাংলাদেশে দেখতে চায়না। এখানেই তাদের double standard তথা দ্বৈত নীতি।
উত্তর পূর্ব সীমান্তের ৭ রাজ্যে সৈন্য, রশদ ও পণ্য জোগানোর কাজটি দ্রুততর ও নিরাপদ করতেই ভারত হাসিনার আমলে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধাও নিয়েছে। এরূপ করিডোরের সুযোগ আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোন সরকারই ভারতকে দেয়নি। শেখ হাসিনা আমলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া আসামের বিচ্ছন্নবাদী নেতা অনুপ চেটিয়ার মতো স্বাধীনতাকামী নেতাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এমন ভারতসেবী কর্ম হাসিনার পূর্বে অন্য কোন সামরিক ও বেসমারিক সরকার করেনি। ফলে ভারতের সামনে আওয়ামী লীগের বিকল্প নাই ভারত সেটি বুঝে। সেটি বুঝা যায় শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের অন্ধ সমর্থন দেখে। এজন্যই ভোটডাকাতি করলেও হাসিনাকে ভারত সমর্থন দিয়েছে। এখন হাসিনা নাই; ভারত পূর্বের সে একই সুবিধাগুলি নিতে চায় বিএনপি সরকার থেকে।
আওয়ামী লীগ ভারতের অতি পরিক্ষিত বন্ধু -সেটি একাত্তরের বহু পূর্ব থেকেই । ভারতের পাকিস্তান ভাঙার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শেখ মুজিব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত হয়েছিল। ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ায় শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়। বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারতো। এ ষড়যন্ত্র যে সত্য ছিল -সেটি সে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত আওয়ামী লীগ নেতা ও ডিপুটি স্পীকার লে. কর্নেল শওকত আলী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছে। বাংলাদেশের আর কোন রাজনৈতিক নেতা কি মুজিবের ন্যায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতের চর রূপে কখনো কাজ করতে রাজী হয়েছে? এটি একমাত্র মুজিবের লিগ্যাসি। ভারত সেটি ভুলে যায় কি করে? আওয়ামী লীগের রাজনীতি বুঝতে হলে ভারতের সাথে মুজিবের এ সম্পর্ককে অবশ্যই বুঝতে হবে। সেটি বুঝলে এ বিষয়টি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভারত তার সর্বসামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করবে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে। সেটি সম্ভব না হলে বিএনপিকে আওয়ামী লীগ বানিয়ে ফেলবে। এটিই হলো বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতীয় নীতি। ভারত কখনোই তার সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখেনি। অনেক ডিম বিএনপিতে যেমন রেখেছে, তেমনি রেখেছে বামপন্থী ও আলেমদের দলেও।
ভারত কেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শত্রু?
যে কোন কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের ন্যায় ভারতের শাসকচক্রও জানতো, শেখ হাসিনার সামর্থ্য নাই সুষ্ঠ কোন নির্বাচনে জেতার। হাসিনার সে দুর্বলতাকে ভারত লুফে নেয় তার কাঁধে শক্ত ভাবে চেপে বসার মোক্ষম মওকা রূপে। যে দলের জনপ্রিয়তা থাকে, সে দলের রাজনীতিতে দেশপ্রেম এবং শক্ত মেরুদন্ড থাকে। ফলে স্বাধীন বিদেশ নীতিও থাকে। অপর দিকে জনপ্রিয়তাহীন যে দলটি ভোটচুরি বা ভোটডাকাতি করে ক্ষমতায় আসে, সে দলকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিদেশী শক্তির উপর নির্ভরশীল হয়। দেশে বন্ধু না থাকায় বাধ্য হয়ে বিদেশে বন্ধু খুঁজতে হয়। আর বন্ধুত্ব কখনোই বিনা মূল্যে জুটেনা, সে জন্য বিশাল মূল্য দিতে হয়। তখন বন্ধুর বহু নাজায়েজ আবদারকেও পূরণ করতে হয়। অগণতান্ত্রিক সরকারগুলি এ কারণেই দেশের জন্য ভয়ানক ক্ষতি ডেকে আনে। অনেক সময় পরাধীনতাও ডেকে আনে। বাংলাদেশের জন্য সে বিপদটিই ঘটিয়েছে শেখ হাসিনা। হাসিনার আগে ঘটিয়েছে তার পিতা শেখ মুজিব। একই অবস্থা ছিল স্বৈরাচারী এরশাদের। এজন্যই দেশের স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে গণতন্ত্র বাঁচাতে হয়। এবং নির্মূল করতে অগণতান্ত্রিক স্বৈর সরকারকে। তখন সরকারের উপর জনগণের তদারকি বাড়ে। কিন্তু ভারত সে কাজটি হতে দিতে রাজী নয়। ভারত চায়, গণতন্ত্রের স্থান কবরে হোক এবং স্বৈরাচারী সরকার শাসন করুক ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা নিয়ে। ভারতের সে নীতি দেখা গেছে মুজিব, এরশাদ ও হাসিনার আমলে। এখন আশংকা, জনপ্রিয়তা হারানোর সাথে সাথে বিএনপি যেমন স্বৈরাচারী হতে পারে, তেমনি ভারত নির্ভরও হতে পারে।
শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ভারত নির্ভরতা প্রকটতর হয় ২০১৪‘য়ের একদলীয় নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচনের পর। তখন বিদেশে ভোটডাকাত হাসিনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ভারতীয় দূতাবাসগুলি প্রচুর কাজ করেছে। পাশ্চাত্য জুড়ে তখন প্রবল ইসলামভীতির ঝড় এবং চলছিল war on terror’য়ের নামে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বাংলাদেশে ইসলাপন্থীদের দমনের কাজে হাসিনার বিকল্প নাই -এ তত্ত্ব ভারত পাশ্চাত্য দেশের সরকারগুলিকে বুঝিয়েছে। সে প্রচার কাজ দেয়। সে প্রচারের ফলে পাশ্চাত্য দেশগুলির গণতন্ত্রপ্রেম তখন কর্পুরের মত হাওয়ায় হারিয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য দেশগুলির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনৈতিক লুটপাটের বাধামুক্ত সুযোগ। গণতান্ত্রিক সরকার সে স্বাধীনতা না দিলে সেটিকে হটিয়ে সদা অনুগত স্বৈরশাসক নিয়ে আসে। সেটির প্রমাণ, ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শরিফ মোসাদ্দেককে সরিয়ে ইরানের রাজা রূপে মহাম্মদ রেজা শাহক গদিতে বসায়।
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এমন কাজ শুধু ইরানে নয়, আরো বহু দেশে তারা ঘটিয়েছে। ২০১৩ সালে তারা মিশরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইখওয়ানুল মুসলিমিনের ড.মহম্মদ মুরসিকে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে সরিয়ে জেনারেল আব্দাল ফাতাহ সিসিকে ক্ষমতায় এনেছে। মুরসিকে সরাতে সহযোগিতা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও জর্দানের মত স্বৈরাচার কবলিত দেশগুলি। মুরসির অপসারণে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি শাসকদের প্রচণ্ড লাভ হয়েছে। আরব বসন্তের নামে গণতন্ত্রের যে জোয়ার শুরু হয়েছিল -সেটি থেমে গেছে। এতে ইসরাইলেরও বিশাল লাভ হয়েছে। গাজায় যখন গণহত্যায় চলেছে তখন জেনারেল সিসি মিশরবাসীকে প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে দেয়নি, গাজাবাসীর জন্য কোন ত্রাণ পৌঁছতে দেয়নি এবং চিকিৎসার জন্য গুরুতর আহত গাজাবাসীতে মিশরে ঢুকতে দেয়নি।
ভারতীয় সমর্থন ভোটডাকাত হাসিনা বিনামূল্যে পায়নি। বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং সমুদ্র বন্দরের সুবিধা, ভারতীয় আদানী কোম্পানীর জন্য বিশাল অংকের বাণিজ্যিক সুবিধা, ভারতীয় পণ্যের জন্য দেশের বাজার খুলে দেয়া -এরূপ বহু সুবিধাই ভারতকে দিয়েছে। সে সাথে গুম খুন ও ফাঁসির মধ্য দিয়ে কোমর ভেঙেছে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের। অথচ কোন জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক সরকারই সে সুবিধাগুলি ভারতকে দিত না। অতীতে কোন নির্বাচিত সরকারই সেটি দেয়নি। ভারতকে বেশি বেশি দেয়া নিয়েই ছিল হাসিনার গর্ব -যেমন দাসী খুশি হয় প্রভুকে সেবা দিয়ে। হাসিনা তাই গর্ব ভরে বলেছে, “ভারতে যা দিয়েছি -ভারত তা কখনোই ভূলতে পারবে না।” বাস্তবতা হলো, প্রভু যা চায় -তা দেয়া ছাড়া চাকর বাকরের সামনে অন্য পথ খোলা থাকেনা।
গণতন্ত্র কিরূপে কবরে গেল এবং বাকশাল কিরূপে প্রতিষ্ঠা পেল?
ভারতীয়রা জানে, গণতন্ত্র ফিরলে ভারতপন্থী সেক্যুলারিস্টদের পরাজয় অনিবার্য -যেমনটি ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৬ অবধি অবিভক্ত বাংলায় অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে দেখা গেছে। ভারত তাই চেয়েছে, গণতন্ত্র কবরে যাক। গণতন্ত্র ভীতি শুধু ভারতের ছিল না, সে ভীতি ছিল খোদ মুজিবের। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে নির্বাচিত হবে হিন্দুত্ববাদ বিরোধী ইসলামপন্থীরা -এমন কি তারা যারা ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙার বিরোধীতা করেছিল। সে আশংকার কথা খোদ শেখ মুজিব বলেছিল ক্ষমতায় থাকা কালে আওয়ামী লীগের আরেক শীর্ষ নেতা চাঁদপুরের মিজানুর রহমান চৌধুরীকে -যা জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী তার বই “রাজনীতির তিন কাল”য়ে লিখেছেন। মুজিব তাঁকে বলেছিল, “দেশের অবস্থা যে পর্যায়ে গেছে তাতে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। ২৫ থেকে ৩০টির বেশি আসন আমরা পাবো না। তখন জামাত অন্যান্য স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সাথে জোট বেঁধে আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে কচুকাটা করবে।” সে ইসলামভীতি ও গণতন্ত্রভীতি নিয়েই মুজিব গণতন্ত্রকে কবরে পাঠায় এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে একদলীয় রাজনীতির জন্ম দেয়। মুজিব এভাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা দেয় গণতন্ত্রের ঘাতক রূপে। মুজিবের সে নীতি অনুসরণ করে হাসিনাও। হাসিনা দিনের ভোট রাতে ডাকাতি করে নির্বাচন পদ্ধতিকেই ধ্বংস করে দেয়। নিরপক্ষ নির্বাচন পদ্ধতির মৃত্যু হওয়ায় কবরে গেছে গণতন্ত্র।
গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানো যায়। শক্তির বলে রাজনৈতিক দলগুলিকেও নিষিদ্ধ করা যায়। কিন্তু মানুষের ঈমানকে হত্যা করা যায়না। ঈমানদারদের ঈমানী তাড়না কখনোই বন্দুকের গুলিতে ও ষড়যন্ত্রে মারা যায়না, বরং তাতে ঈমান আরো প্রবলতর হয়। এরই প্রমাণ, বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের তাড়না শুধু বেঁচেই নাই, বরং প্রবলতর হয়েছে। ফলে আজ বাংলাদেশের রাজপথে ইসলামপন্থীদের যে শক্তি -তা মুজিবের আমলে ছিল না। এমনকি পাকিস্তান আমলেও ছিল না। ভারতের এখানেই ভয়। সে ভয় নিয়েই ভারত চায়, ইসলামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে। সে লক্ষ্য পূরণে ভারত চায়, বাংলাদেশকে গাজা ও কাশ্মীরের ন্যায় উম্মুক্ত জেলখানায় পরিণত করতে। মুজিবের আমলে ভারত ইসলামপন্থীদের ফাঁসীতে চড়ানো বা শাপলা চত্বরের গণহত্যার কথা ভাবেনি। আবরার ফাহাদদের ন্যায় দেশপ্রেমিকদের পিটিয়ে হত্যার কথাও ভাবেনি। ইলিয়াস আলীর মত শত শত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম-খুন করার কথাও ভাবেনি। কিন্তু হাসিনার আমলে সেগুলিই করা হয়েছে অহরহ এবং অতি নৃশংসতার সাথে। গুম-খুনের যে নৃশংস বর্বরতা ভারত কাশ্মীরে চালু রেখেছে, অবিকল সেটি বাংলাদেশেও চালু রাখতে চায়। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বিজিপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দ্র অধিকারী এক ধাপ এগিয়ে বলেছে, “ইসরাইল গাজায় যা কিছু করেছে, ভারত সেরূপ করবে বাংলাদেশে।” শুভেন্দ্র অধিকারী আরো বলেছে, “বাংলাদেশ দখলে নিতে কয়েক ঘন্টার বেশি লাগবে না।”
শেখ হাসিনা নিজেকে প্রমাণিত করেছে ভারতীয়দের চেয়েও অধিক ভারতীয় রূপে। বিজিপি নেত্রী নুপুর শর্মা যখন নবীজী (সা:)’য়ের বিরুদ্ধে কটুক্তি করে, তখন কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বিশাল বিশাল প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার সেরূপ প্রতিবাদ মিছিল বাংলাদেশে হতে দেয়নি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে মিছিল করলে ভারতে কাউকে জেলে যেতে হয়না। কাউকে পুলিশের গুলিতে মারা যেতে হয়না। কিন্তু বাংলাদেশে গুলি খেয়ে মারা যেতে হয় বা জেলে যেতে হয়। সেটির প্রমাণ, নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর কালে রাস্তায় প্রতিবাদ করায় বহু নিরপরাধ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং অনেককে জেলে যেতে হয়েছে। শেখ হাসিনা তাই কোন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিল না, বরং ছিল বাংলাদেশ নামক কারাগারের কারাপ্রধান। ভারত সেরূপ একটি পরিস্থিতি এখনো চায়।
চুক্তিবদ্ধ ভারতের অধীনতা
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া থেকেই পাকিস্তান ছিল ভারতের প্রধান প্রতিপক্ষ। ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের অভিলাষ ছিল অখণ্ড ভারত নির্মাণ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বুকে প্রধান শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ। সে পথে মূল বাধা ছিল পাকিস্তান। তাই শুরু থেকেই ভারতের স্ট্র্যাটেজি ছিল পাকিস্তানকে খণ্ডিত করা। ভারতের সে স্বপ্ন ২৩ বছর অপূর্ণ থাকে; এবং সে স্বপ্ন পূরণের মোক্ষম সুযোগটি পায় ১৯৭১’য়ে। দীর্ঘকাল সামরিক স্বৈরশাসনের পাকিস্তানে গণতন্ত্র চর্চা দারুন ভাবে ব্যাহত হয় এবং দেখা দেয় প্রকট রাজনৈতিক সংকট। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের পর সে সংকট দূর হয়নি; বরং জটিলতর হয়েছে। এর মূল কারণ, শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভূট্টোর ন্যায় ক্ষমতালোভী সেক্যুলারিস্ট নেতাদের স্বপ্ন পূরণের দ্বন্দ। শেখ মুজিবের দল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জাতীয় সংসদের একটি আসনও পায়নি; অপরদিকে ভূট্টোর দলও পায়নি পূর্ব পাকিস্তান থেকে কোন আসন। এভাবে রাজনৈতিক ভাবে দেশ বিভক্ত হয়ে যায়। এরূপ অবস্থায় পাকিস্তানের উভয় প্রদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল কোয়ালিশন সরকারের। অথচ মুজিব সেরূপ কোয়ালিশ সরকার গঠনে রাজী হয়নি। ফলে রাজনৈতিক সংকট কাটেনি। বরং দেশ দ্রুত বিভক্তির দিকে ধাবিত হয়। মুজিব মনে প্রাণে সেটিই চাচ্ছিল। সেরূপ একটি লক্ষ্য অর্জনে মুজিব ষাটের দশকেই ভারতীয় গোয়েন্দাদের আগরতলা ষড়যন্ত্রে জড়িত হয়েছিল। তখন থেকেই মুজিব কাজ করেছে ভারতীয় চর রূপে। নিজের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণে ভারত এ রাজনৈতিক বিবাদকে ষোল আনা কাজে লাগিয়েছে। সংকটের আরো কারণ, মুজিব ও ভূট্টো -এ দু’জনই ছিল ইসলাম থেকে দূরে সেক্যুলারিস্ট এবং ক্ষমতালোভী। বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিম উম্মাহর বেড়ে উঠা, মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে তাদের আদৌ কোন ভাবনা ও আগ্রহ ছিল না। তাদের মাঝে কোন ইসলাম প্রেম বা পাকিস্তান প্রেম ছিল না। তাদের রাজনীতিতে একটিই প্রেম ছিল, সেটি ছিল ক্ষমতার প্রতি।
১৯৭১’য়ের যুদ্ধে ভারতের লক্ষ্য কখনোই বাংলাদেশেকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া ছিল না। মূল লক্ষ্যটি ছিল উপমহাদেশের মুসলিমদের মেরুদণ্ড ভাঙা। সে জন্যই তারা পাকিস্তান ভেঙেছে। এবং নিশ্চিত করতে চেয়েছে বিচ্ছিন্ন পূর্ব বাংলার জন্য চুক্তিবদ্ধ পরাধীনতা। সে চুক্তিবদ্ধ পরাধীনতার প্রমাণ, তাজুদ্দীনের সাথে ভারতের ৭ দফা এবং মুজিবের সাথে ১২ দফার ২৫ সালা চুক্তি। ভারত চেয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের পক্ষ থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের অধিকার। ভারতের ভয়, বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হলে তাতে পাল্টে যেতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি। কারণ, সে পরিবর্তনে জড়িত হতে পারে পশ্চিম বাংলা ও আসামের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠি। সে ভয় নিয়েই ভারত ইসলামপন্থীদের নির্মূল চায়। ভারত সে নির্মূলের কাজটি শুরু করেছে আওয়ামী লীগের কাঁধে বন্দুক রেখে। সে পরিকল্পনার অংশ রূপেই ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে ইসলামপন্থী নেতাকর্মীদের এবং কারাবন্দী করা হয়েছে বহুশত আলেমকে। ২০০৬ সালে পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে ইসলামীপন্থীদের হ্ত্যা, ২০০৯ সালে পিল খানায় ৫৭ জন সেনা অফিসার হত্যা, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে গণহত্যা এবং বেছে বেছে গুম, খুন ও অপহরণের কাণ্ডগুলি ঘটে মূলত একই লক্ষ্যে। একই পরিকল্পনার অংশ রূপে নির্বাচনে নিবন্ধন দেয়া হয়নি ইসলামপন্থী দলগুলিকে। ইসলামপন্থী দলগুলিকে সংবিধান বিরোধী বলা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের সেক্যুলার সংবিধান ইসলামের পক্ষে অবস্থান নেয়ার বৈধতা দেয়না। অবশ্য পার্শ্ববর্তী ভারতে চিত্রটি ভিন্ন। ভারতে সেক্যুলারিজমের কথা বললেও সে দেশে উগ্র হিন্দুত্ববাদের পক্ষে অবস্থান নেয়াটি সংবিধান বিরোধী নয়। বরং ভারতে এখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়।
মুজিবের ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার রাজনীতি
পাকিস্তান আমলে মুজিব কাজ করেছে ভারতের বিশ্বস্ত চর রূপে। আগরতলা ষড়যন্ত্র হলো তার প্রমাণ। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কাজ করেছে ভারতের খলিফা রূপে। কারণ, সেটি ছিল ভারতের প্রতি মুজিবের ঋণ পরিশোধের দায়বদ্ধতা। মুজিব জানতো, পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় মুজিবকে বসানোর পুরা কাজটিই করে দিয়েছে ভারতীয় সেনা বাহিনী। এবং মুজিব জানতো, মুক্তি বাহিনী একটি জেলা বা মহকুমা দূরে থাক একটি থানাকেও স্বাধীন করতে পারিনি। ক্ষমতায় বসে মুজিব দিল্লির অনুগত খলিফা রূপে কাজ করেছে ভারতের সে অবদানকে সামনে রেখেই। সেটির প্রমাণ, মুজিব তার অফিসে টেবিলের উপর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ফটো রাখতো। ক্ষমতায় থাকা কালে মুজিবের কাজ ছিল, ভারতের এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া।
ভারতের পক্ষ থেকে মুজিবের কাঁধে চাপানো প্রধান দায়টি ছিল, বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের উত্থানকে প্রতিহত করা। সেটি নিশ্চিত করতে ভারত ১৯৭২’য়ে এমন একটি সংবিধান চাপিয়ে দেয়ে -যা ইসলামের পক্ষে অবস্থান নেয়াকে সাংবিধানিক ভাবে অবৈধ করে। এবং সেটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের স্তম্ভ রূপে ঘোষণা দিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষতার লেবাস পড়ে মুজিব যুদ্ধ করেছে ইসলামের বিরুদ্ধে। সে যুদ্ধের অংশ রূপে মুজিব সকল ইসলামপন্থী দলকে নিষিদ্ধ করেছিল। জেলে তুলেছিল সেসব ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী দলগুলির নেতাকর্মীদের। সে অভিন্ন যুদ্ধটি তীব্রতা পায় হাসিনার রাজনীতিতে। হাসিনার সে যুদ্ধটি গণহত্যার যুদ্ধে রূপ নেয়। সেটি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে এবং ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনে।
ভারতের জিহাদ ভীতি
ভারতের শাসক মহলে রয়েছে প্রচণ্ড জিহাদ ভীতি। কারণ, ভারত জানে জিহাদ একবার কোথাও শুরু হলে সেটি থামানো যায় না। কাশ্মীরে ৬ লাখের বেশি সৈন্য মোতায়েন করেও জিহাদ থামাতে পারছে না। ভারত চায়, বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ প্রতিহত করার দায়টি বাংলাদেশ সরকার নিজ দায়িত্বে নিক। ভারতের ভয়. বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হলে তা নিশ্চিত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীততে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করবে এবং অভূতপূর্ব জাগরণ আনবে ভারতের ২২ কোটি মুসলিমদের মাঝে। এবং সে জাগরণ ভারতের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে। দাবি উঠতে পারে ভারত ভূমিতে আরেক মুসলিম ভূমির। ভারতের আশংকা, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সম্ভাবনাটি নানা ভাষা, নানা বর্ণে ও শিয়া-সুন্নিতে বিভক্ত পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশেই অধিক। পাকিস্তানে রয়েছে সেক্যুলারিস্ট সেনাবাহিনীর নৃশংস দখলদারি। ইসলামের উত্থান রুখতে এ সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর। অপর দিকে বাঙালি মুসলিমদের রাজনীতির অতীত ইতিহাসটি গৌরবজনক। এই বাঙালি মুসলিমগণই ১৯৪৭’য়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি পাল্টে দিয়েছিল -সেটি মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও পাকিস্তানের জন্ম দেয়ার মধ্য দিয়ে। মুসলিম লীগ এরূপ জনসমর্থন দক্ষিণ এশিয়ার আরো কোন ভারতীয় প্রদেশে পায়নি। তাছাড়া বাংলাদেশের জনগণের রয়েছে স্বৈরাচারী শাসক নির্মূলের সফল ইতিহাস। তারা ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে মুজিব, এরশাদ ও হাসিনার ন্যায় নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকদের।
ভারতের বর্তমান স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য হলো, বাঙালি মুসলিমদের এমন সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত রাখা -যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি পাল্টে দিতে পারে। সেজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের এতো বিনিয়োগ। একারণেই বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও ভূ-রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে। বাংলাদেশে ইসলাম ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী বাকশালীদের যে যুদ্ধ, সে যুদ্ধের মূল মালিকানাটি এজন্যই ভারতের। ফলে ভারত থেকেই তা পরিচালিত। এযুদ্ধে ভারতীয় RAW’য়ের হাজার হাজার এজেন্ট কাজ করছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে -সেটি দেশটির রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষা সংস্কৃতির অঙ্গণে। এবং সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ প্রতিরোধের মূল যুদ্ধটি মূলত ভারতীয়দের। ভারত সেটি বুঝে। তাছাড়া পৃথিবীপৃষ্ঠের এ বিশেষ অংশে শয়তানের সর্ববৃহৎ পৌত্তলিক জনগোষ্ঠির বসবাস হলো ভারতে। এবং ভারতের পক্ষে প্রক্সি রূপে লড়েছে বাঙালি জাতীয়তবাদী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীরা। তাদের অবস্থান শুধু দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষা সংস্কৃতিতে নয়, বরং দেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, গুপ্তচর সংস্থা এবং মিডিয়াতে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে ভারত ও তার প্রক্সিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি শুধু রাজনীতিতে সীমিত রাখলে চলবে না; বরং লড়তে হবে সর্বক্ষেত্রে। বাঙালি মুসলিমদের এ যুদ্ধকে পবিত্র জিহাদের পরিণত করতে হবে। ২২/০৯/২০২৬