শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা ও রপ্তানি সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা
এমএম রহমাতুল্লাহ: বাংলাদেশের প্যাকেজিং ও অ্যাক্সেসরিজ শিল্পের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান এবং সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে জাতীয় সংসদে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি।
রোববার দুপুরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএএমইএ) নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ আশ্বাস দেন।
প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে দেশের অর্থনীতিতে প্যাকেজিং ও অ্যাক্সেসরিজ শিল্পের অবদান, এ খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, তৈরি পোশাকসহ দেশের বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে প্যাকেজিং ও অ্যাক্সেসরিজ খাতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধি ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি জানান, বিরোধীদলীয় নেতা শিল্পসংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের সমস্যা সমাধানে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার যে ভূমিকা রয়েছে, তার অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বিপিএএমইএর প্রেসিডেন্ট মো. শাহরিয়ার বলেন, বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। সংগঠনের বোর্ড সদস্য ও অন্যান্য প্রতিনিধিরাও তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের সেক্টরের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছি। একই সঙ্গে এ খাতের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছি। বিরোধীদলীয় নেতা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আমাদের কথা শুনেছেন এবং সমস্যাগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কথা বলা ও জাতীয় সংসদে বিষয়গুলো তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছেন।”
বিপিএএমইএ প্রেসিডেন্ট বলেন, প্যাকেজিং খাত শুধু তৈরি পোশাকশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টেরিটাওয়েল, ওষুধ, চামড়া এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে এ খাত সরাসরি সম্পৃক্ত।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে শুধু পেপার প্যাকেজিংয়ের বাজারের আকার প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো খুবই সামান্য। প্যাকেজিং, অ্যাক্সেসরিজ এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
শাহরিয়ার বলেন, এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন। বিরোধীদলীয় নেতা এ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি লিখিত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অ্যাসোসিয়েশন নেতাদের অনুরোধ করেছেন। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সংসদসহ সংশ্লিষ্ট জায়গায় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
বিপিএএমইএর পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতাকে তাদের আয়োজিত আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ারে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আগামী ৬ থেকে ৯ জানুয়ারি রাজধানীর বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে এ মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিশ্বমানের প্যাকেজিং ও অ্যাক্সেসরিজ কারখানা পরিদর্শনের জন্যও ডা. শফিকুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সময়-সুযোগ অনুযায়ী এসব কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বৈঠকে শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। উদ্যোক্তারা জানান, জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শাহরিয়ার বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো ছয় মাস পূর্ণ হয়নি। সরকারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে চান। বিরোধী দলও সরকারকে সহযোগিতা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্রিফিংয়ে দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি মিরপুরের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হামলা, গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকলে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কোনো খাতই নিরাপদ থাকবে না। এ কারণে সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, মব সৃষ্টি, পেশিশক্তির ব্যবহার ও সহিংসতার মাধ্যমে পুরোনো পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার যেকোনো অপচেষ্টা জনগণ প্রতিহত করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাতেও তিনি নিন্দা জানান। তার মতে, দেশের পরিবর্তনের সঙ্গে জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন; তাদের ওপর হামলা বা অপমানজনক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিপিএএমইএ প্রেসিডেন্ট মো. শাহরিয়ার বলেন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও রাহাজানির মতো ঘটনা ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু ব্যবসা নিয়ে থাকতে চাই, দেশের অর্থনীতি নিয়ে থাকতে চাই, কর্মসংস্থান নিয়ে থাকতে চাই। রাজনীতির যে ব্যাপার আছে, রাজনীতিবিদ যাঁরা আছেন, তাঁদেরই রাজনীতিটা করা উচিত।”
বৈঠকে বিপিএএমইএর প্রেসিডেন্টসহ সংগঠনের সাবেক প্রেসিডেন্ট, উপদেষ্টা, ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও বৈঠকে অংশ নেন।
প্যাকেজিং ও অ্যাক্সেসরিজ শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, টেরিটাওয়েলসহ বহুমুখী রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে এই শিল্পের বিকাশ সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়াতে প্যাকেজিং ও অ্যাক্সেসরিজ শিল্পকে আরও সক্ষম করে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।