• ঢাকা |

ডাকসুর উদ্যোগে চাকরিদাতারাই এলেন চাকরিপ্রার্থীর দ্বারে


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

সিনো-বাংলা ডে’তে ৩০-৪০ চীনা প্রতিষ্ঠানে ৪৩০টির বেশি চাকরির সুযোগ

এমএম রহমাতুল্লাহ: চাকরি খুঁজতে গিয়ে দিনের পর দিন এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে ছুটে বেড়ানো—বাংলাদেশের তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের কাছে এটি যেন চিরচেনা বাস্তবতা। হাতে সিভি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের দরজায় দরজায় ঘোরার বদলে এবার সেই চিত্রই যেন বদলে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছে চাকরিদাতারাই এসে হাজির হলেন। এক ছাদের নিচে সরাসরি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার, সিভি জমা দেওয়ার এবং চাকরির সুযোগ সম্পর্কে জানার সুযোগ পেলেন শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী ব্যতিক্রমী এই আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ‘সিনো-বাংলা ডে ২০২৬’ নামের এ আয়োজনে অংশ নেয় চীনের ৩০ থেকে ৪০টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল ৪৩০টির বেশি চাকরির সুযোগ।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এ আয়োজন। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নন, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। দিনভর টিএসসি প্রাঙ্গণে ছিল চাকরিপ্রার্থীদের ব্যস্ততা। কেউ সিভি জমা দিয়েছেন, কেউ নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন, আবার কেউ জেনে নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পদের যোগ্যতা, কাজের ধরন ও নিয়োগপ্রক্রিয়া। অনেকের জন্য এ আয়োজন ছিল সরাসরি চাকরির সম্ভাবনার দুয়ার, আবার কারও জন্য ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ।

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, উৎপাদন, বিপণন ও বহুজাতিক বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে চাকরির সুযোগ ছিল। আগ্রহী প্রার্থীরা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে সরাসরি এবং অনলাইনে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন। জমা দেওয়া সিভির ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী বাছাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়।

গাজীপুর থেকে মেলায় আসা স্মৃতি ইসলাম বলেন, তিনি গাজীপুরে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানে সহকারী হিসাবরক্ষক পদে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন। তাঁর মতো অনেক চাকরিপ্রার্থীর কাছেই দিনটি ছিল প্রত্যাশার। অন্যদিকে, কেউ কেউ চাকরি না পেলেও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় ধারণা নিয়ে ফিরেছেন।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক সৌরভ বলেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে ভাষা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের ধরন ও সুযোগ সম্পর্কে জানতে আগ্রহ থেকেই তিনি মেলায় এসেছেন। এখান থেকে চাকরি না হলেও পাওয়া অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে ‘সিনো-বাংলা ডে’ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। এর আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট। সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ চায়নিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশে ওভারসিজ চায়নিজ অ্যাসোসিয়েশন এবং আপন ফ্রেন্ডশিপ এক্সচেঞ্জ সেন্টার।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইয়ান হুয়ি বলেন, এ আয়োজন বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকার ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার জায়গা থেকে ডাকসু তার দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে এ জব ফেয়ারের আয়োজন করেছে।

সম্প্রতি ডাকসু নেতাদের চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই সফরে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, চীনের বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র সংসদ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ‘পিপল-টু-পিপল কানেক্ট’ কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হয়েছে। চীন থেকে ফেরার পর চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে জব ফেয়ারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদকের প্রচেষ্টায় আয়োজনটি বাস্তব রূপ পেয়েছে বলেও জানান তিনি।

সিনো-বাংলা ডে শুধু চাকরির মেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মেলা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও সিএমসির যৌথ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘সিনো-বাংলা ফ্রেন্ডশিপ’ স্কলারশিপ ও বার্সারি অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।

একই অনুষ্ঠানে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিস লিমিটেডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি ‘হুয়াওয়ে এআই ট্রেনিং প্রোগ্রাম’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ২০২৬ সালের চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ অর্জনকারীদের জন্য আয়োজন করা হয় প্রাক-যাত্রা দিকনির্দেশনামূলক ওরিয়েন্টেশনও।

আয়োজকদের মতে, বর্তমান চাকরির বাজারে শুধু সনদ নয়, দক্ষতা ও বাস্তব কর্মঅভিজ্ঞতাই তরুণদের এগিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি। সে বিবেচনায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা এ আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হলে চাকরির বাজার সম্পর্কে তরুণদের বাস্তব ধারণা তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন তরুণদের খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে এ ধরনের আয়োজন একদিকে যেমন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সময় ও শ্রম বাঁচায়, অন্যদিকে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও দক্ষ জনবল খোঁজার পথ সহজ করে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সিনো-বাংলা ডে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দুই দেশের তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। দক্ষ শিক্ষার্থীদের সরাসরি করপোরেট খাতের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের চাকরিমেলা একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।

অনুষ্ঠানে ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হায়দার, কার্যনির্বাহী সদস্য রাইসুল ইসলাম, ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দ, চীনের বিভিন্ন কোম্পানির উদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

ডাকসুর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এ ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে টিএসসির এই আয়োজন শুধু একটি দিনের চাকরির মেলা হিসেবে নয়, বরং তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের নতুন উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে।