• ঢাকা |

অটোরিকশাকে দোষ দিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হবে না মনে করেন অন্যচিত্র ফাউন্ডেশনের নির্বাহী রেবেকা 


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

রায়হান আহমেদ, ময়মনসিংহ ব্যুরো: বাংলাদেশে বিদ্যুতের সংকট দেখা দিলেই তার জন্য কোনো একটি দৃশ্যমান খাতকে দায়ী করার প্রবণতা নতুন নয়। কখনো শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, কখনো সেচ, কখনো শিল্পকারখানা—আর এবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও ইজিবাইক। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, এসব যানবাহন বিশেষত রাতের বেলায় চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণও হচ্ছে, মধ্যরাতের পর যে পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়ার কথা, তা আগের মতো কমছে না। এ পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার। তবে একই সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দেশে কতটি ব্যাটারিচালিত যান আছে, এগুলো প্রতিদিন মোট কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, কোথায় এবং কোন সময়ে চার্জ হয়, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য কি আমাদের হাতে আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কোথাও বলা হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ, কোথাও আবার প্রায় ৬০ লাখ। বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনুমানেও বড় ব্যবধান আছে। কোনো একটি খাতকে জাতীয় বিদ্যুৎ–সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাই সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত বাস্তব তথ্য সংগ্রহ। কতগুলো গাড়ি বৈধভাবে চার্জ হয়, কতগুলো অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে, চার্জিংয়ের সময়ভিত্তিক লোড কত এবং কোন অঞ্চলে এই চাপ বেশি—এসব না জেনে শুধু সামগ্রিক অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে তা নীতিনির্ধারণকে সহজ করার বদলে আরও বিভ্রান্ত করতে পারে।

এই আলোচনায় বিদ্যুতের একক নিয়েও কিছু বিভ্রান্তি দেখা যায়। মেগাওয়াট কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে বিদ্যুতের ক্ষমতা বা লোড নির্দেশ করে, আর মেগাওয়াট-ঘণ্টা নির্দেশ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ। ফলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব করতে হলে শুধু গাড়ির সংখ্যা বা ব্যাটারির ধারণক্ষমতা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি গাড়ি প্রতিদিন কত দূর চলে, ব্যাটারি কতটা ডিসচার্জ হয়, ব্যাটারির বয়স কত, চার্জারের দক্ষতা কেমন এবং চার্জিংয়ে কত ক্ষয় হয়—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়। নামমাত্র ব্যাটারি ধারণক্ষমতাকে সরাসরি গাড়ির সংখ্যা দিয়ে গুণ করলেই প্রকৃত জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার বেরিয়ে আসে না।

তবে এটাও সত্য যে অটোরিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহারকে একেবারে তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই। যদি লাখ লাখ গাড়ি একই সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে রাত ১০টা বা ১১টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চার্জে বসে, তাহলে মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টায় তা উল্লেখযোগ্য লোড তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এখানে শুধু কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কখন ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। 

এখানেই অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ককে বৃহত্তর জ্বালানি নীতির সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। যদি সত্যিই অটোরিকশা চার্জিং রাতের বিদ্যুৎ চাহিদায় উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করে, তাহলে তার সমাধান হতে পারে চার্জিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু একটি বৃহত্তর জ্বালানি সংকটকে অটোরিকশার ওপর চাপিয়ে দিলে মূল সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। 

অটোরিকশাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা অবশ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেই। লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত যানকে কেবল অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা হিসেবে না দেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি সম্ভাব্য বাজার হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। অথচ অধিকাংশ অটোরিকশা রাতে গ্রিড থেকে চার্জ নেয়। চার্জিং স্টেশনগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং এবং স্মার্ট চার্জিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এই চিত্র বদলাতে পারে।  

বড় গ্যারেজ, পেট্রলপাম্প, এলপিজি স্টেশন, বাস টার্মিনাল, পৌরসভা, বাজার বা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই বিদ্যুতের একটি অংশ সরাসরি ব্যাটারি চার্জে ব্যবহার হতে পারে, আর অতিরিক্ত অংশ গ্রিডে দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ ট্যারিফ চালু হলে চার্জিংয়ের বড় অংশ অফ-পিক সময়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। স্মার্ট মিটার ব্যবহার করলে কোথায় কত বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কখন যাচ্ছে এবং কোনো এলাকায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে কি না—তা বিদ্যুৎ বিভাগ সরাসরি জানতে পারবে।

নীতির কাজ হওয়া উচিত এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে দেখা। সমস্যার জন্য শুধু দরিদ্র চালককে দায়ী করলে বিদ্যুৎ–সংকট কমবে না, সড়কও নিরাপদ হবে না। বরং অটোরিকশাকে নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ রুট, বৈধ মিটার, সময়ভিত্তিক চার্জিং, সৌরবিদ্যুৎ এবং পরিবেশসম্মত ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ–সংকটের গভীর কারণ—জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানিনির্ভরতা, উৎপাদন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ধীর অগ্রগতি—এসব নিয়েও সমান গুরুত্বে কাজ করতে হবে।

অটোরিকশাকে বিদ্যুৎ–সংকটের প্রতীক বানানো সহজ। কিন্তু একটি জটিল জ্বালানি ও পরিবহন সংকটের সহজ শত্রু তৈরি করলে নীতিগত সমাধান পাওয়া যায় না। বরং এই অনিয়ন্ত্রিত খাতটিকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন বৈদ্যুতিক পরিবহনের অংশে রূপান্তর করার সুযোগ এখনো আমাদের হাতে আছে। রাষ্ট্র যদি সেই সুযোগ নেয়, তাহলে আজ যে অটোরিকশাকে সমস্যার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই বাংলাদেশের স্থানীয় গণপরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।