• ঢাকা |

মাগুরায় বয়স ও শিক্ষাসনদ নিয়ে প্রশ্ন, ১৩ বছর পর সরকারি চাকরি ঘিরে তদন্তের দাবি


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক, মাগুরা: মাগুরায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীনে ২০১৩ সালে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পাওয়া গৌতম কুমার বিশ্বাসের চাকরি নিয়ে বয়স, জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাঁর নিয়োগের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও চাকরিপ্রার্থী বিধান কুমার বিশ্বাস।

অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নথিপত্র যাচাইয়ের কথা জানিয়েছেন। বর্তমানে গৌতম কুমার বিশ্বাস মাগুরার শালিখা উপজেলার বুনাগাতী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত রয়েছেন।

 

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের স্মারক নম্বর ০৫.৪৪.৫৫০০.০০৮.০৯.০১৮.১৩-১৫৬১-এর মাধ্যমে সাতজনকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীর দাবি, ওই নিয়োগ তালিকার সাত নম্বর প্রার্থী ছিলেন গৌতম কুমার বিশ্বাস। তাঁর বয়স নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন ছিল। তবে তিনি কীভাবে নিয়োগের নির্ধারিত বয়সসীমার মধ্যে ছিলেন, তা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গৌতম কুমার বিশ্বাসের জন্মতারিখ নিয়ে সরকারি নথিতে অসঙ্গতি। অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর। অন্যদিকে চাকরিতে ব্যবহৃত জন্মনিবন্ধন সনদে জন্মতারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৮৫ সালের ১২ ডিসেম্বর। অর্থাৎ দুটি নথিতে একই ব্যক্তির জন্মতারিখে সাত বছরের পার্থক্য রয়েছে।

 

মাগুরা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফারাজী বেনজীর আহম্মেদ বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাসের ভোটার আইডি কার্ড ও জন্মনিবন্ধন সনদের মধ্যে অমিল রয়েছে। ভোটার আইডির তথ্য আগে হয়েছে, পরে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করা হয়েছে।”

 

তবে জন্মনিবন্ধন সনদটি কীভাবে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

 

বয়সের পাশাপাশি চাকরির আবেদনে ব্যবহৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী বিধান কুমার বিশ্বাসের দাবি, গৌতম কুমার বিশ্বাস এসএসসি পাস করলেও চাকরির সময় অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণের একটি সনদ ব্যবহার করা হয়। ওই সনদটি একটি বিদ্যালয়ের নামে তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তবে যে বিদ্যালয়ের নামে অষ্টম শ্রেণির সনদ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, সেই জারিয়া সম্মিলনী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনীল কুমার ঘোষ অভিযোগটি নাকচ করেছেন।

 

তিনি বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাস আমাদের বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র ছিলেন না। আমি তাকে কোনো অষ্টম শ্রেণির সনদ দিইনি। তিনি কখনো এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেননি। এ ধরনের সনদের দায় বিদ্যালয় বহন করবে না।”

 

অন্যদিকে গৌতম কুমার বিশ্বাস দাবি করেছেন, তিনি মাগুরা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন। চাকরির নিয়োগে কেন অষ্টম শ্রেণির সনদ ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, তা তাঁর জানা নেই।

 

তিনি বলেন, “আমরা ছয় ভাই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছি। কাগজপত্রে অসঙ্গতি থাকতে পারে। আমি মাগুরা উন্মুক্ত থেকে এসএসসি পাস করেছি। কিন্তু আমার চাকরির নিয়োগে কেন অষ্টম শ্রেণির সনদ ব্যবহার হয়েছে, তা আমি জানি না।”

 

লিখিত অভিযোগে গৌতম কুমার বিশ্বাসের পরিবারের অন্য সদস্যদের সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী বলেন, মৃত রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের ছয় ছেলের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।

 

তবে শুধু একই পরিবারের একাধিক সদস্যের চাকরি থাকাই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। তাঁদের প্রত্যেকের নিয়োগের বয়সসীমা, যোগ্যতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া পৃথকভাবে যাচাই করলেই এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব।

 

বিধান কুমার বিশ্বাসের লিখিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, গৌতম কুমার বিশ্বাসের নামে একটি জন্মনিবন্ধন সনদ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া হলেও তাতে ব্যবহৃত স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, ওই সনদে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবের স্বাক্ষর নিয়েও অসঙ্গতি রয়েছে।

 

তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি। স্বাক্ষর জাল কি না, জন্মনিবন্ধনটি কোন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল এবং সনদ তৈরির সময় কী কী নথি যাচাই করা হয়েছিল—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও ডিজিটাল তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

 

২০১৩ সালে একই নিয়োগকে কেন্দ্র করে এর আগে আরেকজন চাকরিপ্রার্থী অভিযোগ করেছিলেন বলেও লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর মো. রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি একই বিষয়ে আবেদন করেন। ওই আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।

 

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

 

মাগুরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাহবুবুল হক বলেন, “গৌতম কুমার বিশ্বাসের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় নথি হাতে পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

 

শালিখা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম. সাব্বির হাসান বলেন, “নিয়োগটি ২০১৩ সালের। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষ। প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

অভিযোগকারী বিধান কুমার বিশ্বাস বলেন, “অনেক যোগ্য প্রার্থী চাকরি পাননি। অথচ বয়স ও নথি নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক।”

 

২০১৩ সালের নিয়োগের ১৩ বছর পর এসে গৌতম কুমার বিশ্বাসের চাকরি নিয়ে ওঠা অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নিয়োগের সময় তাঁর প্রকৃত জন্মতারিখ কী ছিল, কোন জন্মনিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে তিনি আবেদন করেছিলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের তথ্যের পার্থক্য কেন তৈরি হলো, চাকরিতে কোন শিক্ষাগত সনদ জমা দেওয়া হয়েছিল এবং সেই সনদ সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

 

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিয়োগসংক্রান্ত মূল নথি, আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ, জন্মনিবন্ধনের রেজিস্টার ও ডিজিটাল রেকর্ড এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

 

অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে নিয়োগের বৈধতা, চাকরিতে বহাল থাকার বিষয় এবং চাকরিকালীন প্রাপ্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর অভিযোগ মিথ্যা বা ভিত্তিহীন হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

 

ফলে ১৩ বছর আগের এই নিয়োগকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযোগে উত্থাপিত জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাসনদ ও বয়সসংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।