• ঢাকা |

ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসুদ্দীর অসীম সাহসিকতায় রক্ষা পেল নেত্রকোনার বড় বাজার


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

​ রায়হান আহমেদ, ব্যুরো চীফ ময়মনসিংহ: ঐতিহাসিক ও জনবহুল বাণিজ্যিক কেন্দ্র নেত্রকোনার বড়বাজার। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত এই প্রাণকেন্দ্রে গত ৮ আগস্ট, শনিবার রাতে নেমে এসেছিল এক বিভীষিকাময় প্রলয়। ঐ দিন ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯:৪০ মিনিট। হঠাৎ করেই শুরু হওয়া সেই আকস্মিক অগ্নি দুর্ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে লেলিহান শিখা আর কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো বাজার এলাকা। শত শত মানুষের স্বপ্ন ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ যখন নিমিষেই ছাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই পর্দার অন্তরালে থেকে এই ভয়ঙ্কর আগুন নির্বাপনের পুরো উৎস ও রহস্য ভেদ করে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ময়মনসিংহ  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মুৎসুদ্দী। তার অটল দৃঢ়তা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সরাসরি মাঠে থেকে করা অসামান্য উদ্ধারকাজে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে রাত ১০:৪০ মিনিটের মধ্যে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস।

 

​বড়বাজারের সেই ভীতিপ্রদ রাত ও আগুনের রহস্যময় গ্রাস : গত ৮ আগস্ট শনিবার রাত ৯:৪০ মিনিটে যখন বড়বাজারের ঘনবসতিপূর্ণ ও গাদাগাদি করে থাকা দোকানপাট ও গুদামগুলোর একটিতে রহস্যজনকভাবে আগুন ধরে যায়, তখন মুহূর্তের মধ্যে তা আশপাশের সুউচ্চ ভবন ও গুদামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের তীব্র উত্তাপ আর আকাশচুম্বী কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পুরো এলাকা। ব্যবসায়ীদের বুকফাটা আর্তনাদ আর মানুষের ছোটাছুটিতে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংকীর্ণ রাস্তাঘাট এবং ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে সাধারণ উদ্ধারকাজ চালানো ছিল এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ।

​সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দীর দ্রুততম উপস্থিতি ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ​: সংবাদ পাওয়া মাত্রই কালক্ষেপণ না করে ময়মনসিংহের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হন। তাঁর এই ঝড়ের বেগে উপস্থিতি ও তাৎক্ষণিক কমান্ডিং পুরো অপারেশনের গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়। ঘিঞ্জি গলির কোথায় পানির উৎস রয়েছে, কোন দিক থেকে আক্রমণ করলে আগুন ছড়াতে পারবে না এবং আগুনের আসল উৎস কোথায়—তার চোখের পলকে নেওয়া সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সিদ্ধান্তই সেদিন বড়বাজারকে একটি বড় মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।

 

​ছয় তলার গলিপথ ও আগুনের সাথে সরাসরি যুদ্ধ: 

এক অবিশ্বাস্য বীরত্ব ​পরিস্থিতির ভয়াবহতা যখন চরমে, তখন ফায়ার ফাইটারদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এই কর্মকর্তা। ঝুঁকি না নিয়ে দূর থেকে নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে তিনি নিজে সরাসরি আগুনের সাথে সম্মুখসমরে নেমে পড়েন। ছয় তলা ভবনের ঠিক যে সংকীর্ণ গলিপথে আগুন দাউদাউ করে ছড়িয়ে পড়ছিল এবং ভেতরে তীব্র ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া যাচ্ছিল না, জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি সেই পোড়া টিনের মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ গলিপথে প্রবেশ করেন।

 

​ভাঙা টিন ও আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি নিজে ফায়ার ফাইটারদের সাথে হাত মেলান, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাইপ টেনে ধরেন এবং সরাসরি কর্মীদের সাহস ও উদ্দীপনা জোগান। নেতার এই অভাবনীয় সাহসিকতা ও সান্নিধ্য সেদিন মাঠের প্রতিটি কর্মীর মনে জোগায় এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

 

​অদম্য প্রচেষ্টায় এক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে : ​সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দীর নিখুঁত ও দৃঢ় কৌশলগত অভিযানের ফলেই মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে—রাত ১০:৪০ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

 অপারেশন শেষে রোমহর্ষক সেই রাতের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তিনি বলেন,​"আমি নিজের প্রশংসার জন্য বলছি না; কিন্তু সেদিন যদি আমরা আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে যথাসময়ে বড়বাজারে পৌঁছাতে না পারতাম এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মাঠে লড়াই না চালাতাম, তবে আজকের এই গল্পের পরিণতি সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ও পুরো বাজারটি ভস্মীভূত হওয়ার মতো মারাত্মক ট্র্যাজেডি ঘটে যেত।"

 

​বাস্তবতাও তাই সাক্ষ্য দেয়—তাঁর সেই জাদুকরী উপস্থিতি ও সাহসিকতাই সেদিন নেত্রকোনার এই প্রাণকেন্দ্রের অর্থনীতিকে ধূলিসাৎ হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।

​আহতদের দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ ও মানবিকতা

​অগ্নিঝরা এই যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকেও সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী ভোলেননি তাঁর অধীনস্থ সহকর্মীদের কথা। সরাসরি আগুন নেভাতে গিয়ে এবং ভারী টিন সরাতে গিয়ে যে কয়েকজন ফায়ার ফাইটার সামান্য আহত ও ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাদের তত্ত্বাবধান করেন। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ও নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই সাহসী আহত যোদ্ধাদের হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন, যাতে কারোরই বড় কোনো ক্ষতি না হয়।

 

​জনসচেতনতা ও শেষকথা: ​পরদিন ভোরের আলো ফোটার পর বড়বাজারের চিত্রটি ছিল বেশ থমথমে। পোড়া কাঠ, গলিত টিন আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো পোড়া গন্ধ মনে করিয়ে দিচ্ছিল গত ৮ আগস্টের সেই ভয়াল রাতের কথা। তবে সব ছাপিয়ে ব্যবসায়ীদের চোখে মুখে ছিল এক বুক কৃতজ্ঞতা। ময়মনসিংহের ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দীর অসীম সাহসিকতা, নির্ভীক নেতৃত্ব এবং প্রতিটি কর্মীর আত্মত্যাগের এই গল্প আজ মুখে মুখে ফিরছে। এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—কর্তব্যপরায়ণ ও সাহসী মানুষেরা কীভাবে নরকের মতো বিভীষিকা থেকেও একটি জনপদকে সুনিপুণ ভাবে বাঁচিয়ে আনতে পারেন। একই সাথে, বড়বাজারের মতো জনবহুল বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।