• ঢাকা |

ঐতিহ্য থেকে বিশ্ববাজারে রাজশাহীর রেশম-শিল্প, চীনের বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

শামীম রহমান, রাজশাহী ব্যুরো: চীনের বিশাল বাজারে রাজশাহীর রেশমের প্রবেশাধিকার তৈরি এবং রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে রেশম চাষ, গবেষণা ও উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্রের আয়োজনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি বলেন, “চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি রেশমের আলাদা অবস্থান তৈরি করা গেলে রাজশাহীর রেশম শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।“

প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজশাহীর রেশম কেবল একটি শিল্প নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও গর্বের অংশ। হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকার আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

তিনি আরোও বলেন, রেশম শিল্পের উন্নয়নে রেশম চাষের পদ্ধতি আধুনিকায়ন, তুঁত চাষ সম্প্রসারণ এবং সুতার গুণগত মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবেষণালব্ধ ফলাফল মাঠপর্যায়ে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সম্মেলনের আগে প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ রেশম কারখানা এবং বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি রেশম শিল্পের উৎপাদন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবগত হন।

রেশম শিল্পের উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে শরীফুল আলম বলেন, বন্ধ কারখানা চালুর পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজশাহীর রেশম শিল্পের উন্নয়নে কার্যকর বিপণন নীতি তৈরির কাজও চলছে।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম বড় রেশম উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ চীন। ফলে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি রেশমের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারলে এর সুফল সরাসরি রাজশাহীর রেশমচাষি, তাঁতি ও উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে। এতে রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু মানসম্মত সুতা ও কাপড় উৎপাদনই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আধুনিক নকশা, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বিপণন কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে ‘রাজশাহী সিল্ক’ আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রাজশাহীর রেশম শিল্পে সাম্প্রতিক উৎপাদন পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক।

২০১৮ সালে পুনরায় চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারখানায় মোট ৫৯ হাজার ৪৬৮ মিটার রেশম কাপড় উৎপাদিত হয়েছে। কারখানার নিজস্ব শোরুমে ঐতিহ্যবাহী গরদ শাড়ি, প্রিন্টেড শাড়ি, পাঞ্জাবির কাপড় ও বলাকা সিল্কসহ বিভিন্ন উন্নতমানের রেশম পণ্য সরাসরি বিক্রি করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গবেষণালব্ধ ফল মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে রেশম উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণগত মান—দুটিই বাড়ানো সম্ভব। উন্নত জাতের তুঁত ও রেশমকীট উৎপাদন, চাষিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ানো গেলে এ খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

সম্মেলনে রাজশাহীর রেশম শিল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘রাজশাহী সিল্ক বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এ শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে রেশম শিল্পকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে চায়।

চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত এ সম্মেলন গবেষণা ও উন্নয়নের পাশাপাশি রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশমকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় পণ্যে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার তৈরি করা গেলে ‘রাজশাহী সিল্ক’ নতুন করে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি দেশের রেশম শিল্পে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়াও সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ এমপি, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, ঝেজিয়াং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ও ভাইস ডিন অধ্যাপক জু কিউজি এবং চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প উদ্যোক্তা ও প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক নুসরাত জাহান নিপা। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. তৌফিক আল মাহমুদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মো. শাখাওয়াত হোসেন।