• ঢাকা |

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মাঝেও কূটনীতির হাওয়া, তেলের দাম কমল


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৫ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক | আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে টানা উত্তেজনা, যুদ্ধের আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই নতুন আশার বার্তা দিল কাতার। দেশটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংকট নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একদিনেই ৫ শতাংশের বেশি কমে এসেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবারও উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।

তবে আশাবাদের এই চিত্রের বিপরীতে এখনো রয়ে গেছে বড় ধরনের কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট ভাষায় সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আলোচনার সম্ভাবনা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি অবিশ্বাসও রয়ে গেছে গভীর।

কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন গতি

মঙ্গলবার কাতারের আমিরি দিওয়ান (আমিরের কার্যালয়) এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির মধ্যে টেলিফোনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।

ওই আলোচনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জুন মাসের মাঝামাঝি স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের প্রতি কাতারের আমির পুনরায় গুরুত্বারোপ করেছেন। ওই সমঝোতায় সব ধরনের সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি সংকট নিরসনের একমাত্র কার্যকর পথ হিসেবে সংলাপের ওপর জোর দেওয়া হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরেই কাতার আঞ্চলিক কূটনীতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও দেশটি একই ভূমিকা আরও সক্রিয়ভাবে পালন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের অস্বীকৃতি

সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য এটিই তেহরানের "শেষ সুযোগ"।

তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনার দাবি এবং ইরানের প্রকাশ্য অস্বীকৃতি—দুই পক্ষের দর-কষাকষির কৌশলের অংশও হতে পারে। অতীতেও বড় ধরনের সামরিক চাপ সৃষ্টি করে পরে আলোচনার পথ খোঁজার কৌশল ট্রাম্প অনুসরণ করেছেন।

বড় হামলা থেকে সরে আসার পর নতুন বার্তা

এর আগে সপ্তাহান্তে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

তারপরই আলোচনার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন তিনি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সামরিক চাপ এবং কূটনৈতিক বার্তা—এই দুই কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করে ইরানের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

হরমুজ প্রণালি: সংকটের কেন্দ্রবিন্দু

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি।

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে কার্যত এই নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এমনকি সর্বশেষ সময়েও প্রণালি অতিক্রমের সময় একটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হলেও কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব ফিরে আসে। এর প্রভাবেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে যায়।

ওমানের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ ট্রানজিট নিশ্চিত করতে ওমানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ইরান ও ওমান—উভয় দেশের সার্বভৌম অধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা।

এতে বোঝা যাচ্ছে, সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়েও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ওয়াশিংটনের আশাবাদ

মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও আশাবাদী অবস্থান নিয়েছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আলোচনা এগিয়েছে, যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। তবে খুব শিগগিরই ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে মঙ্গল বা বুধবারের মধ্যেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তেলের বাজারে স্বস্তি, কিন্তু ঝুঁকি এখনো কাটেনি

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসা তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তির খবর হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

কারণ—

হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি।
ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালিতে জাহাজের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
কোনো পক্ষের সামান্য সামরিক পদক্ষেপও আবার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব

বাংলাদেশ সরাসরি হরমুজ প্রণালির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তনের প্রভাব দেশটির অর্থনীতিতে দ্রুত পড়ে।

যদি প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয় এবং তেলের দাম নিম্নমুখী থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সামনে কী?

এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির নজর তিনটি বিষয়ের ওপর—

কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাস্তব কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হয় কি না;
হরমুজ প্রণালি পুনরায় সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক নৌযানের জন্য খুলে দেওয়া হয় কি না;
এবং উভয় পক্ষ সামরিক উত্তেজনা থেকে সরে এসে স্থায়ী সংলাপের পথে এগোয় কি না।

এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরবর্তী গতিপথ।