• ঢাকা |

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে কি মার্কিন আধিপত্যের বিদায় ঘণ্টা বাজল?


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৮ আগস্ট, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিসই করেছে। নতুন এ চুক্তি ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ নামে এ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

চুক্তির মূল বিষয় হলো— তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ববোধ, ইসলামি সংহতি, অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এবং দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তিতে এ চুক্তি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন দেশ নিজেদের যৌথ নিরাপত্তা জোরদার এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে।


যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মধ্যপ্রাচ্যের তিন প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও বেশি কৌশলগত স্বনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসা যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো ও সম্পদও রয়েছে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

চুক্তিটি এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান সৌদি আরবসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের হামলার আশঙ্কাও সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পথ বেছে নিচ্ছে।

রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।

তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ পরিচালনার ধরন এবং একের পর এক সমঝোতার চেষ্টা— সবকিছুই সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ফলে এসব দেশ নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে।

তবে উলরিখসেন মনে করেন, নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অতিরিক্ত কৌশলগত ও নীতিগত বিকল্প তৈরি করা।


নতুন এই জোটের মাধ্যমে তিন দেশের আলাদা সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প ও ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক এবং বিপুল আর্থিক সক্ষমতার অধিকারী। আর পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা—এই তিনটি একসঙ্গে বড় ধরনের আঞ্চলিক শক্তি তৈরি করতে পারে।

তবে এটি ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়। বরং সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্প, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত সমন্বয়ের জন্য একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সৌদি আরবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ

চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা।

দশকের পর দশক ধরে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনে এসেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে চায় রিয়াদ।

তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা সৌদি আরবকে সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর সৌদি আরবের একচেটিয়া নির্ভরতা কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো বদলে যাওয়ার এটি অন্যতম প্রথম বড় ভূরাজনৈতিক ইঙ্গিত।

তার মতে, বিষয়টি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট গঠনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এটি দেখাচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে।

বিশেষ করে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে শক্তিশালী নিরাপত্তা অংশীদারত্ব রয়েছে। কিন্তু মক্কা চুক্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সৌদি আরব এখন নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করতে চাইছে।

সিনা তুসির ভাষায়, ওয়াশিংটনের ওপর প্রধানত নির্ভর করার পরিবর্তে সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করছে। এটিই চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে।