• ঢাকা |

কিরূপে বিফল হয় ঈমানদার ব্যক্তি ও ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ?


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল


সফল ও বিফল হওয়ার কারণ 


ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে শুধু এক খণ্ড ভূমি, জনবল, অর্থবল, সামরিক বল ও সরকারই জরুরি নয়; বরং অতি অপরিহার্য হলো জনগণে ঈমানী বল। মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণে ঘুষখোর অফিসার, সূদখোর মহাজন এবং প্রতারক ব্যবসায়ীও লাখ লাখ টাকা দিতে পারে। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে সে অংশ  নিতে পারে না। কারণ, সে সামর্থ্য তার থাকে না। এ কাজটি পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদ শুধু অর্থের কুরবানী চায় না, চায় জানের কুরবানীও। প্রবল ঈমানী বলের প্লাবন ছাড়া কখনোই কেই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে অংশ নেয় না। ঈমানের সেরূপ প্লাবন এসেছিল নবীজী (সা:) ও সাহাবীদের আমলে; ফলে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে সেদিন প্রতিটি ঈমানদার প্রাণদানে রণাঙ্গণে হাজির হয়েছিলেন এবং অর্ধেকের বেশি সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। ফলে পারস্য সাম্রাজ্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করাও তাদের জন্য সহজ হয়েছিল। 
 

কিন্তু আজ সে ঈমানের জোয়ার নাই। ইসলামকে বিজয়ী করতে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে প্রাণ দান দূরে থাক, অধিকাংশ মুসলিম ভোট দিতেও রাজী নয়। এমন কি যারা নামাজী, রোজাদার ও হাজী -তারাও নয়। ফলে বিশ্বের কোথাও নির্মিত হয়নি ইসলামী রাষ্ট্র। মুসলিমগণ ধর্ম পালন করছে পূর্ণ ইসলাম পালন না করেই। ফলে মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, তাঁর আইন, দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ, প্যান ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব স্রেফ কিতাবে রয়ে গেছে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ বাদ দিয়ে ইসলামের লেবাসধারীরা ব্যস্ত নামের আগে হাজী, আলেম, আল্লামা, মুফতি, মোহাদ্দেস, আশেকে রাসূল, মুর্শিদে কামেল ইত্যাদি পদবী লাগাতে। বাংলাদেশের মত দেশে যতটা ধর্মপালন হচ্ছে, তার চেয়ে বহু গুণ বেশী হচ্ছে ধর্মের নামে ব্যবসা। ধর্ম পালন গুরুত্ব পেলে অবশ্যই নির্মিত হতো ইসলামী রাষ্ট্র। কারণ ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া তো পূর্ণ ইসলাম পালন অসম্ভব। ফলে দেশটিতে ধর্ম পালন হচ্ছে শরিয়া পালন এবং অজ্ঞতা ও দুর্বৃত্তির নির্মূলে জিহাদ পালন না করেই।          
                                                                                           
ঈমানের জোয়ার এলে জোয়ার আসে নেক আলে। সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমলটি কাউকে কোটি টাকা দান করা নয়; বরং সেটি হলো জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতে নেয়া। এ পৃথিবী পৃষ্ঠে এর চেয়ে বড় নেক আমল নাই। সে নেক আমলটি একমাত্র তারাই করতে পারে যারা রাষ্ট্রকে জনগণকে জান্নাতে নেয়ার হাতিয়ারে পরিণত করে। সেটি সম্ভব হয় ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের ফলে। তখন রাষ্ট্রের সমগ্র প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো, তার লোক বল, অর্থ বল ও অস্ত্র বল সমগ্র দেশবাসীকে জান্নাতে নেয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়। সে লক্ষ্যে কাজ করে রাষ্ট্রের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক, বৈচারিক ও সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং প্রকল্প। তখন রাষ্ট্র পরিণত হয় জাহান্নামের পথগুলি ধ্বংস করার হাতিয়ারে।


ঈমানের জোয়ার কোন গোপন বিষয় নয়; ব্যক্তির জীবনে সেটি স্পষ্ট দেখা যায়। ঈমানের জোয়ার এলে বিপ্লব আসে ব্যক্তির ভিশন, মিশন ও চরিত্রে। তখন পাল্টে যায় জীবনের স্বপ্ন। তখন নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মানুষের মাঝে ভাতৃত্বের দৃঢ় বন্ধন গড়ে উঠে। বাড়ে একতার তাড়না। সদা সতর্ক হয় বিভক্তি থেকে বাঁচায়। তখন বাড়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর কিছু করার প্রবল আকাঙ্খা। সে লক্ষ্য সাধনে বাড়ে জান মালসহ সর্ব সামর্থ্যের বিনিয়োগ। এমন ঈমানদার মানুষদের সংগঠিত করতে নবীজী (সা:)কে দল গড়তে হয়নি, তারা নিজেরাই একতাবদ্ধ হয়। তখন বাড়ে ইসলামী বিধানকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার জিহাদ। তখন দেশের ভূগোলই শুধু সুরক্ষিত হয় না, তাতে দ্রুত বৃদ্ধিও ঘটে। তখন মুসলিমগণ প্রতিষ্ঠা পায় বিশ্বশক্তি রূপে। সেরূপ একটি আদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিপ্লব এসেছিল নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের আমলে। ১৯৪৭’য়ে তেমন এক প্যান-ইসলামী বিপ্লবী প্রক্রিয়ায় শামিল হয়েছিল বাংলার মুসলিমগণও। ফলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল পাকিস্তানের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। তখন ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অবাঙালিগণ পূর্ব পাকিস্তানের জমিনে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছিল।


ঈমানের প্লাবন ও বেঈমানীর প্লাবন


মুসলিমের ভূ-রাজনীতিতে বিভক্তি ও বিবাদ বাড়লে বুঝতে হবে চেতনার ভূবনে প্লাবনটি বেঈমানির। বিভক্তি ও বেঈমানি সব সময় একত্রে চলে। অপর দিকে একত্রে চলে ঈমানদারি ও একতা। ঈমান বাড়লে তাই উম্মাহর জীবনে একতা বাড়ে। অপর দিক বেঈমানি বাড়লে বাড়ে মনের দূরত্ব, বাড়ে পরস্পরে ঘৃণা। এরং বাড়ে বিভক্তি। তখন শুরু হয় আরব অনারব, তুর্কি কুর্দি এবং বাঙালি বিহারির মাঝে ভাতৃঘাতী সংঘাত ও গণহত্যা। তখন শুরু হয় দেশ ভাঙার লড়াই। দেশের ভূগোল ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে থাকে। সে প্রক্রিয়ার পথ ধরেই বিশ্বের ১৫০ কোটির অধিক ৫০টি বেশি রাষ্ট্র গড়েছে এবং স্বাধীনতাহীন, নিরাপত্তাহীন ও ইজ্জতহীন হয়েছে। ১৯৭১’‌য়ে মুজিবের নেতৃত্বে তেমন এক নিচে নামার প্রক্রিয়ায় শামিল হয়েছিল বাঙালি মুসলিমগণ। সে প্রক্রিয়ার পথ ধরেই তারা শয়তানের পৌত্তলিক খলিফাদের সাথে জোট বেঁধে পাকিস্তান ভাঙে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গণে পরিচিতি পায় ভিক্ষার তলাহীন পাত্র রূপে। গণতন্ত্র কবরবাসী হয় এবং ১৫ লাখের বেশি মানুষ ১৯৭৪’য়ের দুর্ভিক্ষে প্রাণহারায়। বাংলাদেশ পরিণত হয় ভারতের রাডারের নিচে এক আশ্রিত রাষ্ট্রে।
                                                                                                                                        

মুসলিম জীবনে যেমন ঈমানের জোয়ার এসেছে, তেমনি এসেছে বেঈমানীর জোয়ারও। সাহাবাদের জীবনে ঈমানের জোয়ার এনেছিল পবিত্র কুর’আন। সে জোয়ার মুসলিমদের একতাবদ্ধ করে, বিজয়ী করে ও বিশ্বশক্তিতে পরিণত করে। বেঈমানির জোয়ারটি এসেছে পবিত্র কুর’আন থেকে দূরে সরাতে। তাতে মুসলিম দেশে তাণ্ডব বাড়ে বর্ণবাদ, গোত্রবাদ, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও কম্যুনিজমের। বাঙালি মুসলিম জীবনে সে জাহিলিয়াতের প্রবল জোয়ার দেখা গেছে পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে। তখন জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারিজমের স্রোতে কচুরিপানার ন্যায় ভেসে যায় বিপুল সংখ্যক বাঙালি ছাত্র ছাত্রী, রাজনৈতিক নেতা কর্মী, মিডিয়া কর্মী, লেখক ও বুদ্ধিজীবী। স্রোতে ভাসা সে বাঙালি জাতীয়তাবাদীগণ যুদ্ধ শুরু করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিনাশে; সে যুদ্ধে কোয়ালিশন গড়ে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের সাথে। বাঙালি সেক্যুলারিস্টরা যে ইসলামের পথ হারিয়েছিল -এ হলো তার দলিল।


পথ না হারালে কোন ঈমানদার ব্যক্তি কখনোই পৌত্তলিক কাফিরদের কোলে গিয়ে উঠতো না। কখনোই তাদের থেকে অর্থ, অন্ন ও অস্ত্র গ্রহণ করতো না। এবং তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কখনো যুদ্ধ করতো না। এবং ভারতকে কখনো বিজয়ী করতো না। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধে প্রকৃত বিজয়টি ভারতের। ভারত ভাঙতে পেরেছে প্রতিদ্বন্দ্বি পাকিস্তানকে। কোমর ভেঙেছে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম শক্তির। সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটি ভেঙে যাওয়ায় দুর্বল হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। বাংলাদেশকে বানাতে পেরেছে ভারতের এক আশ্রিত রাষ্ট্রে। ভারত পেয়েছে ১৮ কোটি মানুষের এক সুরক্ষিত বিশাল বাজার।  অপর দিকে বাঙালি মুসলিমদের ক্ষতিটি বিশাল। তারা পেয়েছে বাকশালী ফ্যাসিবাদ, গণতন্ত্রের কবর, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থান অর্জন।

পাকিস্তান আমলে কথা বলা, লেখালেখি, মিটিং মিছিল ও ভোটদানের যে স্বাধীনতা ছিল -সে স্বাধীনতা কবরবাসী হয় ফ্যাসিস্ট মুজিব ও হাসিনার আমলে। তাছাড়া সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি হওয়াতে দেশটির চালকের আসনে বসে বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব ফেলার যে সুযোগ ছিল -সেটিও তারা হারিয়েছে। বাঙালি মুসলিমের জন্য এটি এক বিশাল ক্ষতি। পাকিস্তানের ২৪ বছরে ৪ জন প্রধানমন্ত্রী ছিল বাঙালি। অখণ্ড পাকিস্তান বেঁচে থাকলে দেশটি হতো চীন ও ভারতের পর জনসংখ্যায় বিশ্বের তৃতীয় বৃহ্ত্তম পারমাণবিক শক্তি। মুসলিম উম্মাহকে যারা বিভক্ত, দুর্বল, পরাধীন ও ইজ্জতহীন দেখতে চায়, তাদের জন্য ১৯৭১‌’য়ে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়াটি প্রচণ্ড উৎসবের বিষয়। তাই ১৬ ডিসেম্বরের ভারতের বিজয় নিয়ে উৎসব করে শুধু হিন্দুত্ববাদী ভারতই নয়, ইসলামের বাংলাদেশী শত্রুরাও।  মুসলিম ইতিহাসে এমন কি কখনো হয়েছে, যে বিশাল যুদ্ধজয়টি পৌত্তলিক কাফিরদের, সে যুদ্ধজয়টি একই সাথে মুসলিমদেরও? এটি এক অদ্ভুত অলীক ভাবনা। পৌত্তলিক কাফিরদের যুদ্ধজয়ের সাথে মুসলিমদের বিজয় যে একত্রে ঘটে না -সে অতি সহজ সত্যটি বুঝতেও বহু বাঙালি মুসলিম ব্যর্থ হয়েছে! পরম বিস্ময়ের বিষয় হলো, ১৬ ডিসেম্বর এলে তথাকথিত বহু ইসলামপন্থী তরুন বিজয় মিছিল করে। তাদের মনে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম দেশ ভাঙা নিয়ে ঐদিন মাতম করতো। কারণ ঐ দেশটির উপর বৃহত্তর মালিকানা তো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বাঙালির ছিল।        


মুসলিমদের মূল ব্যর্থতাটি মুসলিম হওয়ায়


ভূ-রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য -সর্বত্র জুড়ে মুসলিমদের বিশাল ব্যর্থতা। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো মুসলিম হওয়ায়। অন্য সকল ব্যর্থতার জন্ম মূলত মুসলিম হওয়ার ব্যর্থতা থেকে। মুসলিম হওয়ায় সে ব্যর্থতাটি দৃশ্যমান হয় মুসলিমদের অনৈক্য, দুর্বৃত্তি, কুর’আনী জ্ঞানে অনিহা এবং জিহাদশূণ্যতা এবং ইসলাম রাষ্ট্র নির্মাণে অঙ্গীকারহীনতার মধ্য দিয়ে। তবে মুসলিম হওয়ায় ব্যর্থতার মূলে হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা। ব্যক্তির সবচেয়ে বড় সামর্থ্য হলো তার বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য। সে সামর্থ্যটি দেয় সঠিক চিন্তা ভাবনা এবং সত্য মিথ্যা চেনার সামর্থ্য। দেয় ভূ-রাজনৈতিক সামর্থ্য। দেয় একতাবদ্ধ ও সংগঠিত হওয়ার সামর্থ্য। বস্তুত বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের গুণেই ব্যক্তি ঈমানদার হয় এবং জান্নাতের পথ পায়। অপর দিকে বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার কারণে মানুষ বেঈমান হয় এবং জাহান্নামে যায়। তাই এ জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি দৈহিক বল বা অর্থ বৃদ্ধি নয়, বরং সেটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক বলবৃদ্ধি। বুদ্ধিবৃত্তিক বল বৃদ্ধির এ কাজটি ইসলামে ফরজ। এবং সে বলের উৎস্য হলো পবিত্র কুর’আন।


মহান রব দেহের পুষ্টির জন্য নানারূপ খাদ্য পানীয় দিয়েছেন, তেমনি কুর’আন দিয়েছেন চিত্তের বা বিবেকের পুষ্টি জুগাতে। পানি ছাড়া যেমন ফসল বাঁচে না, কুর’আনী জ্ঞান ছাড়া তেমনি ঈমান বাঁচে না। তাই নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ফরজ করার আগে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন। এ থেকে বুঝা যায়, সর্বজ্ঞানী মহান রব মানুষের জন্য কুর’আনের জ্ঞানকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। পরিতাপের বিষয় হলো, অধিকাংশ মুসলিমের ভাবনাটি ভিন্ন রূপ। তারা জ্ঞানার্জনকে সেরূপ গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। ফলে আগ্রহ নাই কুর’আনী জ্ঞানার্জনে। কুর’আন তেলাওয়াত করলেও তারা কুর’আন বুঝার চেষ্টা করে না। ফলে আদায় হয় না কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের ফরজ। ফলে মুসলিমগণ হারিয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক পুষ্টি ও সুস্থতা। মুসলিমগণ আজ যেরূপ বিভক্ত, পরাজিত ও বিপর্যস্ত তার কারণ তাদের দৈহিক স্বাস্থ্যহানী বা সম্পদের কমতি নয়; বরং সেটি হএবং লো কুর’আনী জ্ঞানের অপুষ্টি। অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাস্থ্যহানী। ফলে বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশে জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও বামধারার দলগুলি তাদের ইসলাম বিরোধী রাজনীতিতে এতো বিপুল সংখ্যক খরিদদার পায়। এবং বিপুল খরিদদার পায় পতিতাপল্লীর জ্বিনার ব্যবসায়ী, প্রতারক রাজনীতিবিদ এবং ধর্মব্যবসায়ীরা।   
 

কুর’আনী জ্ঞানের অপুষ্টির কুফলটি ভয়ানক। তাতে মৃত্যু হয় ঈমানের। মুসলিম তখন নামে মাত্র মুসলিম থেকে যায়; তখন অবিকল কাফিরদের মত হয় তাদের চেতনা, কর্ম, চরিত্র, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি। ফলে তাদের কর্ম, চরিত্র, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি দেখে বাঙালি কাফিরদের থেকে পৃথক করা যায় না।   কাফিরগণ যেমন ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়া, কুর‌’আন শিক্ষা ও জিহাদের বিরোধীতার করে, এরাও তেমনি সেগুলির বিরোধীতা করে। কাফিরগণ যেমন ইসলামের বিজয় চায় না, এরাও তেমনি ইসলামের বিজয় চায় না। সেটি স্পষ্ট বুঝা যায় বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্ট, বাঙালি ফ্যাসিস্ট ও কম্যুনিস্টদের দিকে নজর দিলে। এজন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা চান, কুর’আনী জ্ঞানের অপুষ্টি থেকে মানব জাতিকে মুক্তি দিতে। কুর’আন হলো মানব জাতির জন্য হান রব‘য়ের সর্বশ্রেষ্ঠ দান। কারণ, এ দানই মানুষকে জান্নাতে নেয়; সে বিশাল কল্যাণের কাজটি অর্থ বল, দৈহিক বল বা ব্যক্তির অন্য কোন সামর্থ্য করে না। ইসলামের মিশনের শুরু তাই জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান দানের মধ্য দিয়ে।

পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা: “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা” অর্থ: বান্দাদের মাঝে একমাত্র জ্ঞানবানগণই আমাকে ভয় করে। যারা মুসলিম রূপে বাঁচতে চায়, তাদের জন্য এটি এক ভয়ঙ্কর হুশিয়ারি। এর অর্থ দাঁড়া্যয়, যার মধ্যে জ্ঞান নাই, তার মধ্যে আল্লাহ তায়ালার ভয়ও নাই। এবং যার মধ্যে আল্লাহ তায়ালার ভয় নাই, তার জন্য স্বভাবতই অসম্ভব হলো মুসলিম হওয়া। এখানে জ্ঞান বলতে বুঝানো হয়েছে পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান। অথচ কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের কাজটি আজ হচ্ছে না। কুর’আনের ভাষা না শেখা এবং না বুঝাটাই আজ মুসলিম জীবনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ তারা নানা বিদেশী ভাষা শেখে ও নানা পেশায় পারদর্শী হয়। কিন্তু জীবনে একবার পুরো কুর’আন শরীফ বুঝে পড়েছে এমন মুসলিম কি এক লাখের মাঝেও একজন মিলে? কুর’আনী জ্ঞানের এ অজ্ঞতা থেকেই মুসলিম বিশ্বজুড়ে আজ জাহিলিয়াতের জোয়ার। সে জাহিলিয়াতের জোয়ার এতোই তীব্র যে, নবীজী (সা:)’য়ের  প্রতিষ্ঠা পাওয়া বিশুদ্ধ ইসলাম বিশ্বের কোথাও বেঁচে নাই। ফলে কোথাও বেঁচে নাই আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়া, প্যান ইসলামী ভাতৃত্ব এবং দুর্বৃত্তির নির্মূলে ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ।


বিস্ময়ের বিষয়, ইসলামের এ পরাজয় এবং মুসলিম উম্মাহর এ শক্তিহীনতা নিয়ে বাঙালি মুসলিমদের মাঝে কোন মাতম নাই। ইসলামকে পুণরায় বিজয়ী করা এবং মুসলিম উম্মাহকে শক্তিশালী করা নিয়েও কোন তাড়নাও নাই। রোগীর মৃত্যু যখন ঘনিয়ে আসে তখন ক্ষুধা লোপ। লজ্জা শরম, চেতনা এবং ব্যাথাও লোপ পায়। বস্ত্র খুলে নিলে বা দেহে আঘাত করলেও সে জবাব দেয় না। সেরূপ একটি অবস্থা মরণাপন্ন জাতির। দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েও বাংলাদেশীদের তাই কোন লজ্জা শরম হয় না। তারা বরং প্রচণ্ড গর্ব ভরে উৎসব করে এ নিয়ে, তারা বাংলা ভাষার নামে একটি দেশ গড়তে পেরেছে। রোজ হাশরের বিচার দিনে এমন অর্জনের কি এক পয়সা মূল্য আছে? সেখানে তো হিসাব হবে মহান রাব্বুল আলামীনের দ্বীনের বিজয় বাড়াতে, মুসলিম উম্মাহর একতা বাড়াতে এবং পৌত্তলিক কাফিরদের হামলা থেকে মুসলিম রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বাঁচাতে কি অবদান ছিল -সেটির।      

 
ব্যর্থতার শুরুটি কুর’আন বুঝায় ব্যর্থতা থেকে

কুর’আন বুঝতে হলে কুর’আনের ভাষা বুঝতে হয়। ভাষা জ্ঞান কাজ করে জ্ঞানের ভাণ্ডারে প্রবেশের চাবি রূপে। যার হাতে সে চাবি নাই, সে ব্যর্থ হয় কুর’আন থেকে জ্ঞান আহরনে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অজ্ঞ ব্যক্তি কখনোই চিকিৎস্যক হতে পারে না, তেমনি কুর’আনে জ্ঞানে জাহিল ব্যক্তি কখনোই প্রকৃত মুসলিম হতে পারে না। প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ বিষয়টি বুঝতেন। তাই কুর’আন বুঝার কাজটি সহজ করতে মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সুদান, মরক্কো, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, আলজিরিয়া, মৌরতানিয়ার ন্যায় বহু দেশের জনগণ তাদের মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে আরবি ভাষা শিখেছেন এবং সরাসরি মহান আল্লাহ তায়ালার নিজের ভাষাতেই তারা কুর’আনকে বুঝেছেন। তারা কোন তরজমার সাহায্য নেননি। বাঙালিদের মত তাদের মাঝে অন্ধ ভাষা প্রেম কাজ করেনি; বরং কাজ করছে মহান রব’য়ের বাণী বুঝা ও তাঁর  কাছে প্রিয়তর হওয়ার তাড়না। সে তাড়না বাঙালি মুসলিমদের মাঝে কাজ করে না। ফলে বাঙালি মুসলিমগণ ব্যর্থ হচ্ছে কুর’আনী জ্ঞানার্জনের সে ফরজ আদায়ে। ফলে তারা ব্যর্থ হচ্ছে কুর’আনের পথে তথা সিরাতাল মুস্তাকীমের পথে চলতে।

আর যারা কুর’আন বুঝতে চায় তাদের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা কুর’আন বুঝা সহজ করে দেন। সে প্রতিশ্রুতিটি তিনি সুরা ক্বামারের ৪ বার দিয়েছেন:

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ

অর্থ: “আমি কুর’আনকে বোঝার জন্যে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, বুঝতে আগ্রহী এমন কেউ আছে কি?”-(সুরা ক্বামার, আয়াত ১৭, ২২, ৩২, ৪০)।

প্রথম যুগের মুসলিমদের সকল সাফল্যের মূলে ছিল পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানর্জনের ফরজ আদায়। আর আজকের ব্যর্থতার মূল কারণ, কুর’আনী জ্ঞানে অজ্ঞতা। কুর’আন হলো জান্নাতের রোডম্যাপ। এবং রোডম্যাপ হলো ঈমানদার মানব নির্মাণ, উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণেরও। অথচ সে রোডম্যাপ আজ পরিত্যক্ত। কুর’আন না বুঝে কি সে পথে চলা সম্ভব? সে অজ্ঞতার কারণে মুসলিম উম্মাহর বিশাল বিচ্যুতিটি জান্নাতের রোডম্যাপ থেকে। সেটি বুঝা যায় জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের পথে ধাবিত হওয়া থেকে। এবং আরো বুঝা যায় মুসলিম দেশে দুর্নীতি, পতিতাবৃত্তি, সুদ, জুয়া ও মদের রমরমা উপস্থিতি দেখে। এগুলি হলো জাহান্নামের পথের পথচিহ্ন। জান্নাতের পথে কখনো এগুলি দেখা যায় না।

ঈমান একমাত্র তখনই বাঁচে ও বেড়ে উঠে যখন পুষ্টি পায় ওহীর জ্ঞান তথা পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান থেকে -যারা ঘোষণা এসেছে সুরা আনফালের দুই নম্বর আয়াতে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাগিদ সত্ত্বেও মুসলিম নামধারীগণ সে আহবানে সাড়া দেয়নি। সাড়া দিলে তাদের মাঝে কুর’আন বুঝায় আগ্রহ দেখা যেত। অথচ বিদেশী প্রতিষ্ঠানে ভাল চাকুরি লাভের আশায় তারা ইংরেজিসহ নানা বিদেশি ভাষা শিখছে। নিজ সন্তানদের বিদেশী ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অথচ বিনিয়োগ নাই মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী বুঝার ক্ষেত্রে। মহান রব’য়ে  নির্দেশের সাথে যাদের এরূপ গাদ্দারী -তারা কি তাঁর করুণা পেতে পারে? পায় কি জান্নাতের পথ? কুর’আনী জ্ঞানের অজ্ঞতা নিয়ে পূর্ণ মুসলিম হওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো সভ্য রাষ্ট্রের নির্মাণ ও সুরক্ষার। খেলাফত ও পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ তো নাগরিকদের মুসলিম হওয়ায় ব্যর্থতা ।   


মুসলিম জীবনের প্রথম জিহাদটি সশস্ত্র শত্রুদের বিরুদ্ধে রণাঙ্গণে হয়না, সেটি হয় চেতনার ভূবনে। যুদ্ধটি হয় হারাম মতবাদ ও মতবাদী রাজনীতির ন্যায় জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে। এটি এক বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। নবীজী (সা:) সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি শুরু করেছিলেন তাঁর নবুয়তী জীবনের প্রথম দিন থেকে। যে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের মুজাহিদ হতে হয় প্রতিটি ঈমানদারকে। এ পবিত্র জিহাদের মূল অস্ত্র হলো পবিত্র কুর’আন। এ জিহাদকে মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা আল ফুরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে “জিহাদান কবিরা” তথা বড় জিহাদ বলেছেন। যার কুর’আনী জ্ঞান নাই, সে কখনোই এ জিহাদে জয়ী হতে পারে না। আর যে ব্যক্তি এ জিহাদে জয়ী হতে ব্যর্থ হয়, সে ব্যর্থ হয় প্রকৃত ঈমানদার হতে। তাকে বাঁচতে হয় অনৈসলামী মতবাদের কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে। মহান আল্লাহ তায়ালা চান, প্রতিটি মুসলিম সুসজ্জিত হবে কুর’আনী জ্ঞানের অস্ত্রে। তাই তিনি পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন। জ্ঞানের এ অস্ত্রে সজ্জিত না হলে পরাজিত হতে হয় এবং ভেসে যেতে জাহিলী মতবাদের স্রোতে। আজ সে স্রোতে ভেসে যাওয়াটাই প্রবল ভাবে হচ্ছে মুসলিমদের মাঝে। ফলে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে বিশাল বিজয় ইসলামের শত্রুপক্ষের। 

 
একটি মুসলিম দেশে জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, বর্ণবাদ, স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র, কম্যুনিজম ও সেক্যুলারিজমের স্রোতে ভাসা বিপুল সংখ্যক লোক দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে দেশে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতাটি কতটা বিশাল। মুসলিমগণ তাদের গৌরবযুগে বিভেদ সৃষ্টিকারী এবং জাহান্নামের দিকে টানে এমন মতবাদগুলি থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পেরেছিলেন বলেই আরব, ইরানি, তুর্কি, কুর্দি, মুর, হাবশি ইত্যাদি নানা ভাষার মুসলিমদের একই রণাঙ্গণে একত্রে লড়তে দেখা গেছে। ফলে তারা জন্ম দিতে পেরেছিলেন বিশ্বশক্তির; নির্মাণ করতে পেরেছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। অথচ আজ মুসলিমগণ ফিরে গেছে ইসলামপূর্ব জাহিলী যুগে -যে যুগে আরবদের কোন রাষ্ট্র ও সভ্য সংস্কৃতি ছিল না। তারা বাঁচতো অসংখ্য গোত্রে বিভক্ত কলহপ্রবন এক অসভ্য গোত্রীয় পরিচিতি নিয়ে। ৫০টির বেশি রাষ্ট্রে বিভক্ত প্রায় ১৫০ কোটি মুসলিম অতীতের সে কদর্য দিনগুলি মুসলিম বিশ্বে আবার ফিরিয়ে এনেছে। ফলে কোথাও বেঁচে নাই নবীজী (সা)’য়ের ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্র। নবীজী (সা)’য়ের ইসলাম বাঁচলে তো ইসলামী রাষ্ট্র বাঁচতো। তখন আদালতে শরিয়া দেখা যেত। তখন শিক্ষালয়ে কুর’আন শিক্ষা এবং প্রশাসনে সুবিচারের প্রতিষ্ঠা এবং দুর্বৃত্তি নির্মূলের জিহাদ থাকতো। এবং মুসলিমদের মাঝে প্রতিষ্ঠা পেত ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধের উঠে প্যান ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব। আজ এর কোনটাই বেঁচে নাই। মুসলিমদের চরম ব্যর্থতাটি আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনে। বরং নিজেদের শ্রম, মেধা, অর্থ, ভূ-রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বিজয়ী করেছে শয়তানের এজেন্ডাকে। ২৭/০৯/২০২৬