• ঢাকা |

শুধু সরকার পাল্টালে চলবে না, বাংলাদেশীদের প্রথমে নিজেদের পাল্টাতে হবে


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বাঙালির ফাঁকা গর্ব ও অযোগ্যতা

বাংলাদেশের জনগণ বড়ই গর্ব ও অহংকার করে তাদের নিজেদের নিয়ে। ১৯০ বছর ব্রিটিশের গোলামীর পরও বলে বাঙালিরা বীরের জাতি। তাদের সে গর্ব ও অহংকার যে কতটা ফাঁকা -সেটি তারা বিদেশে আসার সুযোগ পেলে সাথে সাথে টের পেত। আমরা যারা বিদেশে থাকি সেটি প্রতিদিন টের পাই। আমি বিগত ২৭ বছর লন্ডনে আছি। আমি প্রায়ই ব্রিটিশদের সাথে আমাদের তুলনা করি। আজ সকালে বিলেতের নতুন প্রধানমন্ত্রী এ্যান্ডি বার্নহামের বক্তৃতা টিভিতে লাইভ শুনছিলাম। উনি লিভারপুলে শ্রমিক দলের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শুনছিলামা আর তুলনা করছিলাম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে। এক দিকে বিস্মিত হচ্ছিল, আবার হতাশাও হচ্ছিলাম।

বার্নহামে কোন লিখিত বক্তৃতা পড়ে শুনাচ্ছিলেন না; তিনি মঞ্চে হেটে হেটে থেমে থেমে গভীর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। মিস্টার বার্নহামকে মনে হচ্ছিল তিনি একজন দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী এবং মানব কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ একজন অমায়িক ব্যক্তি।  উনার বয়স ৫৬ বছর। তার শরীরে কোন এলিট পরিবারের রক্ত নাই, তিনি একজন ট্রাক ড্রাইভারের নাতি। কিন্তু তাঁর কর্মজীবন অভিজ্ঞতায় ভরা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে তিনি ম্যানচেস্টার শহরের জনপ্রিয় সফল মেয়র ছিলেন। উনি লেখাপড়া করেছেন ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মজীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। শ্রমিক ইউনিয়নও করেছেন। উনি ২০০৮ থেকে ২০১০ অবধি দেশের সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারিক জিয়ার ভাষণ আমি অনেকবার শুনেছি। বক্তৃতার মান একজন স্কুল ছাত্রের চেয়ে ভাল নয়। জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছিলে লিখিত বিষয় দেখে দেখে; তারপরও শুদ্ধ ভাবে পড়তে পারছিলেন না। ভাবছিলাম এবং বিস্মিত হচ্ছিলাম, বিলেতের সাড়ে ৬ কোটি লোকজন কি ধরণের লোকদের ভোট দেয় এবং মন্ত্রী বানায়, আর বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ কাদের ভোট দেয় এবং নেতা বানায়- সেটি ভেবে। তবে এজন্য দায়ী বাংলাদেশের জনগণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মিস্টার বার্নহামের মত যোগ্য ব্যক্তি কখনো স্থান পেত না। কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে শিক্ষা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা লাগে না। লাগে শরীরে মৃত নেতার রক্ত। সে রক্ত থাকায় জনগণ হাসিনাকে ভোট দিয়েছে। তারিক জিয়াও সে রক্তের জোরে আজ প্রধানমন্ত্রী। নইলে সে বিলেতের কোন শহরের মেয়র দূরে থাক, কাউন্সিলরও হতে পারতো না।  

অযোগ্যকে চালকের আসনে বসনো ভয়নাক ভাবে বিপদজনক

গাড়ীর চালকের আসনে অযোগ্য লোককে বসালে সে গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটাবেই। অযোগ্য লোককে অবশ্যই যাত্রী বানানো যায়, কিন্তু কখনোই তাকে ড্রাইভার বানানো যায়না। অথচ বাংলাদেশের জনগণ এক অযোগ্য ব্যক্তিকে গাড়ির ড্রাইভার বানিয়েছে। দোষ এখানে তারিক জিয়ার নয়, বরং বাংলাদেশের বেকুব জনগণের। তারা শুধু নেতার রক্ত দেখে, যোগ্যতা দেখে না। অযোগ্য লোককে প্রধানমন্ত্রী বানালে দেশ সংকটে পড়বেই। বাংলাদেশের বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য সরকার বহুলাংশে দায়ী হলেও তবে বড় কারণটি হলো জনগণ নিজেই। কারণ তারাই বিগত নির্বাচনগুলিতে নিজেদের গভীর নির্বুদ্ধিতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ রেখেছে। ‌বাংলাদেশে জনগণের উচিত নিজেদের নির্বুদ্ধিতা ও অযোগ্যতা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করা।‌ তাহলে দেখতে পেত, অন্যদের চেয়ে তারা কতটা অযোগ্য ও নির্বোধ। এবং তাদের উচিত নিজেদের চরিত্রে দ্রুত পরিশুদ্ধি আনা। এবং উচিত নেতার রক্তের বদলে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়া। নইলে বাংলাদেশের দুর্গতি শেষ হবে না। 

জনগণের নির্বুদ্ধিতা ও অর্জিত আযাব

বাংলাদেশীদের নির্বুদ্ধিতা এই প্রথম নয়; এরূপ নির্বুদ্ধিতা তারা পূর্বেও দেখিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ মুজিবের মত একজন চরিত্রহীন দুর্বৃত্ত, ভারতের চর ও  গণতন্ত্র হত্যাকারী ফ্যাসিস্টকে বিপুলভাবে নির্বাচিত করেছিল। অথচ সে সময়ও দেশের অন্যান্য দলে মুজিবের চেয়েও অনেক ভাল লোক ছিল। শাহ আজিজুর রহমান, আব্দুর রহমান বিশ্বাস, ফজলুল কাদের চৌধুরী, মৌলভী ফরিদ আহমেদ, অধ্যাপক গোলাম আযম, আব্বাস আলী খান, আজমল চৌধুরী, মাহমুদ আলী, আব্দুল আলীমের মত বহু যোগ্যবান ব্যক্তিও ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ তাদের ভোট দেয়নি। ভোট দিয়েছে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের।

এসব ছিল জনগণের সম্মিলিত অপরাধ। এমন অপরাধ জাতির জীবনে আযাব অনিবার্য করে। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের বিজয়ী করার সে পাপ ১৯৭১’য়ে একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধকে অনিবার্য করেছে। যুদ্ধ শেষে এসেছে ভারতের অধিকৃতি ও লুণ্ঠন, গণতন্ত্রের মৃত্যু, বাকশালি ফ্যাসিবাদ এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের আযাব। জনগণ একই অপরাধ করেছে ২০২৬ সালের নির্বাচনে। তারা বিজয়ী করেছে বিএনপির প্রতারক, চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের। ফলে আযাবও ঘনিয়ে আসছে। এগুলি জনগণের নিজ পাপের অর্জিত আযাব। এ আযাব থেকে বাঁচতে হলে নির্বাচনকে ভোটদানকে পবিত্র ইবাদতে পরিণত করতে হবে। ইবাদত তো তখনই যখন ভোটদানের মাধ্যমে দুর্বৃত্তদের নির্মূল এবং ন্যায় ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার ন্যায় মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করা হয়।    

যোগ্য লোকদের বদলে অযোগ্যদের ভোট দেওয়া নৈতিক দিক দিয়ে গুরুতর অপরাধ। এটি পাপ। কাউকে ভোট দেয়ার অর্থ তাকে ভাল মানুষ বলে সাক্ষ্য দিয়া। কোন প্রতারক, চাঁদাবাজ, দখলবাজ অপরাধীকে ভাল মানুষ বলে নির্বাচন কালে সাক্ষ্য দেয়া শরীয়তের ‌দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ। অথচ বাংলাদেশের  জনগণ সে কবিরা গুনাগর অপরাধটি বারবার করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও জনগণ সে অপরাধটি করেছে। এবার তারা আওয়ামী লীগের বদলে বিএনপির চাঁদাবাজ, দখলবাজ, প্রতারক ও দুর্বৃত্তদের নির্বাচিত করেছে।  ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণ একই ভুল করেছিল। শেখ মুজিব যে দুর্নীতি পরায়ণ এবং দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত -সেটি ১৯৭০য়ের নির্বাচনের বহু আগেই প্রমাণিত হয়েছিল। ১৯৫৪’য়ের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হওয়াতে শেখ মুজিব প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হয়েছিল। মন্ত্রী থাকা কালে ‌দুর্বৃত্তির দায়ে ঢাকার আদালত মুজিবকে সাজা দিয়েছিল। তারপরও জনগণ তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। 

জনগণ একাধিকবার নির্বাচনে বিজয় করেছে শেখ হাসিনার ন্যায় খুনি ফ্যাসিস্টকে। আবার এ জনগণই  ২০২৬'য়ের নির্বাচনে অযোগ্য ও অদক্ষ তারেক জিয়াকে বিপুল ভোটে বিজয় করেছে। অথচ তারেক জিয়ার চেয়েও বহু শিক্ষিত, যোগ্য ও প্রজ্ঞাবান লোক অন্যান্য দলে ছিল। কিন্তু জনগণ তাদের ভোট দেয়নি। ‌তারেক জিয়ার প্রতারণাটি বিশাল। নির্বাচন কালে বলেছে “প্রথম বাংলাদেশ”। এখন দেখা যাচ্ছে, তার কাছে বাংলাদেশ প্রথম নয়, বরং প্রথম হলো চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দুর্নীতি। ২ দিন আগে বিএনপি’র মুখোশধারী নেতাকর্মীরা মীরপুরের রাড্ডা বারনেন নামক একটি ক্লিনিক গুড়িয়ে দিয়ে তার বহু কোটি টাকা মূল্যের ১০ কাঠা জমি দখলের চেষ্টার করেছে। উল্লেখ্য যে মীরপুরে বিহারিদের এ জমি ২০০৬ সালের বিএনপি সরকারের আমলে বিএনপি কর্মীরা দোকানমালিক সমিতির জন্ম দিয়ে সেটির নামে লিখিয়ে নিয়েছিল। আওয়ামী লীগের আমলে তারা দখল পায়নি, বিএনপি ক্ষমতায় আসায় এখন দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে। হামলা করেছে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে। তারিক জিয়া ও তার দল দেশটা এভাবে চরম অসভ্যতা, চরম অরাজকতা এবং চরম বিচারশূন্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দেশ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত।

 
এ অক্ষম সরকারকে বিদায় দিতেই হবে

প্রশ্ন হলো, জনগণ এখন কি করবে? তারা কি বসে বসে আঙ্গুল চুষবে। এটি তো কোন সভ্য ও বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। বিগত ৬ মাসেই বিএনপি দেশকে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দিয়েছে যে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশ এক মহা বিপর্যয়ে পড়বে। সুস্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, দেশ সঠিক পথে নাই, গভীর খাদে পড়েছে। তারিক জিয়া আগামী আরো সাড়ে চার বছর ক্ষমতায় থাকলে এ খাদ থেকে উদ্ধার করা যাবে না। বরং খাদের গভীরে ডুববে।

সম্প্রতি সার্বিয়ার নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটলো। সে সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ হওয়ায় গদি ছাড়তে হয়েছে। তারা ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল -কিন্তু এ যুক্তি সে সরকারকে বাঁচাতে পারিনি। জাপানে বহুবার নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটেছে। সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে হয় দেশ চালানোয় সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে। ব্যর্থ হলে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। যে চালক দুর্ঘটনায় প্রাণনাশ ঘটায়, আদালতে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স কাজ দেয়না। তাকে জেলে যেতে হয়। তেমনি অক্ষম সরকারের নির্বাচনি বিজয় জনগণের আদালতে কাজ দেয়না। তাকে বিদায় নিতে হয়।

বিএনপি ভাল ভাবে দেশ চালানোর ওয়াদা দিয়ে ভোট নিয়েছে। কিন্তু দলটি সে ওয়াদার সাথে প্রতারণা করেছে। প্রতারণা করেছে জুলাই সনদের সাথে। এরূপ প্রতারকদের প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার অধিকার দেয়া যায়না। ফলে এ প্রতারককে ক্ষমতায় থাকতেই দেয়াই এখন আরেক অপরাধ। জনগণ কি চোখের সামনে দেশকে এভাবে ধ্বংস হতে দিবে? কোন সভ্য বিবেকবান ও ঈমানদার মানুষ কি দেশের এ গভীর সংকট কালে নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে? ২৯/০৯/২০২৬