• ঢাকা |

স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে হলে মুসলিম উম্মাহকে ভূগোল বদলাতে হবে


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

ফিরোজ মাহবুব কামাল


বিভক্তি ও বিভক্ত ভূগোল: বিদ্রোহ ও বেঈমানী দৃশ্যমান রূপ

মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি ও বিভক্ত ভূগোলের মধ্যে দিয়ে দৃশ্যমান হয় মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানি। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর ঈমানদার বান্দাদের জন্য যে ধরণের মানচিত্র পছন্দ করেন, সেটি কখনোই আজকের বিভক্ত মানচিত্র নয়। সেটি একতাবদ্ধ এক বিশাল ভূগোলের অখণ্ড মানচিত্র। নবীজী (সা:) এবং তাঁর খোলাফায়ে রাশেদা সেরূপ একটি মানচিত্র প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়ে গেছেন। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায় হলো সেটিকে অনুসরণ করা। নইলে বিদ্রোহ ও বেঈমানী হয়। নবীজী (সা:) শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতের বিধানই শিখিয়ে যাননি, শিখিয়ে গেছেন কি করে মহান রাব্বুল আলামীনের পছন্দের  রাষ্ট্রীয় মানচিত্রটি নির্মাণ করতে হয় -সেটিও। সে ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রটি নির্মাণ করতে হয় ভাষা, বর্ণ, গোত্র, অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ে উর্দ্ধে উঠে। নামাজের জামায়াতে নানা ভাষা, নানা বর্ণ, নানা ও নানা গোত্রের মানুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে  দাড়াতে হয়; নইলে নামাজ হয় না। কারণ সেটি ইবাদতের জায়গা। সেরূপ একতা থাকতে হয় রাষ্ট্র নির্মাণেও। কারণ, সেটিও ইবাদতের জায়গা। বরং মুমিনের রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি সর্বোচ্চ ইবাদত তথা জিহাদ। এ জিহাদের জান ও মালের কুরবানী আছে।

নবীজী (সা:)’য়ের নির্মিত রাষ্ট্রে আরব, ইরানী, তুর্কি, কুর্দি, হাবশি ইত্যাদি পরিচয়ের জনগণ একত্রে বসবাস করেছে; ভাষা, বর্ণ বা এলাকার নামে বিভক্তির দেয়াল গড়া হয়নি। খোলাফায়ে রাশেদা নবীজী (সা:)’য়ের সে সূন্নতকে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সা:)য়ের সে ইসলাম নিয়ে যেমন বাঁচে না, তেমনি বাঁচে না একতাবদ্ধ অখণ্ড ভূগোল গড়ার ইবাদত নিয়ে। তারা বেছে নিয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর নবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানীর পথ। সে বিদ্রোহ ও বেঈমানি যেমন তাদের বিভক্ত ভূগোলের মাঝে প্রকট ভাবে দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় তাদের শরিয়াশূণ্য আদালত, পতিতা পল্লীর সংস্কৃতি, সূদের অর্থনীতি, ঘুষের প্রশাসন ও প্রতারণার রাজনীতির মাঝে। এবং দেখা যায় চাঁদাবাজী, চুরি ডাকাতি, গুম-খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির প্লাবনের মাঝে।

বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এরূপ বিদ্রোহ ও বেঈমানি নিয়ে বাঁচাই আজ রাজনীতি ও সংস্কৃতি। তিন লাখের বেশি মসজিদ, বহু হাজার মাদ্রাসা এবং বহু কোটি মানুষের নামাজ রোজা সে বিদ্রোহ ও বেঈমানির তাণ্ডব একটুও কমাতে পারছে না। ব্যক্তির বেঈমানি তো গোপন বিষয় নয়, সেটি প্রকাশ পায় প্রতিটি বিদ্রোহ ও দুর্বৃত্তির মধ্য দিয়ে। বস্তুত প্রতিটি পাপ কর্মই হলো আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানি। বাঙালি মুসলিমের সে বেঈমানি বার বার বিশ্বব্যাপী ঝলসে উঠেছে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে। অপর দিকে একতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মহান রব’য়ের প্রতি বলিষ্ঠ ঈমান। প্রকাশ পায় মহান আল্লাহকে খুশি করার তাড়না এবং তাঁর হুকুমের প্রতি আনুগত্য। সে সাথে প্রকাশ পায় অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি গভীর মমত্ব ও ভাতৃত্ব। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায় হলো, তাকে অবশ্যই বাঁচতে হয় প্যান ইসলামী ভাতৃত্ব নিয়ে। সে গভীর ভাতৃত্ব দেখা গেছে সাহাবায়ে কেরামের যুগে। মহান রব‘য়ের কাছে বান্দার অতি প্রিয় গুণ হলো এই ভাতৃত্ব। বস্তুত মহান রব শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন সে প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব নিয়ে বাঁচা। সে হুকুমটি এসেছে নিচের আয়াতে:

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ


অর্থ: “মু’মিনরা হলো পরস্পরে ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের মধ্যে সমস্যা থাকলে মিটমাট করে নিবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে -যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।”-(সুরা হুজরাত, আয়াত ১০)।
 

একতার তাড়না যেখানে অপরাধ এবং বিভক্তির আসক্তি যেখানে দেশপ্রেম

ভাইদের মধ্যে মতভেদ, বিরোধ, ভুল বুঝাবুঝি থাকতেই পারে। সেটি মহান রব’য়ের চেয়ে আর কে ভাল জানেন? তবে প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো, সেগুলি মিটমাট করে নেয়া এবং ভাতৃত্বের বন্ধনকে বাঁচিয়ে রাখা। এবং হারাম হলো ভাতৃত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করা এবং বিবাদ না মিটিয়ে সেটিকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাওয়া। উপরিউক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, মিটমাট করে নেয়াটি ঈমানদারি ও তাকওয়ার পথ। ফলে সেটি হলো মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে রহমতপ্রাপ্তির পথ। অপর দিকে ভাইদের  মাঝে সংঘাতের পথটি আযাবের পথ। পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমদের মাঝে সে প্যান ইসলামী চেতনা ও ভাতৃত্বের বন্ধন বেঁচে নাই। সে ছিন্ন বন্ধনটি দৃশ্যমান হয় মুসলিম উম্মাহর ৫০ টির বেশি টুকরোয় বভক্ত মানচিত্রের মাঝে। শুধু তাই নয়, বিবাদ ও বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচাই প্রতি দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। এবং সে বিভক্ত মানচিত্র বাঁচানোর লড়াইয়ে অংশ নেয়াকে দেশপ্রেম বলা হয়। এবং অপরাধ গণ্য হয় এ বিভক্ত মানচিত্রের অবকাঠামো ভেঙে একতা গড়ার রাজনীতি। সেটি গাদ্দারী রূপে গণ্য হয় নিজ দেশের মানচিত্রের সাথে।

সত্য তো এটাই, বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই মুসলিমদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কারণ, দীর্ঘকাল যাবত তারা বাঁচছে নিজ দেশের ভূগোল ক্ষুদ্রতর করার রাজনীতি নিয়ে। আল্লাহকে খুশি করা এবং তাঁর এজেন্ডার সাথে হওয়া তাদের রাজনীতির এজেন্ডা নয়। বরং তাদের রাজনীতির এজেন্ডা হলো শয়তান ও তার খলিফাদের খুশি করা। যেমন খেলাফত ভেঙে আনন্দ বাড়িয়েছিল শয়তানের ইহুদি, খৃষ্টান ও সকল সাম্রাজ্যবাদী খলিফাদের। তাতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের উপর দখলদারি এবং ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা সহজ করে দিয়েছে। তেমনি পাকিস্তান ভেঙে খুশি করেছে শয়তান ও শয়তানের পৌত্তলিক খলিফাদের। কারণ তাতে শক্তিহানী হয়েছে উপমহাদেশের মুসলিমদের। এবং তাতে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভারতের রাডারের নীচে একটি আশ্রীত দেশে।  বিভক্তি নিয়ে বাঁচা তাই বিশুদ্ধ বেঈমানির রাজনীতি ও সংস্কৃতি। কোন ঈমানদার কখনোই রাজনীতির সে হারাম পথটি বেছে নিতে পারেন না। বরং যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের চিত্তে মুসলিম উম্মাহর এ বিভক্তি নিয়ে মাতম উঠবে -সেটিই তো কাঙ্খিত। কারণ আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন বিভক্তিকে।

বিদ্রোহ ও বেঈমানির পথ ধরেই আরব জাতীয়তাবাদীরা খেলাফত ভেঙেছে; বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা ভেঙেছে পাকিস্তান। ভাঙার পথ কখনোই ঈমানদারীর পথ নয়। মুসলিম বিশ্বে এ দুটি ভাঙার কাজ হয়েছে কাফিরদের অর্থ, অন্ন, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। প্রশ্ন হলো, কাফিরগণ কি কখনো মুসলিমদের কল্যাণে অর্থ ও অস্ত্র দেয় বা যুদ্ধ করে? বরং সেগুলি দেয় স্রেফ তাদের এজেন্ডা বিজয়ী করতে। প্রশ্ন হলো, শয়তানের শিবিরে এরূপ বিজয় তুলে দেয়াতে কি মহান রব খুশি হন? অথচ অতীতে মুসলিমগণ যখন বিজয় পেয়েছে তখন তাদের মাঝে ছিল প্যান ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ববোধ, একতা এবং বিশাল ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের জনগণ সে বিশাল মানচিত্রে মিলে মিশে বাস করেছে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে তারা একতাবদ্ধ ভাবে যুদ্ধ করেছে। যেখানে যার ইচ্ছা, সেখানে ঘর বেঁধেছে এবং ব্যবসা বাণিজ্য করেছে। এক ভাষার মানুষ অন্য ভাষার মানুষের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়েছে। ফলে দামেস্ক, বাগদাদ, ইস্তাম্বুলের ন্যায় মুসলিম বিশ্বের বড় বড় শহরগুলি গড়ে উঠেছে আরব, তুর্কি, কুর্দি, ইরানী, হাবশি ইত্যাদি নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মানুষের মিশ্র জনবসতি নিয়ে।
 

ঘরের শত্রুদের নাশকতা


মুসলিম উম্মাহর মনের ভূবনকে খণ্ডিত করেছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের ন্যায় জাহিলী মতবাদ। উম্মাহর বিরুদ্ধে এটি হলো ভয়ানক বুদ্ধিবৃত্তিক নাশকতা; তাতে মুসলিম ভূমিতে বেড়েছে বিপুল সংখ্যক ছোট মনের অসভ্য মানুষের সংখ্যা। এরাই পরিণত হয়েছে ঘরের শত্রুতে -যারা বাঁচে অন্য বর্ণ, অন্য ভাষা ও অন্য অঞ্চলের মুসলিমদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে। এসব ক্ষুদ্র মনের মানুষের কারণেই খণ্ডিত হয়েছে মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। ছোট মনের এ জীবদের পক্ষে অসম্ভব হলো ঈমানদার হওয়া। কারণ, ঈমান কখনোই বিষাক্ত জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, গোত্রবাদী ও আঞ্চলিকতাবাদী চেতনায় বাঁচে না। ঈমানদার তো তারাই যাদের মনটি বৃহৎ এবং মহৎ। এবং যারা সামর্থ্য রাখে ভিন ভাষা, ভিন বর্ণ ও ভিন অঞ্চলের মুসলিমকে ভাই বলে আপন করে নেয়ার। কিন্তু যারা শুধু মুখের ভাষা, গায়ের রং এবং জন্মস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণে নামে -তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? এমন কাণ্ডকে কি কখনো সভ্য কাণ্ড বলা যায়? সেটি তো নিরেট বেঈমানি ও অসভ্যতা।  ১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিম জীবনে সে বেঈমানি ও অসভ্যতা প্রকট ভাবে দেখা গেছে বিহারি হত্যা, বিহারি মহিলাদের ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ি দখল করার মাঝে।  ভাষা, বর্ণ ও জাত-পাতের ভিন্নতা সত্ত্বেও ভারতীয় পৌত্তলিকগণ যেরূপ ঐক্যবদ্ধ বিশাল ভারত গড়েছে -সে সামর্থ্য আরব মুসলিমগণ দেখাতে পারিনি। বাঙালি মুসলিমগণও দেখাতে পারিনি। এখানেই মুসলিমদের আত্মঘাতী পশ্চাৎপদতা। তাই বিশ্ববাসীর সামনে যে ইজ্জত ও স্বাধীনতা ভারতের রয়েছে -তা আরবদের যেমন নাই, বাঙালি মুসলিমদেরও নাই। যারা ভাঙার পথ বেছে নেয়, এ বিশ্বে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত কখনোই তাদের জন্য নয়। তাদের জন্য তো পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতি। সেটি শুধু ইতিহাসের নিয়ম নয়, সেটি মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানও। পরকালে তাদের জন্য রেখেছেন ভয়ানক আযাব।  


ভূগোল বদলাতে হবে

বর্তমানের বিভক্ত ভূগোল নিয়ে মুসলিম উম্মাহর পক্ষে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা অসম্ভব। মাথাপিছু আয় ১০ গুণ বাড়িয়েও সম্ভব হবে না। জনসংখ্যায় ১০ গুণ বৃদ্ধি ঘটলেও সেটি সম্ভব হবে না। কারণ, বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প উচ্চ আয় বা বৃহৎ জনসংখ্যা নয়। রশিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও দুর্বল। কিন্তু রাশিয়া হলো একটি বিশ্বশক্তি; কারণ রাশিয়ার হাতে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভূগোল। তাই স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে মুসলিম উম্মাহকে অবশ্যই তাদের ভূগোল বদলাতে হবে। বৃহৎ ভূগোলের গুরুত্ব নবীজী (সা:) বুঝতেন এবং তাঁর সাহাবাগণও বুঝতেন। ক্ষুদ্র ভূগোলের অর্থই হলো শক্তিহীনতা ও পরাধীনতা। এজন্যই নবীজী (সা:) সাহাবাদের ওসিহত করে গিয়েছিলেন, রোমান সাম্রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল দখল করতে। নির্দেশ এখানে মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোলে বৃদ্ধি আনা। কারণ, নবীজী (সা:)’য়ের বাসনা ছিল, মুসলিমগণ হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বশক্তি। আর সে জন্য অপরিহার্য হলো বিশাল ভূগোল। ফলে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ লাগাতর রাষ্ট্রের ভূগোল বাড়িয়ে গেছেন।

মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই যখন তারা ভূগোল ভাঙতে ব্যস্ত হয়েছে। এরাই খেলাফত ভেঙেছে; পাকিস্তানও ভেঙেছে। এবং মুসলিম দেশ ভাঙা নিয়ে এরা উৎসব করে। বাংলাদেশে সে উৎসব দেখা যায় ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এলে। যারা কোন মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙে, বুঝতে হবে তারা শয়তানের আজ্ঞাবহ দাস এবং মহান আল্লাহ ও মুসলিম উম্মাহর পরম শত্রু। এরা মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল ও পরাধীন দেখতে চায়। মুসলিম উম্মাহর আজকের বিপর্যয়ের জন্য কারণ মূলত শয়তানের এই আজ্ঞাবহ দাসেরা। এরা ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙার কাজটি শয়তানের পৌত্তলিক খলিফাদের সাথে জোট বেঁধে করেছে। ১৯১৭ সালে খেলাফত ভাঙার কাজটি করেছে শয়তানের ব্রিটিশ ও ফরাসী ঔপনিবেশিক খলিফাদের সাথে মিলে। এরাই মুসলিম বিশ্বকে ৫০টির বেশি টুকরোয় বিভক্ত করেছে।

যে গৃহ রোদ বৃষ্টি, চোর ডাকাত ও হিংস্র পশুর হামলা থেকে নিরাপত্তা দেয় না, সে গৃহ দ্রুত বদলাতে হয়। সে নাজুক গৃহে বসবাস করার অর্থ, বিপদ ডেকে আনা। রাষ্ট্রের কাজ তো রাষ্ট্রের নাগরিকদের জান মালের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়া। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর বিভক্ত ভূ-রাজনৈতিক ভূগোল সে কাজটি করছে না। সে ব্যর্থতার কারণে গাজায় ৭৫ হাজারের বেশি মুসলিম নিহত এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার আহত হলো। লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম তাদের নিজ গৃহ থেকে বহিস্কৃত হলো। ভারতের মুসলিমগণ আজ গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার। লেবাননে চলছে নৃশংস ধ্বংস প্রক্রিয়া। বাংলাদেশসহ দুর্বল মুসলিম দেশগুলির স্বাধীনতা আজ হুমকির মুখে। এ মহাবিপদ থেকে  বাঁচতে হলে বিভক্তির দেয়াল ভেঙে একতা গড়তে হবে। এটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটিই মহান আল্লাহর বিধান। একতা মহান রব’য়ের প্রতিশ্রুত রহমত আনে; বিভক্তি আনে প্রতিশ্রুত আযাব। মুসলিম উম্মাহর বর্তমান বিভক্তি ও বিভক্ত মানচিত্র শুধু এ পার্থিব জীবনের শান্তিকেই বিপর্যস্ত করছে না, অনিবার্য করছে আখেরাতের শাস্তিকেও -যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে।


মুসলিম উম্মাহর আজকের শক্তিহীনতার মূল কারণ জনশক্তি বা সম্পদের কমতি নয়; সেটি হলো, বিভক্ত মানচিত্র। এ খণ্ডিত মানচিত্র হলো মুসলিম ভূমিতে শত্রুশক্তির অতীত অধিকৃতির লিগ্যাসি। ইসলাম অতীতে শুধু বিশাল এলাকার জনগণের ধর্ম তথা মনের মানচিত্র পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রও। এটিই নবীজী (সা:)’য়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সূন্নত। রাষ্ট্রের ভূগোলে লাগাতর বৃদ্ধি আনাই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ সূন্নত। নবীজী (সা:) নিজে তাঁর ১০ বছরের শাসন কালে মদিনার ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত করে যান। সে রাষ্ট্র ভেঙ্গে আজ ৬টি রাষ্ট্র নির্মিত হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদা সে সূন্নতকে অব্যাহত রেখেছিলেন। অপর দিকে নিজ দেশকে খণ্ডিত করাটি হলো শয়তানকে খুশি করার পথ। সেটি পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতির পথ। এ পথটিই হলো আজকের মুসলিমদের পথ। তারা ভাঙাতে ইতিহাস গড়েছে, ভূগোল বাড়াতে নয়।  


স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের কোন সহজ রাস্তা নাই। সেটি কারো করুণার বিষয় নয়; সেটি নিজ গুণে ও নিজ চেষ্টায় অর্জন করতে হয়। আর সে অর্জনের পথটিই হলো জিহাদের পথ। মুসলিমগণ যতদিন ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে এক বৃহৎ ভূগোলে একতাবদ্ধ ভাবে বসবাসের সামর্থ্য অর্জন না করবে, ততদিন স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের বাসনা স্রেফ স্বপ্নই থেকে যাবে। বুঝতে হবে, বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই সবচেয়ে বড় অসভ্যতা। এ পথটি বিদ্রোহ ও কুফুরির। তখন জাতীয় আয় বহু গুণ বাড়িয়েও স্বাধীনতা ও ইজ্জত জুটে না। মাথাপিছু আয় বিশাল হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, কুয়েতকে তাই স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভিখারি হতে হয়। অথচ সে বিপর্যয় ও অসহায় অবস্থা থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা একতাকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। সে একতার নীতি গ্রহণ করেছে পৌত্তলিক ভারত, খৃষ্টান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বহু জাতিক রাশিয়া এবং চীনের জনগণ। অথচ মুসলিমগণ সে সভ্য ও ভদ্র নীতি বহু আগেই পরিহার করেছে এবং বিভক্তির অসভ্য পথটি বেছে নিয়েছে। ২৫/০৯/২০২৬