জবি প্রতিনিধি: নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দীর্ঘ এক বছর না গড়াতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের রাজনীতি নিয়ে আবার আলোচনায় এসেছে।
সম্প্রতি গত ২৮ সেপ্টেম্বর পদপ্রাপ্ত নেতাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দাপ্তরিক প্যাডে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরিত চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখানে ২০১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ করা হয়নি। যদিও কমিটি এখনও প্রকাশ্যে আনেনি সংগঠনটি।
এই খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা, সেই সাথে অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রতিক্রিয়া। সমালোচনার মুখে প্রশাসন বলছে, এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ দিলে তখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২২ সালের ১ জানুয়ারি ইব্রাহিম ফরাজিকে সভাপতি এবং এস এম আকতার হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ সদস্যের একটি আংশিক কমিটি অনুমোদন দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।
তবে সম্প্রতি ক্যাম্পাসের বাইরে মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে তাঁদের। তা করতে গিয়ে অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
ছাত্রলীগের কমিটি বর্ধিত করা প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “যে সংগঠন নিষিদ্ধ, তাদের কমিটি কীভাবে হয়? এটি প্রশাসনের ব্যর্থতা ছাড়া কিছু নয়। যেখানে জুলাই আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে বিচার হওয়ার কথা, সেখানে তাদের নতুন কমিটি হচ্ছে!” ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের অক্টোবরে ‘সন্ত্রাসী সত্তা’ হিসেবে দলটির সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনটির কমিটি নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই ছিল।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল এনপিবি নিউজে বলেন, “বিগত ১৭ বছর ধরে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী কায়দায় রাজনীতি করে ছাত্রদলসহ সব সক্রিয় ছাত্রসংগঠনকে ক্যাম্পাসের বাইরে রেখেছে। এখন তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের রোষানলে পড়ে গুপ্ত রাজনীতি শুরু করেছে। নিষিদ্ধ এই ছাত্রসংগঠনের তৎপরতা বাংলাদেশের সব ক্যাম্পাসের সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। ক্যাম্পাসে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি ধ্বংসকারী এই সংগঠনের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবশ্যই ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নেবে।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি এ কে এম রাকিব এনপিবি নিউজে বলেন, “ছাত্রলীগ যেভাবে ক্যাম্পাসে দমন–পীড়ন চালিয়েছে এবং জুলাই আন্দোলনে আমাদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা করেছে, সেই অনুযায়ী তাদেরকে এখনো বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বারবার বলেছি, আপনারা ছাত্রলীগের যেসব নেতা–কর্মী অপরাধে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু তারা দায়সারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ছাত্রলীগের অনেকেই এখনো অনলাইনে সক্রিয় রয়েছে।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম এনপিবি নিউজে বলেন, “আমরা ফেসবুক ও কিছু সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করেছে। ছাত্রলীগ একটি নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী সংগঠন। যারা জুলাই গণ–অভ্যুত্থানসহ গত ১৭ বছর ধরে ছাত্ররাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন ও নিপীড়নের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা যদি আবার সুযোগ পায়, তবে আগের মতো হত্যা, গুম, খুন ও সন্ত্রাসের রাজনীতি শুরু করবে। তাই তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। এখানে কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই।”
এদিকে কমিটি প্রকাশের পর অনলাইনে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। তাতে বলা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কোনো তোয়াক্কা তাঁরা করছেন না।
জবি ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি ইব্রাহিম ফরাজি এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ছাত্রলীগ করার কারণে যদি বহিষ্কার করা হয়, তাহলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে বলে দিও, সভাপতি হিসেবে প্রথম বহিষ্কার যাতে আমাকে করা হয়!!!”
সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরুল কায়েস শিশির ফেসবুকে লেখেন, “এই পরিচয় জগন্নাথ ছাত্রলীগের প্রত্যেক নেতা–কর্মীর রক্ত দিয়ে কেনা। কেউ অস্বীকার করবে না। তোমাদের মব বাহিনী জীবন নিয়ে নিচ্ছে তাতে কেউ শঙ্কিত না আর বহিষ্কার। আর এত টেনশন কেন ক্যাম্পাসে তো এমনিতেই যাইতে দাও না।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কামরুল হোসাইন এক বার্তায় এনপিবি নিউজে জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যেকোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত নিলে, তাদের এই দায়ভার বহন করতে হবে।
কামরুল হোসাইন বলেন, “আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৬ বছরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বর্তমান কর্তাব্যক্তিরা বিন্দুমাত্র নিগ্রহ কিংবা কটূ বাক্যের শিকার হয়নি, এখন তারা আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে চাইলে তাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও সেই দায়ভার বহন করতে হবে।”
ফের ছাত্রলীগের কমিটি প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. তাজাম্মুল হক এনপিবি নিউজে বলেন, “কমিটি নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু দেখা যায়নি। তারপরও কেউ যদি অভিযোগ দেয়, সেটা প্রমাণিত হওয়ার পর, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম এনপিবি নিউজে বলেন, “ছাত্রলীগের কমিটি হয়েছে, এটা আমরা শুনেছি। তবে এখনো কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখিনি। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ দিলে তবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল গত ২০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত ৪২১ শিক্ষার্থীর তালিকা দিয়ে তাঁদের বিচারের দাবি জানিয়েছিলো। তবে সে বিষয়ে নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে ছাত্রলীগ কমিটি সক্রিয় করতে উৎসাহিত হচ্ছে।