• ঢাকা |

ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ : উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয়


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৮ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

মো: মুখলেছুর রহমান: বাংলাদেশে সংস্কারের স্থায়িত্ব সবসময়ই একটি বড় প্রশ্ন। বহুবার দেখা গেছে, কোনো খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপের মুখে সেই উদ্যোগের অনেকটাই পরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও সেই পুরোনো আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া ব্যাংকিং সংস্কার কার্যক্রম দেশের আর্থিক খাতে কিছুটা হলেও আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছিল। কিন্তু ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ সেই প্রক্রিয়াকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা একদিকে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নতুন আইনের আওতায় কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকদের আবারও মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যেসব ব্যাংক ঘিরে ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকার নানামুখী উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। অথচ নতুন আইনের অধীনে সাবেক মালিকরা মাত্র ৭.৫ শতাংশ অর্থ অগ্রিম পরিশোধ করেই সেই মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবেন, আর অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের জন্য পাবেন অতিরিক্ত সময়। অনেক অর্থনীতিবিদের ভাষায়, এটি জবাবদিহিতার তুলনায় যেন আশাতিত পুরস্কার।

কারণ এই ব্যাংকগুলোর সংকট কোনো দুর্ঘটনার ফল ছিল না। এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, যাদের বিরুদ্ধে আমানতকারীদের অর্থকে কার্যত ব্যক্তিগত তহবিল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আরও কয়েকটি ব্যাংকও বছরের পর বছর একই ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালিত হয়েছে। সম্পর্কিত পক্ষকে ঋণ বিতরণ, নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে পাশ কাটানো, বেনামি ঋণ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগগুলো নতুন নয়। এসব কর্মকাণ্ডের ফলেই ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। আজও অসংখ্য আমানতকারী তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৫ সালের মে মাসে জারি হওয়া অধ্যাদেশে সংশ্লিষ্ট মালিকদের ব্যাংক ব্যবস্থাপনা থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, একীভূতকরণ এবং পুনঃমূলধনীকরণের মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, ব্যাংক লুটের সংস্কৃতির অবসান ঘটানো হবে। দীর্ঘদিনের সংকটের পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও কিছুটা আস্থা ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া নতুন আইন সেই বার্তাকেই দুর্বল করে দিয়েছে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা। অনেকেই এই আশংকাও করছেন যে, একবার যদি পুরোনো মালিকরা ফিরে আসেন, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট পুনরাবৃত্তি হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হতে পারে।

এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি সত্যিই ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, নাকি অনিয়মের পরও ক্ষমতাবানদের জন্য ফিরে আসার দরজা খোলা রাখতে চায়? অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, এ ধরনের সুযোগ দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করে। এটি আর্থিক খাতকে এমন একটি বার্তা দেয় যে, বড় ধরনের অনিয়ম বা অপব্যবহারের পরিণতিও শেষ পর্যন্ত আলোচনার বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আমানতকারীদের কাছেও একটি হতাশাজনক সংকেত পাঠায় যে, রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির স্থায়িত্বও নিশ্চিত নয়।

অধ্যাপক বিরূপাক্ষ পালের ভাষায়, এই আইন একটি “ক্ষতিকর আপোস”, যা ব্যাংকিং খাতের নৈতিক ভিত্তিকে আরও দুর্বল করতে পারে। কারণ এখানে শুধু পাঁচটি ব্যাংকের ভবিষ্যতের প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হলো পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে। যদি ব্যাংক ধ্বংসের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই শেষ পর্যন্ত আবার সেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল আচরণের প্রণোদনা কোথায় থাকবে? নৈতিক ঝুঁকির এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

অবশ্য সরকারের যুক্তি হলো, আইনে পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন মূলধন বিনিয়োগ, পাওনাদারদের দাবি নিষ্পত্তি, বাংলাদেশ ব্যাংকের যাচাই-বাছাই এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর্যবেক্ষণ—এসব শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা এই সংকটের জন্ম দিয়েছে, সেই একই কাঠামোর ওপর ভর করেই এখন সুরক্ষাব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রকদের দৃঢ় অবস্থানের উদাহরণ খুব বেশি নেই। ফলে কাগজে-কলমে শক্তিশালী দেখালেও বাস্তবে এই সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এখানে আরও একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। অতীতে এমন বহু আইন ও নীতি দেখা গেছে, যেগুলোর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল জনস্বার্থ রক্ষা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর স্বার্থ নিশ্চিত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন আইন নিয়েও এখন একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, বর্তমান সরকার কি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে? যে ‘অলিগার্ক’ রাজনীতির সমালোচনা এতদিন করা হয়েছে, তারই কোনো নতুন সংস্করণ কি আবার আবির্ভূত হচ্ছে?

বাংলাদেশই প্রথম দেশ নয়, যেখানে ব্যাংকিং সংস্কার রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। কারণ অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু সংস্কারের প্রকৃত অর্থ তখনই থাকে, যখন সরকার স্বল্পমেয়াদি সুবিধা বা চাপের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে জনগণের অর্থ ব্যয় হয়েছে, যে আমানতকারীরা এখনও ক্ষতির বোঝা বহন করছেন, তাদের স্বার্থের চেয়ে যদি পুরোনো মালিকদের প্রত্যাবর্তন বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে সংস্কারের দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বাধ্য।

সরকার বলছে, তারা অতীতের জঞ্জাল পরিষ্কার করছে। কিন্তু নতুন আইনটির সমালোচকদের মতে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সংস্কারের নামে যদি শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিগুলোকেই পুনরায় সুযোগ দেওয়া হয়, যাদের কর্মকাণ্ডে সংকটের জন্ম হয়েছে, তাহলে সেটি জঞ্জাল পরিষ্কার করা নয়; বরং সেই জঞ্জালকেই নতুন মোড়কে পুনর্ব্যবহার করা। আর সেখানেই ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ নিহিত।

মো: মুখলেছুর রহমান।

[ইসলামী অর্থনীতিবিদ, আইন গবেষক, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী।]