নিজস্ব প্রতিবেদক: একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের জীবিকা নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সেই চাকরিই যখন দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় ঝুলে থাকে, মাসের পর মাস বেতন না মেলে, ঋণের বোঝা কাঁধে চেপে বসে—তখন সেই অনিশ্চয়তা কতটা নির্মম পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে উঠেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) আওতাধীন হর্টিকালচার সেন্টারের আউটসোর্সিং কর্মচারী মরহুম মো. মজনুর রহমানের মৃত্যু।
সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীর্ঘদিনের চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রায় এক বছর ধরে বেতন না পাওয়া এবং ঋণের চাপে তিনি তীব্র মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন। সেই চাপের মধ্যেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত আরও ২৮১টি আউটসোর্সিং কর্মচারী পরিবারের উদ্বেগ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সহকর্মীদের অভিযোগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন দেশের ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টারের জন্য আউটসোর্সিং সেবা প্রদানের দায়িত্ব পায় ট্রাস্ট সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড। তাদের দাবি, কোম্পানিটির টেন্ডারের কার্যকারিতা ছিল মাত্র ১৫ দিন। কিন্তু নিয়োগের সময় কর্মপ্রার্থীদের অনেকেই এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।
কর্মচারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা চাকরি পুনর্বহাল, বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, স্মারকলিপি ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেও এখনো কার্যকর কোনো সমাধান পাননি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সংসার চালাতে গিয়ে মজনুর রহমানকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় সেই ঋণ শোধ করা সম্ভব হয়নি। সংসারের খরচ, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং চাকরি হারানোর শঙ্কা তাকে ক্রমেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী ও মাত্র সাত বছর বয়সী এক সন্তানকে। পরিবারটির সামনে এখন নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা। স্বজনদের ভাষায়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা আজ অসহায়।
শুধু মজনুর রহমানের পরিবার নয়, একই পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টারে কর্মরত আরও ২৮১ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীনতা, বেতনহীনতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেউ ঋণের বোঝায় জর্জরিত, কারও সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, আবার অনেকের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
একজন কর্মচারী বলেন, "আমরা রাষ্ট্রের কৃষি সেবার সঙ্গে যুক্ত থেকেও আজ কর্মহীন, বেতনহীন ও ভবিষ্যৎহীন জীবন কাটাচ্ছি। আমরা শুধু কাজ করতে চাই, সম্মানের সঙ্গে পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই।"
২৮১ জন কর্মচারী ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে চারটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে—
দ্রুত চাকরি পুনর্বহাল এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ করা।
ভবিষ্যতে কোনো কর্মচারী যাতে একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও মানসিক সংকটে না পড়েন, সে জন্য স্থায়ী ও মানবিক নীতিমালা গ্রহণ করা।
মরহুম মো. মজনুর রহমানের পরিবারের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
"আর কোনো মজনুর রহমানকে হারাতে চাই না"
মজনুর রহমানের সহকর্মীদের কণ্ঠে আজ ক্ষোভের পাশাপাশি রয়েছে গভীর বেদনা। তাদের একজন বলেন, "আমরা আর কোনো সহকর্মীকে চাকরির অনিশ্চয়তা, বেতনহীনতা ও মানসিক চাপে হারাতে চাই না। একজন মজনুর রহমানের মৃত্যু যেন শেষ মৃত্যু হয়। সরকার মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে ২৮১টি পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।"
মজনুর রহমানের মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, বেতন বঞ্চনা এবং আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় কর্মরত মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং সময়মতো প্রাপ্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত না হলে এমন পরিস্থিতি আরও অনেক পরিবারকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের দায়িত্বশীল মহলের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
আজ ২৮১টি পরিবার সরকারের কাছে একটিই আবেদন জানাচ্ছে—চাকরির নিশ্চয়তা দিন, বকেয়া বেতন পরিশোধ করুন, আর যেন কোনো পরিবার অনিশ্চয়তা, অভাব ও হতাশার কাছে প্রিয়জনকে হারাতে না হয়।